ভারতের রাজস্থানে ভোটের আগে সামাজিক মাধ্যমে 'হিন্দু গণহত্যার' ভাইরাল বার্তা

দিল্লিতে ১৯৬৬ সালে গোহত্যাবিরোধী আইনের দাবিতে সেই বিক্ষোভ

ছবির উৎস, SOCIAL MEDIA/VIRAL POST

ছবির ক্যাপশান, দিল্লিতে ১৯৬৬ সালে গোহত্যাবিরোধী আইনের দাবিতে সেই বিক্ষোভ

ভারতের রাজস্থানে - যেখানে বিধানসভা নির্বাচনে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি চাপের মুখে আছে বলে মনে করা হয় - সামাজিক মাধ্যমে 'ভাইরাল' হওয়া এক বার্তায় দাবি করা হচ্ছে যে ১৯৬৬ সালে ইন্দিরা গান্ধীর শাসনমলে 'মুসলমানদের খুশি করতে' দিল্লিতে 'হিন্দু গণহত্যা' হয়েছিল ।

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ১৯৬৬ সালের ৭ই নভেম্বর গো-হত্যা বন্ধের আইন করার দাবিতে সত্যিই এক বিক্ষোভ হয়েছিল, এবং তাতে পুলিশ গুলি চালালে সরকারি তথ্যমতে অন্তত ৭ জন নিহত হয়। তখন মাত্র ১০ মাস আগে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওই ঘটনার ব্যাপারে অনলাইন বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ার নিবন্ধে যে নিহতের সংখ্যা ছিল - তা গত ক'দিনের মধ্যে পাল্টে ফেলে ৭ থেকে বাড়িয়ে ৫,০০০ করে দেয়া হয়েছে।

ভারতের কয়েকটি রাজ্যে এখন চলছে বিধানসভা নির্বাচন। এর মধ্যে তিনটি রাজ্যে আছে বিজেপির সরকার - যার মধ্যে রাজস্থানে তারা বেশ চাপে রয়েছে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

এই রকম এক পরিস্থিতিতেই শুক্রবার রাজস্থানে টুইটার, ফেসবুক আর হোয়াটস্অ্যাপে কয়েকটি ছবিসহ 'ভাইরাল' বা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে একটি বার্তা ।

ছবিটির সাথে দেয়া বার্তায় লেখা রয়েছে, "আপনি কি জানেন, মুসলমানদের খুশি করতে ১৯৬৬ সালের ৭ নভেম্বর গোহত্যা বন্ধের দাবী জানাতে সংসদ অভিযানে যাওয়া ৫০০০ সাধু-সন্তকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী? হাজার হাজার সাধুসন্তকে গুলিতে জখম করে দেওয়া হয়েছিল। স্বাধীন ভারতে ওটাই ছিল সবথেকে বড় ও নৃশংস হত্যাকান্ড। মানুষ জালিয়ানওয়ালাবাগের ইতিহাস জানে, কিন্তু সংসদ ভবনের সামনে হাজার হাজার সাধু সন্তের এই ঘটনা লোকে জানেই না।"

বেশ কয়েকটা হ্যাশট্যাগ দিয়ে সহজেই গুগল সহ অন্য সামাজিক মাধ্যমগুলিতে এই বার্তাটি পাওয়া যাচ্ছে।

কয়েকজনের পোস্টে উইকিপিডিয়ার একটি পৃষ্ঠার লিঙ্ক দেয়া হয়েছে।

আরো পড়তে পারেন:

টুইটার, ফেসবুক আর হোয়াটস্অ্যাপে ভাইরাল হওয়া সেই বার্তা

ছবির উৎস, VIRAL POST GRAB

ছবির ক্যাপশান, টুইটার, ফেসবুক আর হোয়াটস্অ্যাপে ভাইরাল হওয়া সেই বার্তা

বিবিসি বাংলায় এ নিয়ে আরো পড়তে পারেন:

উইকিপিডিয়ার ওই পাতায় গিয়ে দেখা যাচ্ছে এই বর্ণনা: 'গোহত্যা বিরোধী ওই আন্দোলনে তিন থেকে সাত লক্ষ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ সংসদ ভবন ঘেরাও করলে পুলিশ গুলি চালিয়ে ৩৭৫ থেকে ৫০০০ মানুষকে মেরে ফেলে। আহত হয়েছিলেন প্রায় দশ হাজার মানুষ।'

ওই পৃষ্ঠাটি ভাল করে দেখলে জানতে পারবেন, ২২ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে ওই বিবরণ শেষবার পাল্টানো হয়েছে।

