মাছ বিক্রেতা থেকে প্রভাবশালী রাজনীতিক অনুব্রত মন্ডলকে নিয়ে তোলপাড়

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
তিনি পশ্চিমবঙ্গের কোনও মন্ত্রী নন, এমনকি এমপি বা এমএলএ-ও নন। তবুও বীরভূম জেলার তৃণমূল সভাপতি অনুব্রত মন্ডলের নামে গোটা তল্লাটে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায় - এমনটাই জনশ্রুতি।
গত বছরের ১১ আগস্ট এই অনুব্রত মন্ডলকেই একগুচ্ছ দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার করেছিল ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই। পরে তাকে পাঠানো হয় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি-র হেফাজতে।
গ্রেপ্তার হওয়ার প্রায় সাত মাস পর মঙ্গলবার গভীর রাতে তাকে অবশেষে দিল্লিতে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে ইডি। মধ্যরাতে বিচারকের এজলাসে পেশ করে তিন দিনের হেফাজতও পেয়েছে তারা।
এদিকে অনুব্রত মন্ডলকে দিল্লিতে নিয়ে আসাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে যেন তুলকালাম পড়ে গেছে। শাসক ও বিরোধী দলের নেতানেত্রীরা সবাই এই ঘটনা নিয়ে লম্বা লম্বা বিবৃতি দিচ্ছেন, মন্তব্য করছেন।
রাজ্যের প্রতিটি টিভি চ্যানেল ও খবরের কাগজও অনুব্রত মন্ডলের দিল্লি যাত্রা ও দিল্লিতে কাটানো প্রতিটি মুহুর্তের পুঙ্খানুপুঙ্খ ধারাবিবরণী দিয়ে চলেছে – যার সুবাদে তিনি বিমানে কোন আসনে বসলেন, রাতে তার ভাল ঘুম হল কি না, লাঞ্চে কী খেলেন, তাকে কে বা কারা জেরা করছেন ইত্যাদি সব তথ্যই এখন পশ্চিমবঙ্গবাসীর নখদর্পণে।

ছবির উৎস, Getty Images
দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ও আটক একজন রাজনীতিককে রাজ্য থেকে দিল্লিতে নিয়ে আসা নিয়ে এই ধরনের চাঞ্চল্য, আগ্রহ ও মিডিয়া কভারেজ প্রায় নজিরবিহীন বলা যেতে পারে।
মূলধারার গণমাধ্যম তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গের সোশ্যাল মিডিয়াতেও এখন যাবতীয় চর্চার কেন্দ্রে অনুব্রত মন্ডল।
কিন্তু প্রশ্ন হল, প্রায় সাত মাস ধরে আটক একজন নেতাকে স্রেফ দিল্লিতে নিয়ে আসার ঘটনা কেন এতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? দিল্লিতে কি তিনি জেরার মুখে এমন কিছু ফাঁস করতে পারেন যা তিনি এদিন পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে বলেননি?
অনুব্রত মন্ডল তার বিরুদ্ধে এই সব মামলায় ‘রাজসাক্ষী’ বা অ্যাপ্রুভার হবেন কি না তা নিয়েও জল্পনা চলছে বিস্তর।
এবং সবচেয়ে বড় কথা, গরু-কয়লা-বালি পাচারের মাধ্যমে তিনি যে কোটি কোটি টাকা বানিয়েছেন বলে অভিযোগ, তার ভাগ কোথায় কোথায় যেত সে ব্যাপারে তিনি মুখ খোলেন কি না গোটা রাজ্য সে দিকেও অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে।
অনুব্রতর উত্থান যেভাবে
বোলপুরের বাজারে সামান্য একজন মাছ বিক্রেতা থেকে অনুব্রত মন্ডল যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে একটি সাড়াজাগানো নাম হয়ে উঠেছেন, সেই কাহিনি গল্প-উপন্যাসকেও হার মানায়।
এই রাজনৈতিক যাত্রায় অনুব্রত বরাবর তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আশীর্বাদ ও প্রশ্রয় পেয়ে এসেছেন, যিনি তাকে সব সময় তার ডাক নাম ‘কেষ্ট’-তেই সম্বোধন করে থাকেন।

