আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের দিন কি দুটি ব্যালটেই সিল দিতে হবে?
- Author, মুকিমুল আহসান
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একদিনে দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবার। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি একসঙ্গে, তবে আলাদা দুটি ব্যালটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার শাসনামলে বাংলাদেশে দুইটি গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও সেগুলো জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে গণভোটের দিন একটি ব্যালটেই হ্যাঁ/না ভোট দিয়েছেন ভোটাররা।
এবার একই দিনে একই সাথে দুইটি ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভোটের সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে একঘণ্টা। ১২ই ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোট নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন বা ইসি।
একটি পরিপত্রের মাধ্যমে ইসি জানিয়েছে, দুটি আলাদা ব্যালট পেপারের মাধ্যমে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে এবং ভোটগ্রহণ শেষে একই সাথে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল গণনা করা হবে।
আবার এবারই প্রথম প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিভিন্ন দেশে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে। তাদের কাছেও একই খামে পাঠানো হয়েছে দুইটি ব্যালট।
ভোটারদের অনেকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, দুটি ব্যালটের দুটিতেই কি ভোট দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে কি না। কেউ দুটির মধ্যে একটি ব্যালটে ভোট দিতে চাইলে সেই সুযোগ থাকবে কি-না বা সেটি গ্রহণযোগ্য হবে কি না।
সেই প্রশ্নে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পদ্ধতিই অনুসরণ করার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
একই বাক্সে ফেলতে হবে দুইটি ব্যালট
এবারের নির্বাচনে সারাদেশের ৪২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্রে চলবে ভোটগ্রহণ। সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই সাথে অনুষ্ঠিত হওয়ায় দুটি ব্যালটেই একই সাথে ভোট দিতে হবে।
এক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচনের জন্য যে ব্যালট থাকবে সেটি হবে সাদাকালো আর গণভোটের ব্যালট পেপার হবে গোলাপি রংয়ের।
গণভোট নিয়ে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন একটি পরিপত্র জারি করেছে। এই পরিপত্রে বলা হয়েছে, "জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত, নির্ধারিত এবং সরবারহকৃত স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সই গণভোটের বাক্স হিসাবে ব্যবহৃত হবে। ভোটারগণ ভোট প্রদান শেষে জাতীয় সংসদের ব্যালট ও গণভোটের ব্যালট একই বাক্সে ফেলবেন"।
অন্যদিকে যে সব প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন করেছে তাদের ব্যালট পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে আগেই। তাদেরও ২৫শে জানুয়ারির মধ্যে গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের ব্যালট ভোট দেওয়া শেষে একই খামে করে দেশে পাঠাতে বলা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটার জাতীয় নির্বাচনের ব্যালট ও গণভোটের ব্যালটে সিল দেওয়ার পর সেটি একই বাক্সে ফেলবেন।
১২ই ফেব্রুয়ারি বিকাল সাড়ে চারটায় ভোটগ্রহণ শেষে প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতিতে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ব্যালট আলাদা করবেন এবং আলাদা করেই এজেন্টদের উপস্থিতিতে ভোট গণনা করতে হবে।
ভোট গণনা শেষে প্রতিটি কেন্দ্রে একটি আলাদা ফরমে, আলাদা আলাদা ঘরে 'হ্যাঁ' ভোট ও 'না' ভোট গণনা করে সেটি কেন্দ্রে টানিয়ে দিতে হবে। একইভাবে সংসদ নির্বাচনের ভোটের পরিমাণও আলাদা ফরমে যোগ করতে হবে।
প্রবাসী ও দেশের মধ্যে যারা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছে, তাদের ভোটও একই সাথে যোগ করে গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে টানিয়ে দেবেন স্ব স্ব কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা।
পরে প্রতিটি আসন ভিত্তিও একইভাবে দুইটি ভোটের ফলাফল যোগ করে সেটি স্বাক্ষর করে নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন রিটার্নিং অফিসার।
একটি ব্যালটে ভোট দেওয়া যাবে?
