জলবায়ু পরিবর্তন: কীভাবে লবণাক্ততা মোকাবেলা করছেন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকরা?

বাংলাদেশের উপকুলীয় জেলাগুলোয় পানিতে লবণাক্ততা ক্রমাগত বাড়ছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের উপকুলীয় জেলাগুলোয় পানিতে লবণাক্ততা ক্রমাগত বাড়ছে

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান প্রভাব হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় লবণাক্ততা বৃদ্ধি।

বাংলাদেশের বৃহত্তর খুলনা বরিশাল এবং ভোলার মতো জেলাগুলোয় লবণাক্ততা অনেক দিনের সমস্যা - কিন্তু এ অঞ্চলে কৃষির সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দৃশ্যত: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই লবণাক্ততা সম্প্রতি বাড়ছে, এবং তাতে এখানকার কৃষিতে গভীর ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন হচ্ছে।

পোল্যান্ডের কাটোভিচ শহরে সোমবার শুরু হয়েছে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন যাতে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হচ্ছে যে জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এখন মানবসভ্যতার প্রতি বিশ্বের অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর বাংলাদেশ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সর্বোচ্চ ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর একটি।

"বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার উপকুলীয় জেলাগুলোর নিচু এলাকাসমূহ - সেখানে লোনা পানি ধরে যাচ্ছে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য। সেখানে অনেকে লোনা পানি থেকে বাধ্য হচ্ছে, কৃষিতে পরিবর্তন হচ্ছে - যা আগে ছিল না। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যই হচ্ছে এটা" - কাটোভিচ থেকে বলছিলেন, পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. সালিমুল হক।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

বাংলাদেশ আছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশের তালিকায়
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশ আছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশের তালিকায়

তিনি বলছেন, ওই এলাকাগুলোতে এখন লোকেরা লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে এমন প্রজাতির ধান চাষ করছে, অনেকে ধান ছেড়ে চিংড়ি চাষ করছে, কোথাও বা বৃষ্টির পানি ধরে রাখা হচ্ছে।

তার কথায়, পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেবার অনেক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

"কিন্তু মনে রাখতে হবে এ্যাডাপটেশনের একটা সীমা আছে। নোনা পানি আরো বেড়ে গেলে ওখানে আর লোক বাস করতে পারবে না" - বলেন ড সালিমুল হক।

কিভাবে এই পরিবর্তন অনুভব করছেন ওই সব এলাকার লোকেরা?

কথা বলেছিলাম ভোলার চরফ্যাশনের একজন কৃষক মোহাম্মদ সোলায়মানের সাথে।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

কুতুবদিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার দাবিতে প্ল্যাকার্ড তুলে ধরেছে বাসিন্দারা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কুতুবদিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার দাবিতে প্ল্যাকার্ড তুলে ধরেছে বাসিন্দারা

"এই এলাকায় ফাল্গুন-চৈত্র মাস থেকেই লোনা পানি ঢুকতে থাকে। বিশেষ করে যেসব জায়গায় বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে সেই এলাকাগুলোয় লবণাক্ততা বড় সমস্যা" - বলছিলেন তিনি।

তার মতে ঢালচর, চর কুকরিমুকরি, চর মাদ্রাজ, আসলামপুর - এরকম কয়েকটি ইউনিয়নে এ সমস্যা বেশি। গত চার-পাঁচ বছরে এ সমস্যা বেড়েছে বলেও জানান তিনি।

'জলবায়ু পরিবর্তন আর নদী-ভাঙন এ কারণেই লবণাক্ততা'

লবণাক্ততার কারণে কিভাবে এলাকাগুলোতে কৃষির ধরণ পাল্টে যাচ্ছে - এ প্রশ্ন করেছিলাম পটুয়াখালী জেলার সরকারি কৃষি কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন ভুঁইয়াকে।

তিনি বলছিলেন, কলাপাড়া ও আমতলী উপজেলা দুটির কথা।

তিনি বলছিলেন, আগে যেখানে ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখের পর লোনা পানি ঢুকতো, এখন দেখা যাচ্ছে সময়টা এগিয়ে এসেছে - জানুয়ারির ১৫ তারিখের পর থেকেই আন্ধারমানিক নদীর খালগুলোতে লোনা পানি ঢুকতে থাকে। এর পাশাপাশি লোনা পানি আটকানোর অনেক বাঁধ-স্লুইস গেট ভেঙে গেছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

