রোহিঙ্গা-সমস্যার মতোই সঙ্কট তৈরি হতে পারে ভারতের আসামে: আশঙ্কা গবেষকদের

এনআরসির প্রথম খসড়ায় নাম আছে কিনা জানতে এসেছেন একজন

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, এনআরসির প্রথম খসড়ায় নাম আছে কিনা জানতে এসেছেন একজন
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি, কলকাতা

ভারতের আসামে যে কয়েকলক্ষ মানুষ জাতীয় নাগরিকপঞ্জী বা এনআরসি থেকে বাদ যাওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন, তারা যদি সত্যি রাষ্ট্রবিহীন হয়ে পড়েন, তাহলে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের মতোই আরেকটা শরণার্থী সঙ্কট তৈরি হতে পারে - মনে করছেন গবেষকরা।

মানবাধিকার গবেষক এবং শরণার্থী বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন , ১৯৮২ সালে তৈরী হওয়া মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন নিয়ে সময়মতো মাথা ঘামানো হলে হয়তো রোহিঙ্গাদের নিয়ে এতবড় সঙ্কট তৈরি হত না।

তবে সেই একই অবস্থা যাতে আবারও আসামের মানুষদের না হয়, তারজন্য এখনই প্রয়োজন আঞ্চলিক স্তরে সুষ্ঠু মানবাধিকার ব্যবস্থাপনার, যেমনটা তৈরি হয়েছে আফ্রিকায়, বলছেন কলকাতায় একটি আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রে যোগ দিতে আসা গবেষকরা।

তারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে যে সঙ্কট তৈরি হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়, তা আবারও দেখা দিতে পারে উত্তরপূর্ব ভারতের আসামে। সেখানে জাতীয় নাগরিক পঞ্জীর খসড়া তালিকা থেকে যে ৪০ লক্ষ মানুষ বাদ গেছেন, তাদের একটা অংশও যদি সত্যিই রাষ্ট্রবিহীন হয়ে যান, তাহলে নতুন করে সঙ্কট দেখা দেবে গোটা অঞ্চলেই।

তাই সময় থাকতেই গবেষক আর মানবাধিকার কর্মীদের উচিত এ নিয়ে সরব হওয়া।

কলকাতায় আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রে আগত গবেষকরা
ছবির ক্যাপশান, কলকাতায় আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রে আগত গবেষকরা

কলকাতায় এই নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রে যোগ দিতে এসে বাংলাদেশের রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস এর গবেষক অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতা বলছিলেন, "মিয়ানমার যখন নতুন নাগরিকত্ব আইন বানালো ১৯৮২ সালে আর তারপর থেকে ওই আইন কার্যকর হতে শুরু করল রোহিঙ্গাদের ওপরে, তখন আমরা কেউই নজর দিই নি।"

"আইন তৈরীর অন্তত দশ বছর পর থেকে শরণার্থী আসা শুরু হয়েছিল। সময়মতো যদি ওই আইনটা বিশ্লেষণ করা যেত তাহলে এত বড় সঙ্কট হয়তো তৈরী হত না। সেকথাটা মাথায় রেখেই আসামের দিকে নজর দেওয়া দরকার"- বলছিলেন মেঘনা গুহ ঠাকুরতা।

"দক্ষিণ এশিয়ার শরণার্থী সঙ্কট তো এখন বাংলার দোরগোড়ায় - দুই বাংলার ক্ষেত্রেই কথাটা প্রযোজ্য। একদিকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা, আর এদিকে আসামে। তাই খুব তাড়াতাড়ি প্রয়োজন এমন একটা মানবাধিকার পরিকাঠামো, যাতে এই সঙ্কটাপন্ন মানুষদের অধিকার রক্ষা করা যায়।"

আসাম রাজ্যের মুসলিমদের মধ্যেও রয়েছে এনআরসি নিয়ে ভীতি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আসাম রাজ্যের মুসলিমদের মধ্যেও রয়েছে এনআরসি নিয়ে ভীতি

"কোনও একটি দেশ কী করল, কী অধিকার দিল, সেদিকে না তাকিয়ে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই প্রয়োজন মানবাধিকার সুরক্ষার এই পরিকাঠামোটা," বলছিলেন মেঘনা গুহ ঠাকুরতা।

