সাম্প্রদায়িক রূপ নিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি

ছবির উৎস, PIB
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হানাহানিতে বীরভূম জেলায় রোববার আরও একজন নিহত হয়েছেন, কাছেই আর একটি গ্রামে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও একজন।
ওই জেলার পাড়ুই এলাকায় বিজেপি ও ক্ষমতাসীন তৃণমূলের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘর্ষ চলছে গত বেশ কিছুদিন ধরেই – এবং এই ধরনের সংঘর্ষ ঘটছে রাজ্যের আরও নানা জায়গাতেই।
গত মে মাসে লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই রাজ্যে এই ধরনের সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে, এবং প্রায় সব দলই মানছে এই হিংসার চরিত্রও বেশ আলাদা।
২০১১-র বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গ যে তীব্র রাজনৈতিক হিংসা আর সংঘাত দেখেছিল, অনেকটা সেই ছবিই যেন আবার ফিরে এসেছে সাড়ে তিন বছর পর।
তবে সংঘর্ষটা বেশির ভাগ জায়গাতেই আর তৃণমূল বনাম সিপিএম নয়, ইদানীং তৃণমূলের লড়াই বিজেপি-র সঙ্গেই, লোকসভা নির্বাচনে দেশব্যাপী সাফল্যের পর যারা বিপুল উৎসাহে পশ্চিমবঙ্গেও শক্তি বাড়াতে চাইছে।
সম্প্রতি উপনির্বাচনে জিতে আসা রাজ্যের একমাত্র বিজেপি এমএলএ শমীক ভট্টাচার্য বলছিলেন, ''রাজ্যে যেহেতু সিপিএম এখন আর দৃশ্যমান নয়, তাই দলে দলে মানুষ বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন এবং একটা উদীয়মান শক্তি হিসেবে বিজেপি-কেই সমর্থন করছেন।''
তার দাবি, কাগজে-কলমে রাজ্যে সিপিএম প্রধান বিরোধী দল হতে পারে, কিন্তু গলি থেকে রাজপথ, শিক্ষাঙ্গনের ক্যাম্পাস থেকে চায়ের দোকান সর্বত্রই বিজেপি-কে নিয়ে আলোচনা এবং রাজ্যে তারাই আসল বিরোধী দল।
রাজ্যের মানুষ যে বিজেপি-তে ভিড়ছেন, সে কথা মানছেন তৃণমূলের ডাকসাইটে এমপি শুভেন্দু অধিকারীও। কিন্তু তার মতে এরা যাচ্ছেন সিপিএম থেকেই, আর এদের জন্যই রাজ্যের কোনও কোনও জায়গায় রাজনৈতিক হিংসা মাথাচাড়া দিচ্ছে।
তিনি বলছিলেন, ''এক কালে সিপিএমের যে হার্মাদরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এলাকা দখলের রাজনীতি করত তারাই এখন বিজেপি-র পতাকা নিয়ে হামলা চালাচ্ছে – অর্থাৎ এরা ঠিক বিজেপি নয়, পুরনো সিপিএম।''
টানা সাড়ে তিন দশক রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা সিপিএম রাজ্যের সাম্প্রতিক উপনির্বাচনগুলোতে তিন বা চার নম্বরে শেষ করেছে, রাজ্যে তাদের জনসমর্থনে যে ধস নেমেছে তা মানছেন দলের নেতারাও।
তবে রাজ্য থেকে লোকসভায় দলের মাত্র দুজন এমপি-র একজন মহম্মদ সেলিমের দাবি, বিজেপি-র যে নব্য সমর্থকদের সঙ্গে তৃণমূলের সংঘর্ষ হচ্ছে। এরা আসলে তৃণমূলেই বিক্ষুব্ধ অংশ।
মি. সেলিম বিবিসি-কে বলছিলেন, ''তৃণমূল ভেবেছিল পশ্চিমবঙ্গকে সিপিএম-শূন্য করে দিলেই সব ঝামেলা মিটে যাবে। কিন্তু এখন বীরভূম থেকে শুরু করে রাজ্যের সর্বত্র তৃণমূলের ভেতরই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মাথা চাড়া দিচ্ছে; যারা মমতা ব্যানার্জির ছবি নিয়ে আন্দোলন করছিলেন তাদেরই একটা দল কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ভাবছেন এখন নরেন্দ্র মোদীর ছবি নিয়ে লড়াই করলে বেশি জোর পাওয়া যাবে।''
তিনি আরও আশঙ্কা করছেন, এই সংঘাত তৃণমূল-বিজেপিতেই থেমে থাকবে না, ধীরে ধীরে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষেরও রূপ নেবে।
কারণ, ''বামপন্থাকে নিকেশ করে এখানে যে রাজনীতির জন্ম দেওয়া হয়েছে তাতে ধর্ম আর ধর্মীয় জিগিরকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। আর সেটা আরএসএসের রাজনীতিতেও আছে, মমতা ব্যানার্জির ডিএনএ-তেও আছে,'' বলছিলেন মি. সেলিম।
পশ্চিমবঙ্গে ইদানীংকার রাজনৈতিক হিংসাগুলোতে যে সাম্প্রদায়িক রং লাগানোর চেষ্টা হচ্ছে, সেই অভিযোগ করছে ক্ষমতাসীন তৃণমূলও।
তবে শুভেন্দু অধিকারীর ধারণা এই চেষ্টা ব্যর্থ হবে, কারণ ''এ রাজ্যের ইতিহাস বলে হিন্দু মহাসভা বা মুসলিম লীগ কেউই প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। এখন বিজেপি বা সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীদের মুসলিম সংগঠনও পারবে না।''
বিজেপি অবশ্য দাবি করছে, মুসলিমরাও দলে দলে তাদের দিকে ভিড়ছেন এবং বিশেষ করে বীরভূমে তাদের যে সমর্থকরা হতাহত হয়েছেন তারা প্রায় সবাই মুসলিম।
কিন্তু সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপে নতুন চেহারায় যে সহিংসতা জেঁকে বসছে, কোনও দলই তা অস্বীকার করছে না।