এর আগে ওই পৃষ্ঠাতেই লেখা হয়েছিল, কর্মকর্তাদের দেওয়া হিসাবে, ওই ঘটনায় সাত জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেই সংখ্যাটিই বাড়িয়ে ৩৭৫ করে দেওয়া হয় ২২ নভেম্বর।

বিবিসি হিন্দির সাংবাদিকরা ভাইরাল হওয়া ছবিগুলি পরীক্ষা করেছেন।

এতে দেখা যায়, দক্ষিণপন্থী মতামতে বিশ্বাসী কয়েকটি ফেসবুক পেজ থেকে এই ছবিগুলি একটা নির্দিষ্ট কায়দায় শেয়ার করা হয়েছে। কয়েকটা পোস্ট আবার ২০১৪-১৫ সালের।

১৯৬৬ সালের ওই ঘটনা নিয়ে যত পোস্ট চোখে পড়ছে, সেগুলিতে বক্তব্য মোটামুটি এক - গোহত্যার ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারির দাবিতে নিজেদের প্রাণ বাজি রেখেছিলেন হিন্দু সাধুসন্তরা, কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন।

কেউ কেউ আবার ১৯৮৪-র শিখ দাঙ্গার সঙ্গেও ১৯৬৬ সালের এই ঘটনার তুলনা টেনেছেন।

কতজনের মৃত্যু হয়েছিল ১৯৬৬ সালের ওই ঘটনায়, তা নিয়েও ছড়িয়ে পড়া মেসেজগুলিতে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা দেখা গেছে। কেউ লিখেছেন, মৃতের সংখ্যা এক হাজার, কেউ লিখেছেন ২৫০।

ইন্দিরা গান্ধী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইন্দিরা গান্ধী

ভাইরাল হয়ে যাওয়া ছবি আর তথ্যগুলি আমরা যাচাই করে দেখেছি।

১৯৬৬-র সাত নভেম্বরের ঘটনা বলে যে ছবিগুলি ভাইরাল হয়েছে, সেগুলো যে ওই দিনের অশান্তিরই, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ইন্ডিয়া গেটের মধ্যবর্তী অঞ্চলে যে রাজপথ নামের প্রশস্ত রাস্তা আছে, সেখানকার এবং তার পাশের সবুজ ঘাসের বাগিচার এলাকায় তোলা হয়েছে ওই ছবিগুলি।

কিন্তু সেদিন আসলে কী হয়েছিল, তা জানাচ্ছিলেন ইতিহাসবিদ হরবংশ মুখিয়া।

"গোটা দেশেই গোহত্যার বিরুদ্ধে একটা আইন আনার দাবী তোলা হচ্ছিল ১৯৬৬ সালে। অনেকে মনে করেছিলেন যে একা একটা অজুহাত মাত্র। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কথাও অনেকে মনে করেছিলেন, কারণ তার কিছুদিন আগেই ইন্দিরা গান্ধী সক্রিয় রাজনীতিতে এসেছেন আর তাঁর বিরোধীরা 'গুঙ্গি গুড়িয়া' বা বোবা পুতুল বলে বিদ্রুপ করতে শুরু করেছে। কংগ্রেস দলের ভেতরেও অনেকে এই বিদ্রুপে অংশ নিতেন।"

"প্রথম থেকেই ইন্দিরা গান্ধীকে একটা অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল," বলছিলেন অধ্যাপক মুখিয়া।

দিল্লির কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভকারীরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লির কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভকারীরা

তার মতে, ৭ নভেম্বরের ঘটনা কোনও নিয়ন্ত্রিত আন্দোলন বা বিক্ষোভ ছিল না, পরিকল্পনা করে অশান্তি তৈরি করা হয়েছিল সেদিন।

"যতটা কম সময়ের মধ্যে ওই আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল, ততটাই দ্রুত মানুষ ওই ঘটনা ভুলেও গিয়েছিল," বলছিলেন হরবংশ মুখিয়া।

সিনিয়ার সাংবাদিক রশিদ কিদওয়াইয়ের অন্যতম একটি পরিচিত বই হল 'ব্যালট: টেন এপিসোডস দ্যাট হ্যাভ শেপড ইন্ডিয়ান ডেমোক্র্যাসি', অর্থাৎ যে দশটি ঘটনা ভারতের গণতন্ত্রের কাঠামো গড়েছিল।

