বান্দরবানের রোয়াংছড়ি এলাকায় গোলাগুলিতে আটজন নিহত

বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে বিবদমান দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলিতে আট জন মারা গেছে বলে জেলা পুলিশ নিশ্চিত করেছে।

পুলিশ সুপার মোঃ তারিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, দুপুরে আট জনের মৃতদেহ সদর হাসপাতালে ময়না তদন্তের জন্য আনা হয়েছে।

“দু'পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে। স্থানীয়রা অনেকে কুকিচিন ও ইউপিডিএফের মধ্যে গোলাগুলির কথা বলছেন। কিন্তু আমরা সেটি ভেরিফাই করতে পারিনি। তবে গোলাগুলি হয়েছে এবং আট জন মারা গেছে,” বলছিলেন মি. ইসলাম।

স্থানীয় সাংবাদিক সঞ্জয় কুমার বড়ুয়া বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, রোয়াংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল মান্নান তাদেরকে জানিয়েছেন যে কুকিচিন ন্যাশনাল আর্মি ও ইউপিডিএফ ডেমোক্র্যাটের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে।

ঘটনাস্থল থেকে দুটি বন্দুক উদ্ধার করেছে পুলিশ। মি. মান্নান দাবি করেছেন, সবার মৃতদেহ এক জায়গাতেই পাওয়া গেছে এবং যারা মারা গেছে তারা 'ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীদের' গুলিতে নিহত হয়েছে।

যদিও ইউপিডিএফ ডেমোক্র্যাট এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তারা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বাসী বলে জানিয়েছে।

“আমরা এ সংঘর্ষে জড়িত ছিলাম না,” স্থানীয় সাংবাদিকদের এমন বার্তা দিয়েছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক উবা মং মারমা।

সঞ্জয় কুমার বড়ুয়া জানিয়েছেন, সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটেছে রুমা ও রোয়াংছড়ি সীমান্ত এলাকায় খামতাংপাড়ায়। এলাকাটি রোয়াংছড়ি উপজেলা সদর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে।

কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট কারা?

বাংলাদেশ সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফকে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন হিসেবে বর্ণনা করলেও সংগঠনটি তাদের ফেসবুক পাতায় দাবি করেছে তারা বাংলাদেশের কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন নয়।

একই সাথে তারা জানিয়েছে, তাদের ভাষায়, "সুবিধা বঞ্চিত কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর জন্যে স্বশাসিত বা পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ক্ষমতাসহ একটি ছোট রাজ্য" চাইলেও তারা কোন স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়নি।

তবে কেএনএফ-এর ফেসবুক পাতা ও ইউটিউবে পোস্ট করা ভিডিওগুলোতে যেসব সামরিক ট্রেনিংসহ কার্যক্রমের সচিত্র বর্ণনা দেয়া হয়েছে সেগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরের কোন ছবি বা ভিডিও নয় বলেই মনে করছে র‍্যাব।কেএনএফের ঘোষণা ও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির অন্তত ছয়টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে তারা। যদিও দলবদ্ধ ভাবে তাদের বম হিসেবেও প্রচার করছে অনেকে।

গত এপ্রিলে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ করে ফেসবুকে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি এবং বান্দরবানের রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলীকদম উপজেলাগুলোর সমন্বয়ে পৃথক রাজ্যের দাবি করে তারা।

তখনই তাদের সাংগঠনিক প্রধান হিসেবে নাথান বমের নাম ঘোষণা করে তারা। মি. বম এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং বান্দরবানের রুমা উপজেলায় তার বাড়ি বলে জানা যাচ্ছে।

ইউপিডিএফ কী চায়?

বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য যে সংগঠনটি সবচেয়ে বেশি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেটির নাম ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ।

নিরাপত্তা বাহিনীর কোন কোন সূত্রের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে ইউপিডিএফ হয়তো নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে নতুবা নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে।

ওদিকে, ইউপিডিএফ-এর বক্তব্য তারা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রোয়াংছড়ির ঘটনায় ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) অংশের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।

পার্বত্য শান্তিচুক্তির বিরোধিতার মাধ্যমে ১৯৯৮ সালের ২৬ জুন ঢাকায় এক কনফারেন্সের মাধ্যমে ইউপিডিএফ-এর জন্ম হয়।

ইউপিডিএফ আত্মপ্রকাশের পর কুড়ি ২০ বছর পর্যন্ত একসাথে ছিল। বর্তমানে এই সংগঠনটি দুইভাগে বিভক্ত।

অনেকে মনে করেন, ইউপিএফ (গণতান্ত্রিক) অংশটির সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর 'সুসম্পর্ক' রয়েছে।

নিহতরা বম সম্প্রদায়ের

ওই এলাকায় মূলত খেয়াং সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে। সেখানে এই সম্প্রদায়ের পঞ্চাশটির মতো পরিবার বসবাস করে।

যদিও ঘটনাস্থল থেকে যাদের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে তারা বম সম্প্রদায়ের।

সম্প্রতি বম জনগোষ্ঠীর বেশ কিছু পরিবার ভারতের মিজোরামে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো। তাদের অনেকে জানিয়েছিলো যে কুকি চিন ন্যাশনাল আর্মির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যে অভিযান চালাচ্ছে, তার থেকে বাঁচতেই ভারতে পালিয়ে এসেছেন তারা।

ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে রুমা থানা পুলিশও বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলো যে নিরাপত্তা জনিত কারণে কিছু লোক ভারতে চলে গেছে।

কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট রাজনৈতিক সংগঠন হলেও তাদের একটা সশস্ত্র শাখাও আছে যেটির নাম কুকি চিন ন্যাশনাল আর্মি। এদের বিরুদ্ধেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আর র‍্যাব সাম্প্রতিক সময়ে অভিযান পরিচালনা করছিলো।

কিন্তু এ অভিযানের সঙ্গে রোয়াংছড়ির এই আটজনের নিহত হবার সম্পর্ক আছে কি-না তা জানা যায়নি।

তবে পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী কুকিচিন ন্যাশনাল আর্মি ও ইউপিডিএফ ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সংঘর্ষের জের ধরেই এ ঘটনা ঘটেছে।