যেভাবে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টকে হটিয়ে দ্বিতীয় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে বিজেপি

বামফ্রন্ট আর কংগ্রেসের শূন্যস্থান কি বিজেপির দখলে যাবে?

ছবির উৎস, DIPTENDU DUTTA/AFP/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বামফ্রন্ট আর কংগ্রেসের শূন্যস্থান কি বিজেপির দখলে যাবে?
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি, কলকাতা

ভারতের রাজস্থানে সদ্য সমাপ্ত তিনটি উপনির্বাচনে বিজেপি পরাজিত হয়েছে - এ নিয়ে সেদেশের জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলিতে যথেষ্ট চর্চা হচ্ছে। হওয়ার কথাও, কারণ দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি শাসিত ওই রাজ্যে এবছরই রয়েছে বিধানসভার নির্বাচন।

কিন্তু বৃহস্পতিবার, একই সঙ্গে ফল ঘোষিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের দুটি উপনির্বাচনেরও। বিজেপি সেখানেও হেরেছে, কিন্তু দ্বিতীয় স্থান দখল করতে সমর্থ হয়েছে।

হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়াতে লোকসভা আর উত্তর চব্বিশ পরগণার নোয়াপাড়ায় বিধানসভা উপনির্বাচনের ফলাফল নিয়ে শাসক বা বিরোধী দল - কেউই খুব একটা চিন্তিত ছিলেন না। আশা করাই গিয়েছিল যে দুটি ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসই জিতে যাবে - হয়েছেও তাই।

কিন্তু ভোটের বিস্তারিত ফলাফল সামনে আসার পরে যেটা অনেকের কপালে ভাঁজ ফেলেছে, অথবা অন্য কারও মুখে হাসি - সেটা হল ভারতীয় জনতা পার্টির ভোট শেয়ার বৃদ্ধি।

দুটি আসনেই তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে অনেকটা পিছিয়ে - তবুও উলুবেড়িয়াতে তারা ২৩% আর নোয়াপাড়ায় ২০% ভোট পেয়েছে।

আগের নির্বাচনের থেকে যথাক্রমে ১১.৫ আর সাত শতাংশ ভোট বেড়েছে বিজেপির।

ভোট বেড়েছে তৃণমূল কংগ্রেসেরও।

আরও পড়ুন:

দলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে মমতা ব্যানার্জি।

ছবির উৎস, PIB

ছবির ক্যাপশান, দলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে মমতা ব্যানার্জি।

কিন্তু ২০১৬ সালের পর থেকে যেভাবে প্রতিটা নির্বাচনেই বিজেপি তাদের ভোট বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে, আর মোটামুটি ভাবে দ্বিতীয় স্থানটা ধরে রাখতে পারছে, তা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটা নতুন ঘটনা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিমল শঙ্কর নন্দ বলছিলেন, "দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থানে বিজেপি থাকতে পারছে কী না, সেটা আমার কাছে একেবারেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেটা গুরুত্বের, তা হল, দলটা কিন্তু ধারাবাহিকভাবে ভোট বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে। বিগত বেশ কয়েকটা নির্বাচনের ফল দেখলেই সেটা স্পষ্ট হবে।"

উলুবেড়িয়া আর নোয়াপাড়ার আগেও কাথি উপনির্বাচন বা গতবছরের পৌরসভাগুলির নির্বাচনেও আসন সংখ্যার দিক থেকে না হলেও বিজেপি-র ভোটের শেয়ার বৃদ্ধি হয়েই চলেছে। উল্টোদিকে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের ঠিক পরেই বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে যে বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস ছিল তাদের ক্ষয় অব্যাহত রয়েছে।

প্রবীন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার শুভাশীষ মৈত্র ব্যাখ্যা করছিলেন, "২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে যতগুলো ভোট হয়েছে রাজ্যে সবক্ষেত্রেই বিজেপি দ্বিতীয় স্থানটা ধরে রাখছে। কোথাও তৃতীয় হলেও সেটাও খুব কম মার্জিনে। কথা হল বিজেপি-র দিকে ভোটটা আসছে কোথা থেকে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে যে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট তো কমছে না, উল্টে বাড়ছে। আবার প্রতিষ্ঠিত দুটি রাজনৈতিক শক্তি ছিল - বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস, তাদের যতটা ভোট কমছে, সেই ভোটই বিজেপির দিকে যাচ্ছে। তাই কংগ্রেস আর বামেদের ভোটই যে মোটামুটি ভাবে বিজেপি পাচ্ছে, এটা বলা যায়।"

নিজেদের দিকে ভোট কীভাবে টানতে পারছে বিজেপি?

বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি ব্যাখ্যা দেয় যে ভোটারদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটিয়ে ভোট বাড়াচ্ছে বিজেপি তথা হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলি।

পশ্চিমবঙ্গে দিনে দিনে সরব হচ্ছে বিজেপি

ছবির উৎস, Dipendu Dutta

ছবির ক্যাপশান, পশ্চিমবঙ্গে দিনে দিনে সরব হচ্ছে বিজেপি

সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকটি জায়গায় ধর্মীয় এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরী হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলি কোথাও পেশীশক্তি প্রদর্শনের জন্য মিছিলও করেছে।

কিন্তু শুভাশীষ মৈত্রর মতে অন্যান্য রাজ্যের মতো সম্পূর্ণ ধর্মীয় মেরুকরণ পশ্চিমবঙ্গ করা সম্ভব নয়।

তিনি বলছিলেন, "কিছুটা মেরুকরণ তো হয়েইছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা, কিছু মিছিল - এসব দেখেই সেটা বোঝা যায়। কিন্তু এই ভোটে মেরুকরণের ছাপ আমি দেখতে পাচ্ছি না খুব একটা। আর আমার মতে, এটা তো রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের দেশ - এখানে অন্য রাজ্যের মতো ধর্মীয় মেরুকরণ সম্ভবও নয়।"

"আবার বীরভূম বা কোচবিহারের মতো কয়েকটি জেলা থেকে খবর পেয়েছি যে সেখানে মুসলমানদের একটা অংশ - যারা কোনও কারণে তৃণমূল কংগ্রেসের ঘোরতর বিরোধী, তারাও কিন্তু বিজেপি-র দিকে গেছেন। যদিও এটা রাজ্যের সার্বিক চিত্র নয় এবং ওই সব অঞ্চলে মুসলমানদের বিজেপিকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় কিছু ইস্যুই মূলত কাজ করেছে," বলছিলেন মি. মৈত্র।

অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ বলছিলেন, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জড় পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই থেকেছে, কিন্তু বামপন্থীদের প্রভাবে সেটা এতদিন সামনে আসতে পারে নি।

তাঁর কথায়, "সেই স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় থেকেই জাতীয়তাবাদের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদকে ব্যবহার করার হয়েছে পশ্চিমবঙ্গেই। তাই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির দিকে একটা সমর্থন ছিলই। কিন্তু জনসংঘের ব্যর্থতা হল স্বাধীনতার পরে তারা এটাকে কাজে লাগাতে পারে নি - বিশেষত দেশভাগ, উদ্বাস্তুদের সমস্যা - এইসব ইস্যুকে তারা সামনে নিয়ে আসতে পারে নি। যে কাজটা করেছিল কমিউনিস্টরা। মানুষের একটা বিরাট অংশের সমর্থন তাই কমিউনিস্টদের দিকে চলে গিয়েছিল।"

"কিন্তু ২০১১ সালে যখন কমিউনিস্টরা বিদায় নিল পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা থেকে, ওই যে মানুষরা বিরোধী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম খুঁজছিলেন, তারা বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়লেন," বলছিলেন অধ্যাপক নন্দ।

মূলত তারফলেই ক্রমাগত বিজেপি-র ভোট বেড়ে চলেছে বলে মনে করেন তিনি।

একদিকে বাম ও কংগ্রেসের শক্তিক্ষয়, অন্যদিকে বিজেপি-র দ্বিতীয় শক্তি হিসাবে সামনে উঠে আসা - এটাকেই বিশ্লেষকরা এখন পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক ট্রেন্ড বলে মনে করছেন।