"ফলে মিঠা পানির অভাবে ওই এলাকায় বোরো চাষ করা যাচ্ছে না।"

উপকুলের জেলাগুলোতে বহু জায়গাতেই বাঁধ ভেঙে লোনা পানি চাষের জমিতে ঢুকে পড়ছে

ছবির উৎস, Barcroft Media

ছবির ক্যাপশান, উপকুলের জেলাগুলোতে বহু জায়গাতেই বাঁধ ভেঙে লোনা পানি চাষের জমিতে ঢুকে পড়ছে

তিনি বলছিলেন, একসময় ৭০-৮০র দশকে এই এলাকায় সরকারি কৃষি বিভাগের ৮০০-র বেশি পাম্প কাজ করতো, কিন্তু এখন কাজ করে মাত্র ৬০-৭০টি। এতেই বোঝা যায়, কিভাবে বোরো চাষ ছেড়ে দিচ্ছেন চাষীরা।

তিনি বলেন, অনেকে ওই সময়টায় ধানের পরিবর্তে তরমুজ চাষ করছেন।

সরকারের কৃষি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মি. ভুঁইয়ার মতে, বৃষ্টিপাতের সময়ও বদলে যাচ্ছে। আগের মত আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে বর্ষাকাল শুরু হচ্ছে না। বৃষ্টি হচ্ছে ভাদ্র মাস নাগাদ।

'জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া এখন বাস্তব অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে'

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর বিজ্ঞানীদের তথ্য-উপাত্ত বা একাডেমিক গবেষণার পর্যায়ে নেই। এর প্রতিক্রিয়া এখন একেবারে বাস্তব, সবাই চোখে দেখতে পাচ্ছেন, অনুভব করতে পারছেন।

নদী ভাঙনের কারণে বাংলাদেশে জনগোষ্ঠীর জীবন ও কৃষি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN

ছবির ক্যাপশান, নদী ভাঙনের কারণে বাংলাদেশে জনগোষ্ঠীর জীবন ও কৃষি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে

পোল্যান্ডে সোমবার শুরু হয়েছে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন যাতে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হচ্ছে যে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এখন মানবসভ্যতার প্রতি বিশ্বের অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেক আগেই বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর আবহাওয়া চরম-ভাবাপন্ন হয়ে যাবে।

গত কয়েক বছরের সংবাদমাধ্যমের খবর দেখলে অনেকেরই মনে হবে: সেই দিন হয়তো এসে গেছে।

পৃথিবীর কোথাও এখন অস্বাভাবিক গরম পড়ছে, কোথাও অস্বাভাবিক ঠান্ডা পড়ছে, কোথাও বন্যা, কোথাও বছরের পর বছর ধরে খরা হচ্ছে, কোথাও আবার ঘন ঘন দাবানল সৃষ্টি হচ্ছে। নিয়মিত সংবাদ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে এসব খবর।

ড. সালিমুল হক বলছেন, গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন যে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এগুলো হচ্ছে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ২০১৮ সালে পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রায় এক ডিগ্রি বেশি। ২০১৫ থেকে প্রতি বছরই পৃথিবীর উষ্ণতম বছরের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে ফসলের প্যাটার্ন বদলে যাচ্ছে - বলছেন কৃষকরা

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN

ছবির ক্যাপশান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে ফসলের প্যাটার্ন বদলে যাচ্ছে - বলছেন কৃষকরা

ড. সালিমুল হক বলছেন, আবহাওয়ায় যে চরম প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তা এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণেই ঘটছে।

বিজ্ঞানীদের মতে এভাবে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি বেড়ে যাবে।

জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্ত:সরকার প্যানেল আইপিসিসি বলছে, এখনই যদি পৃথিবীর দেশগুলো এ নিযে কার্যকর উদ্যোগ না নেয় - তাহলে পৃথিবীতে দুর্যোগ নেমে আসবে, সমুদ্রে পানির স্তর বেড়ে যাবে, সমুদ্রে পানির তাপমাত্রা এবং অম্লতা বেড়ে যাবে, ধান-গম-ভুট্টার মতো ফসল ফলানোর ক্ষমতা বিপন্ন হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা এখন এমনভাবে বাড়ছে যে ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রির মধ্যে সীমিত রাখার যে লক্ষ্যমাত্রা ঘোষিত হয়েছিল তাতে আর কাজ হচ্ছে না।

এখন অতীতের যে কোন সময়ের চাইতে বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।