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরী বলছিলেন, আসামের কয়েক লক্ষ মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন যে তারা রাষ্ট্রবিহীন হয়ে যেতে পারেন। সেই রাষ্ট্রবিহীন মানুষরা আন্তর্জাতিক কতটা আইনী অধিকার পাবেন, বা আদৌ পাবেন কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।

"যে ৪০ লক্ষ মানুষের নাম খসড়া নাগরিক পঞ্জী থেকে বাদ পড়েছে, তাদের একটা অংশ - ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষও যদি শেষমেশ নাগরিকত্বহীন, রাষ্ট্রবিহীন হয়ে পড়েন, সেই সংখ্যাটা কিন্তু বিরাট। এঁরা যাবেন কোথায়? বাংলাদেশ ফেরত নেবে না, তাহলে ভারতেই থাকতে হবে, অথচ নাগরিকত্ব থাকবে না।"

"এর মধ্যেও আবার যারা প্রমাণ করতে পারবেন যে তারা সত্যিই রাষ্ট্রবিহীন, তাঁদের কিছুটা হলেও রক্ষাকবচ রয়েছে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী। কিন্তু যারা রাষ্ট্রবিহীন অবস্থাটাও প্রমাণ করতে পারবে না, তাদের অবস্থাটা হবে সবথেকে করুণ," বলছিলেন অধ্যাপক বসু রায়চৌধুরী।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

ভারতের আসামে কয়েকলক্ষ মানুষ জাতীয় নাগরিকপঞ্জী থেকে বাদ যাওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতের আসামে কয়েকলক্ষ মানুষ জাতীয় নাগরিকপঞ্জী থেকে বাদ যাওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন

শরণার্থী সঙ্কটের ক্ষেত্রে সবথেকে বেশি করে যদিও মিয়ানমারের নাম এখন আলোচিত হচ্ছে, তবে এর আগেও শরণার্থী সঙ্কট তৈরী করেছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশও।

টরোন্টোর ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর রেফেউজি স্টাাডিজের অধ্যাপক জেনিফার হেইন্ডম্যান বলছিলেন, "মিয়ানমারের বিষয়টা এখন আলোচিত হচ্ছে সবথেকে বেশি, যে তাদের একটা আইনের ফলে এই শরণার্থী সঙ্কট। কিন্তু এর আগেও ভূটানও তো একই জিনিষ করেছে।"

"নেপালীদের সেখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল আশির দশকের শেষ দিক থেকে। তাই শুধু কোনও দেশের খারাপ আইনের কথা বললে হবে না, প্রয়োজন আঞ্চলিক স্তরে একটি কাঠামোর - যার মাধ্যমে শরণার্থী তৈরির জন্য কারা দায়ী, তাদের নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যাবে।"

এন আর সির প্রথম খসড়া প্রকাশের দিন নাম উঠেছে কিনা দেখতে আসা লোকের ভিড় কামরূপের গুমি গ্রামে

ছবির উৎস, KULENDU KALITA

ছবির ক্যাপশান, এন আর সির প্রথম খসড়া প্রকাশের দিন নাম উঠেছে কিনা দেখতে আসা লোকের ভিড় কামরূপের গুমি গ্রামে

দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে যে হারে বাধ্য হয়ে মানুষ দেশান্তরী হচ্ছেন বা নাগরিকদের রাষ্ট্রবিহীন হতে হচ্ছে, তা রুখতে আঞ্চলিক স্তরে মানবাধিকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা আশু প্রয়োজন বলে মনে করছেন মানবাধিকার বিষেশজ্ঞ ও গবেষকরা।

দুদিনের একটি আন্তর্জাতিক আলোচনা চক্রের শেষে 'কলকাতা সনদ' নামে দেশান্তরণ ও শরণার্থীদের অধিকার রক্ষার জন্য যে দাবীসমূহ প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে এই 'আঞ্চলিক মানবাধিকার ব্যবস্থাপনা' গড়ে তোলার ওপরেই সবথেকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে আফ্রিকায় কীভাবে আঞ্চলিক স্তরে মানবাধিকার রক্ষা এবং শরণার্থী অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে, সেই কথাটা জানাচ্ছিলেন আফ্রিকার রোডস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও মানবাধিকার আইন বিশেষজ্ঞ লরেন্স জুমা।