ছবির উৎস, Getty Images
এমন কী ‘কেষ্ট’-র চরম বিতর্কিত কার্যকলাপকেও তিনি “ওর মাথায় একটু অক্সিজেন কম যায়” বলে স্নেহের সুরে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছেন।
উল্টোদিকে অনুব্রত মন্ডলও এককালে বামপন্থীদের খাসতালুক বীরভূম জেলাকে তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত গড় হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
পাঁচ বছর আগে রাজ্যের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বীরভূমে বিরোধীরা যে কার্যত প্রার্থীই দিতে পারেনি, সেটাও ছিল মূলত অনুব্রত মন্ডলের ভয়েই। নিজের এলাকাকে তিনি কার্যত বিরোধীশূন্য করে তুলেছিলেন।
বিরোধীদের ‘গুড়-বাতাসা’ বা ‘নকুলদানা’ খাওয়ানো, ‘চড়াম চড়াম’ শব্দে ঢাক বাজানো – রাজ্য রাজনীতিতে এই সব শব্দবন্ধও অনুব্রত মন্ডলেরই অবদান, যেটা বিরোধীদের বুকে তার একটা ভয়-ধরানো, সমীহ-জাগানো ছবি তুলে ধরেছে।
‘প্রশ্ন তোলা পছন্দ নয়’
কলকাতায় বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা অমিতাভ ভট্টশালীর কথায়, “কেষ্ট বা অনুব্রত মণ্ডলকে নিয়ে বীরভূমে দু ধরনের মনোভাব দেখেছি, যার বেশিটাই হলো ভয় আর কিছুটা ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা।”
“তিনি একের পর এক হুমকি দিয়ে গেছেন পুলিশ, বিরোধী নেতা, এমন কি নিজের দলের নেতাদেরও। তবে সব সময়ই মমতা ব্যানার্জি তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাই ভীষণ একটা বেপরোয়া মনোভাব ছিল কেষ্ট মণ্ডলের।”

ছবির উৎস, Getty Images
তিনি আরও জানাচ্ছেন, বীরভূমে দল ও প্রশাসন চালানোর ক্ষেত্রে অনুব্রত মন্ডলই শেষ কথা ছিলেন – তার অঙ্গুলিহেলনেই সেখানে সব চলত।
অমিতাভ ভট্টশালী আরও বলছিলেন, “আমি একবার ভোটের আগে অনুব্রত মন্ডলের সাক্ষাৎকার নিতে তার বোলপুরের বাড়িতে গিয়েছিলাম। জানতে চেয়েছিলাম, নানা সময়ে এই হুমকি দেওয়া কথাগুলো কেন বলেন?”
“প্রশ্নটা শুনে তিনি যে রেগে যাচ্ছেন, মুখ চোখ দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় নি। তবে বলেছিলেন ওগুলো কিছু স্লিপ অফ দ্য টাং আর কিছু বিরোধীদের অপপ্রচার। তার পরেই দুম করে ইন্টারভিউটা শেষ করে দেন।”
“একজন স্থানীয় সাংবাদিক, যিনি আমার সঙ্গে ছিলেন, পরে বলেছিলেন আমি বাইরে থেকে গেছি বলেই ওই প্রশ্ন করার সাহস পেয়েছি। স্থানীয়রা কেউ অনুব্রত মন্ডলের মুখের ওপর এই প্রশ্ন না কি করতেই পারত না!”
গরু-বালি-কয়লা পাচার
তবে এই দাপুটে রাজনীতির পাশাপাশি অনুব্রত মন্ডল শত শত কোটি টাকার সম্পত্তিও বানিয়েছেন বলে অভিযোগ, যেটা তাকে এখন বিরাট বিপদে ফেলেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
সিবিআই ও ইডি-র মতো কেন্দ্রীয় সরকারি এজেন্সিগুলো বলছে, ভারত থেকে বাংলাদেশে গরুর চোরাকারবার এবং বীরভূম জেলার বালি ও কয়লা খাদানগুলো থেকে অবৈধ পাচারের ব্যবসাই অনুব্রত মন্ডলের এই বিপুল সম্পত্তির উৎস।
বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে গরু পাচার চক্রের যিনি মূল চক্রী বা কিংপিন, সেই মুর্শিদাবাদের ব্যবসায়ী এনামুল হককে তার চোরাকারবারের সাম্রাজ্য চালাতে অনুব্রত মন্ডল সব ধরনের সাহায্য করতেন – এবং বিনিময়ে পেতেন বিপুল ‘প্রোটেকশন মানি’।
বীরভূমের ইলামবাজার-সহ এলাকার সবগুলো গরুর হাটও ছিল অনুব্রত মন্ডল ও তার লোকজনদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন হেফাজতে রেখেও তারা এখনও অনুব্রত মন্ডলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট চার্জশিট প্রস্তুত করতে পারেনি, যে কারণে তারা হাইকোর্টের কাছে তাকে দিল্লি নিয়ে যাওয়ার আবেদন করেছিল।
দিল্লিতে কী মুখ খুলবেন?
পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলগুলো প্রায় এক সুরেই বলছে, দিল্লির তিহার জেলে হাজতবাস করলে ও ইডি-সিবিআইয়ের দুঁদে কর্মকর্তাদের জেরার মুখে পড়লে অনুব্রত মন্ডল নিশ্চয় এবার ভেঙে পড়বেন এবং এই সব দুর্নীতির কথা কবুল করবেন।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার যেমন বলেছেন, “অনুব্রত মন্ডল একবার মুখের কুলুপ খুললে অনেক নাম বেরিয়ে আসবে, এমন কী তৃণমূলে ভূমিকম্পও হয়ে যেতে পারে।”