ওই বইতে মি. কিদওয়াই ৭ নভেম্বর, ১৯৬৬-র কিছুটা বর্ণনা দিয়েছেন।

বিবিসিকে তিনি বিশদে জানিয়েছেন, "হরিয়ানার কারনাল জেলা থেকে নির্বাচিত জনসংঘের (বিজেপির পূর্বসুরী, আর এস এসের মতাদর্শের অনুসারী প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন) সংসদ সদস্য স্বামী রামেশ্বরানন্দ ওই কথিত আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাদের দাবি ছিল দেশে একটা আইন তৈরি করা হোক, যার মাধ্যমে গোহত্যাকে অপরাধ বলে গণ্য করা যায়। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আর এস এসও এই দাবীর পক্ষে দাঁড়িয়েছিল।"

"কয়েক হাজার সাধু-সন্ত এই দাবি নিয়ে দিল্লিতে হাজির হয় আর সেদিন সরকারী সম্পত্তির ক্ষতি করা হয়েছিল, মন্ত্রণালয় ভবনগুলির বাইরের দিকে ভাঙচুর করা হয়েছিল, সংসদের ভেতরেও ঢুকে পড়ার চেষ্টা করেছিল তারা। ভারতীয় ইতিহাসে সেটাই ছিল সংসদের ওপরে প্রথম হামলা। সংসদ ভবন রক্ষা করতেই পুলিশ গুলি চালায়, যাতে ৭ জন মারা গিয়েছিলেন। কয়েকটা কাগজে বোধহয় ৮-৯ জনের মৃত্যুর খবরও লেখা হয়েছিল, কিন্তু সংখ্যাটা কখনই দশের বেশি নয়," বলছিলেন রশিদ কিদওয়াই।

হরবংশ মুখিয়াও বলছিলেন যে মৃতের সংখ্যা কোনওমতেই দশের ওপরে যায় নি।

ওই দিনের অনেকগুলি দেশী, বিদেশী সংবাদপত্রের রিপোর্টও আমরা খতিয়ে দেখেছি।

ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী গুলজারি লাল নন্দ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী গুলজারি লাল নন্দ

মোটামুটি সবগুলিতেই দেখা যাচ্ছে যে সংসদের ভেতরে ঢুকে পড়ার প্রচেষ্টার কথা লেখা হয়েছে, গুলি চালনার পরে দিল্লিতে কার্ফূ জারি করার খবর আছে, বিক্ষোভকারীরা যে সরকারী গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন, সেটাও রয়েছে খবরে।

রশিদ কিদওয়াই আরও জানাচ্ছিলেন যে বেশিরভাগ বিক্ষোভকারীকেই পুলিশ বাসে চাপিয়ে ছেড়ে দিয়ে এসেছিল শহরের বাইরে এখন যেখানে গুরগাও, সেই অঞ্চলে মেহরৌলি-আরাবল্লী পাহাড়ের জঙ্গলে। তবে কারও বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে নি পুলিশ।

"ওই ঘটনার পরেই ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী গুলজারি লাল নন্দকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। অনেকে বলেন, ইন্দিরা গান্ধী মি. নন্দকে আগেই বলেছিলেন যে আন্দোলনকারীদের মোকাবিলায় যাতে সব ধরণের প্রস্তুতি রাখা হয়। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও মি. নন্দ ছিলেন 'ভারত সাধু সমাজ'-এর অধ্যক্ষ। তাই তিনি হয়তো ভেবেছিলেন যে আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই আন্দোলনকারীদের নিরস্ত করা যাবে," বলছিলেন রশিদ কিদওয়াই।

ওই ঘটনা যে এই প্রথমবার নির্বাচনের আগে প্রচারে এলো - তা নয়।

হরবংশ মুখিয়া এবং মি. কিদওয়াই দুজনেই জানিয়েছেন, যে ১৯৭১ এর নির্বাচনী প্রচারেও আরএসএস এবং জনসংঘ গ্রামে গ্রামে ৬৬ সালের ওই ঘটনার কথা বলত।

কিন্তু কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ওই প্রচার তখন মোটেই দানা বাঁধে নি।

(ভারতে ভুয়ো সংবাদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য 'একতা নিউজরুম' প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত এই প্রতিবেদনটি। যদি আপনার কাছে এরকম কোনও খবর, বার্তা, ছবি বা দাবি কেউ করেন, যা নিয়ে আপনার মনে সন্দেহ রয়েছে, তাহলে সেটির সত্যতা যাচাই করতে আপনি ওই বার্তাটি 'একতা নিউজরুমে' পাঠিয়ে দিতে পারেন এই হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে: +৯১ ৮৯২৯০২৩৬২৫)