আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে কী কী থাকছে?
প্রায় দুই দশক ধরে আলোচনার পরে ভারত আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যেই ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হল।
এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপের ২৭টি দেশের সঙ্গে জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের বৃহত্তম দেশ ভারতের পণ্যের মুক্ত বাণিজ্য শুরু হবে। ইইউ এবং ভারত মিলিত ভাবে বিশ্বের ২৫ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন তাদের দখলে রেখেছে এবং এদের হাতেই আছে দুশো কোটি ক্রেতার এক অতি বৃহৎ বাজার।
চুক্তিটা অবশ্য এখনই সই হচ্ছে না। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং ইইউ-র সদস্য দেশগুলি এই চুক্তিতে মান্যতা দিলে তারপরে, এবছরেরই পরের দিকে চুক্তি সই হতে পারে।
এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বিভিন্ন পণ্য ও পরিষেবায় বিপুল অঙ্কের শুল্ক কম হবে, আবার সামরিক ক্ষেত্রেও ভারত আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট এন্তোনিয়ো লুই সান্তোস দ্য কোস্টা এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উর্সুলা ভন ডের লেয়ন মঙ্গলবার ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দিল্লিতে এক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন।
মি. মোদী বলেছেন, "আজ ভারতের ইতিহাসে বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। আজ ২৭ তারিখ আর এটা অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের সঙ্গে ভারত এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করল।"
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
কী কী থাকছে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে?
ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বেশিরভাগ রাসায়নিক, যন্ত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, বিমান ও মহাকাশযান রফতানিতে ধীরে ধীরে শুল্ক কমিয়ে এনে তা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে।
ইউরোপে তৈরি গাড়ি রফতানির ক্ষেত্রে এখন ১১০ শতাংশ হারে শুল্ক দিতে হয় ভারতে, তা নামিয়ে আনা হবে মাত্র ১০ শতাংশে। তবে এর ক্ষেত্রে বছরে আড়াই লক্ষ গাড়ি রফতানির একটা সীমা বেঁধে দেওয়া হবে।
সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে যে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে গত জুলাই মাসে একটি চুক্তির ফলে সেদেশে তৈরি গাড়ি ভারতে রফতানির সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩৭ হাজারে।
ওয়াইন, বিয়ারের মতো মদ এবং অলিভ তেল ইইউ থেকে আমদানির ক্ষেত্রেও শুল্ক ছাড় দেবে ভারত।
আবার ভারত থেকে যত রফতানি হবে, প্রায় সব পণ্যই ইইউতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাবে বলে জানিয়েছে দিল্লি। এগুলির মধ্যে থাকবে বস্ত্র, চামড়াজাত পণ্য, সামুদ্রিক পণ্য, হস্তশিল্প, গয়না ও রত্ন রফতানির ক্ষেত্রে হয় শুল্ক কমানো হবে বা নিঃশুল্ক হবে।
চা, কফি, মশলা এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে যেমন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সুবিধা পাবে ভারত, অন্যদিকে দুগ্ধজাত পণ্য, খাদ্যশস্য, পোল্ট্রিজাত পণ্য, সয়াবিন সহ কিছু খাদ্যপণ্য ও সবজির ক্ষেত্রে ভারত বিচক্ষণতার সঙ্গে সুরক্ষা কবচ রেখেছে যাতে দেশীয় প্রয়োজন আর রফতানি বাণিজ্যের মধ্যে একটা ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।
দিল্লি আর ব্রাসেলস এও সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে পেশাজীবীদের জন্য স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণের ক্ষেত্র যাতায়াতের নিয়ম সহজতর করা হবে।
এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে 'মাদার অফ অল ডিলস্', অর্থাৎ সব চুক্তির সেরা চুক্তি বলে বর্ণনা করা হচ্ছে দুই পক্ষে থেকেই।
ভারত আর ইইউ – কোন পক্ষ কী কী সুবিধা পাবে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে শ্রম-নিবিড় যে সব শিল্প আছে, যেমন চিংড়ি চাষ, বস্ত্র শিল্প, গয়না ও রত্ন – এইসব ক্ষেত্রগুলি ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ফলে লাভবান হবে। এই ক্ষেত্রগুলিই যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া শুল্কের কারণে সবথেকে সমস্যায় পড়েছিল।
কয়েকজন বিশ্লেষক অবশ্য এটাও বলছেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কড়া নিয়মকানুন আর মানের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সমস্যাও হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ মিতালি নিকোর বলেছেন, "পরিবেশের মতো বিষয়ে ইইউ-র নিয়মকানুন অত্যন্ত কড়া। 'কার্বন অফসেটিং' ব্যবস্থা, অর্থাৎ কার্বন নিঃসরণের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাপণার ব্যাপারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সবথেক এগিয়ে আছে। ভারতের উৎপাদানকারীরা হয়ত এর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নন। তাই এই দিকটা সামাল দেওয়ার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।"
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিক থেকে এই চুক্তি কিছুটা নিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি করবে, কয়েকটা ক্ষেত্রে নিরাপদও রাখবে তাদের - বিশেষ করে এমন একটা সময়ে, যখন বিশ্বে একটা টালমাটাল অবস্থা চলছে, তাদের ওপরে অর্থনৈতিক জোর খাটানো হচ্ছে।
জার্মানি আর ফ্রান্স এই চুক্তির ফলে সবথেকে বেশি লাভবান হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কিন্তু এই চুক্তিকে একটা সময়ে যেভাবে 'সর্বোচ্চ পর্যায়ের উচ্চাকাঙ্খী' বাণিজ্য চুক্তি বলে ভাবা হয়েছিল, সেই পর্যায়ে এটি পৌঁছতে পারে নি বলে মনে করেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের এশীয় বিভাগে পরিচালক অ্যান্ড্রু স্মল।
তবে তিনি এটা মানছেন যে ইইউ যে বিশালাকার, দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়া একটা বাজার ধরার যে প্রচেষ্টা শুরু করেছে, তারই একটা ধাপ এই চুক্তি। এটিই চূড়ান্ত 'গন্তব্য' নয় বলে তার মত।
তার কথায়, "দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কতটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, তার একটা ধাপ" এই চুক্তি।
বাণিজ্য চুক্তি ছাড়াও ভারত আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা এবং পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে পৃথক চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং মঙ্গলবার বলেছেন যে, প্রতিরক্ষা ও সামরিক ক্ষেত্র নিয়ে ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট কাজা কালাসের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তিনি।
সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানাচ্ছে যে এইসব আলোচনার মধ্যে আছে সমুদ্র সুরক্ষা, সাইবার হামলার হুমকি এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এমন একটা সময়ে চূড়ান্ত হল যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুই পক্ষই অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে।
বিগত সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্র, ওমান এবং নিউজিল্যান্ডে এর সঙ্গে বড়োসড়ো বাণিজ্য চুক্তি করেছে ভারত। এর আগে ২০২৪ সালে ইউরোপের চার-দেশীয় মুক্ত বাণিজ্য সংগঠনের সঙ্গেও চুক্তি সম্পন্ন করেছে ভারত। সেটি গত বছর বাস্তবায়িতও হতে শুরু করেছে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে ২০২২ সালে।