১৯৯১ সালের গণভোটের প্রায় ৩৫ বছর পর আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশের তৃতীয় গণভোট।
এবারের সারাদেশের যে সব নির্বাচন কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করবেন তাদের জন্য এই গণভোট একটি নতুন অভিজ্ঞতা। যে কারণে বৃহস্পতিবার (২২শে জানুয়ারি) থেকে সারাদেশের প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেবে নির্বাচন কমিশন।
ইসি বলছে, গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের ব্যালট প্রদান, গণনা ও ভোটারদের জন্য কী কী পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে তার একটি নির্দেশনাও দেবে কমিশন।
আবার এবার যারা ভোট দেবেন তাদেরও অনেকের হ্যাঁ/না ভোট বা গণভোটে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা নেই। ফলে গণভোট নিয়ে প্রশ্নও আছে অনেকের মনে। আবার কী কী বিষয়ের ওপর গণভোট হচ্ছে সেগুলো নিয়েও অনেকের মধ্যে কফিউশন আছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা। তাদের কেউ কেউ এটিও বলেছেন যে তারা শুধু সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে চান, কিন্তু গণভোটে ভোট দেওয়ার আগ্রহ তাদের নেই।
এই প্রশ্ন করা হয়েছিল পাবনার ঈশ্বরদীর ষাটোর্ধ দেলোয়ার হোসেনের কাছে। তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান, যে সব সংস্কার প্রস্তাবের ওপর এবারে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে তার অনেকগুলোর সাথে তিনি একমত।
আর কিছু কিছু প্রস্তাবের সাথে তিনি একমত নন। যে কারণে তিনি সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে চান, কিন্তু গণভোটে ভোট দিতে চান না।
মি. হোসেনের মতো যদি কোনো ভোটার দুটি ব্যালটের মধ্যে একটিতে ভোট দিতে চান তাহলে সেই সুযোগ আছে কি-না সেই প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সহকারী সচিব মতিয়ুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "একটি ব্যালট দেওয়ার কোনো সুযোগ এবার থাকছে না"।
তার ভাষ্য, একই সাথে একজন ভোটারকে দুইটি ব্যালটই সরবারহ করা হবে। যদি কোনো ভোটার একটি ব্যালট নিতে চান তাহলে তাকে শুধু সংসদ নির্বাচন বা গণভোটের একটি ব্যালট দেওয়া হবে না।
নির্বাচন কমিশনের সূত্রগুলো বলছে- যদি কোনো ভোটার গণভোটে ভোট না দিতে চান তাহলেও তাকে ব্যালট নিতে হবে। তিনি ভোট দেন আর না দেন, তার দুটি ব্যালটই ভাঁজ করে বাক্সে ফেলতে হবে।
গণনার সময় যদি এমন ফাঁকা ব্যালট ভোটের বাক্সে পাওয়া যায়, তবে নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী সেই ব্যালটগুলো বাতিল বলেই গণ্য হবে।
ইসি কর্মকর্তা মি. রহমান এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের উদাহরণ টেনে জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তিনটি পদের আলাদা তিনটি ব্যালট সরবরাহ করা হয়। কোনো ভোটার যদি একটি মাত্র ব্যালট নিতে চান তাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয় না।
গণভোটের ক্ষেত্রে ঠিক এই বিয়ষগুলোই অনুসরণ করবে নির্বাচন কমিশন এবং সেই নির্দেশনাও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে মাঠের নির্বাচন কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
গণভোটের চারটি প্রশ্ন
গত বছরের অক্টোবরে রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে সাক্ষরের পর গত নভেম্বরে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দেন।
এক্ষেত্রে একই দিনে দুইটি ভোট আয়োজনে নির্বাচন কমিশনের সামনে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে গণভোট আয়োজনের সব প্রস্তুতি শেষ করেছে।
সরকার যে জুলাই সনদ তৈরি করেছে সেখানে ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার ও ৩৭টি আইন ও বিধি সংস্কারের তালিকা তৈরি করেছে।
যার সংক্ষিপ্ত অংশ তৈরি করা হয়েছে গণভোটের ব্যালটের জন্য। সেখানে ছোট করে মাত্র চারটি পয়েন্ট যুক্ত করা হয়েছে।
ভোটারদের সেই বিষয়গুলো পড়েই জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোটের ব্যালটে হ্যাঁ অথবা না ভোট দিতে হবে।
এবার গণভোটের ব্যালটে যে চারটি পয়েন্ট যুক্ত করা হয়েছে তা হলো ––
আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?" - (হ্যাঁ/না):
(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।
(খ) আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।
(গ) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হইয়াছে- সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে।
(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।