ছবির উৎস, Getty Images
অনুব্রত সব ফাঁস করলে তৃণমূল ‘এমনভাবে ভূপাতিত হবে যে হয়তো আর উঠেই দাঁড়াতে পারবে না’, এমনও সম্ভাবনার কথা বলছে বিজেপি।
রাজ্যের আর এক বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতি অধীর চৌধুরীও মন্তব্য করেছেন, “ইডি তার নিয়ম মেনে, হাইকোর্টের মাধ্যমে আবেদন করে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই অনুব্রত মন্ডলকে অবশেষে দিল্লি নিয়ে গেছে। জানি না এটা নিয়ে কেন এত যাত্রা-নাটক হচ্ছে!”
“হিম্মত থাকলে, সাহস থাকলে তিনি ইডি-র মোকাবিলা করবেন, এতে ওঁনার ঘাবড়ানোর কী আছে”, অনুব্রত মন্ডলকে পাল্টা কটাক্ষও ছুঁড়ে দিয়েছেন অধীর চৌধুরী।
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস ও তাদের পুলিশ-প্রশাসন অনুব্রত মন্ডলের দিল্লি যাওয়া ঠেকাতে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়েছিল। ফলে তারা যে এখন হতাশ দলীয় মুখপাত্রদের প্রতিক্রিয়াতে তা গোপন থাকেনি।

ছবির উৎস, Getty Images
কলকাতা থেকে সংবাদদাতা অমিতাভ ভট্টশালীও বলছিলেন, “আসলে অনুব্রত মন্ডলের মতো একজন দাপুটে নেতা, তিনি রাজ্য পুলিশের আওতার বাইরে থাকবেন, এটা ভেবেই হয়তো পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন।”
“রাজ্যের সরকার ও পুলিশ এতদিন যেভাবে অনুব্রত মন্ডলকে আড়াল করে এসেছে সেটা আর সম্ভব হবে না বলেই হয়তো তারা আশা করছেন এত দিনে তদন্তে একটা ব্রেকথ্রু হতে পারে”, বলছিলেন তিনি।
ইডি কি ভরসাযোগ্য?
ভারতের বিরোধী দলগুলো হরহামেশাই অভিযোগ করে থাকে, সিবিআই বা ইডি-র মতো এজেন্সিগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের করা মামলাগুলোয় ‘কনভিকশন রেট’ বা দোষ প্রমাণিত হওয়ার হারও খুবই কম।
কিন্তু অনুব্রত মন্ডলের ক্ষেত্রে দিল্লিতে সেই সংস্থাগুলোই দুর্নীতির মূল খুঁজে বের করতে পারবে, কেন অনেকেই এমনটা ধরে নিচ্ছেন?

ছবির উৎস, Shatarup Ghosh
পশ্চিমবঙ্গের তরুণ বামপন্থী নেতা শতরূপ ঘোষ এই গোটা বিষয়টাকে একটু ভিন্নভাবে দেখতে চান।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছিলেন, “অনুব্রত মন্ডলের যা সব কীর্তিকলাপ আমরা দেখেছি, তাকে এক কথায় বলা যেতে পারে সুপার-ক্রিমিনাল।”
“কিন্তু সিবিআই ও ইডি-র হাতে আটক হওয়ার পরও তিনি তো এ রাজ্যের জেলে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের আতিথেয়তাতেই ছিলেন, আর তারা তাকে কীরকম পাঁচ-তারা হোটেলের মতো জামাই আদরে রেখেছিল সেটাও আমরা সবাই জানি।”
বস্তুত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি যেভাবে প্রকাশ্যে বারবার ধৃত অনুব্রত মন্ডলের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং রাজ্য পুলিশ যেভাবে তাকে সাহায্য করে গেছে তাতে ওই রাজ্যে থাকলে কেউ তার কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারবে না এটাও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
শতরূপ ঘোষ এই কারণেই মনে করেন, রাজ্যের বাইরে দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে অনুব্রত মন্ডলকে জেরা করা হলে হয়তো এই মামলাগুলো একটা গতি পাবে – যেটা পশ্চিমবঙ্গে কখনোই সম্ভব ছিল না।

ছবির উৎস, Getty Images
তার কথায়, “দেখুন, ভারতে তো আর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড এসে তদন্ত করতে পারবে না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ যখন এনার বিরুদ্ধে কিছুই করবে না, তখন কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোর ওপর ভরসা করা ছাড়া আমাদের উপায় কী?”
সম্ভবত এই কারণেই দিনকয়েক আগে যখন দেশের আটটি বিরোধী দল যৌথভাবে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে চিঠি লিখে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কথিত ‘অপব্যবহার’ নিয়ে প্রতিবাদ জানায়, সিপিআইএম বা সিপিআই-য়ের মতো বামপন্থী দলগুলো তাতে সই করেনি।
বামপন্থীরা হয়তো এখনও মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন, অনুব্রত মন্ডলকে দিল্লি নিয়ে যাওয়ার পর তার কিছুটা অন্তত মানুষের কাছে প্রমাণিত হলেও হতে পারে।
আর বিজেপির আশা – অনুব্রত মন্ডলের মুখ থেকেই বেরোবে দুর্নীতিতে জড়িত আরও বড় রাঘব বোয়ালদের নাম!








