পশ্চিমবঙ্গে শাসক দল তৃণমূলের পার্টি অফিসের ভেতরে হিন্দু দেবদেবীদের ছবি কীসের ইঙ্গিত?

রথযাত্রা উৎসব উদযাপনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান, রথযাত্রা উৎসব উদযাপনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা স্তরের একটি নতুন পার্টি অফিসে কেন হিন্দু দেবদেবীদের ছবি-সমেত বিশাল 'ঠাকুরঘর' রাখা হয়েছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা দিয়েছে।

বীরভূম জেলার তৃণমূল সভাপতি যদিও বিবিসিকে জানিয়েছেন, শুধু হিন্দু দেবদেবী নয়, একজন মুসলিম পীরের মাজারের ছবিও সেখানে তারা রেখেছেন - তবে পার্টি অফিসে পূজার ঘর থাকার মধ্যে কোনও অসুবিধা দেখছে না তৃণমূল বা বিজেপি কেউই।

কিন্তু বহু বছর কমিউনিস্ট শাসনে থাকা পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক দলের অফিসে ধর্মকর্ম করার কথা এককালে যেখানে ভাবাও যেত না - সেই প্রবণতা কি তাহলে এখন পাল্টাচ্ছে?

বীরভূম জেলার বোলপুরে সম্প্রতি বেশ কয়েক কোটি টাকা খরচ করে তৈরি তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন পার্টি অফিসের উদ্বোধন হয়েছে।

সেই অফিসের ভেতর কেন কালীমন্দির, বিবিসির এই প্রশ্নের জবাবে জেলার দোর্দন্ডপ্রতাপ নেতা অনুব্রত মন্ডল ওরফে কেষ্টা বলছিলেন পঁয়ত্রিশ বছর ধরে তিনি ওখানেই পুজো করে আসছেন - এখন অফিস হচ্ছে বলে তো আর মন্দির বাদ দেওয়া যায় না।

বীরভূমের বিতর্কিত তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অনুব্রত মন্ডল

ছবির উৎস, Hindustan Times

ছবির ক্যাপশান, বীরভূমের বিতর্কিত তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অনুব্রত মন্ডল

"আমি সেই চুরাশি সাল থেকে ওখানে কালীপুজো আনতাম। কার্তিক মাসে দুর্গাপুজোর পর পরই যে কালীপুজোটা হয়, তখন সেখানে কালীঠাকুর বরাবর আসেন। এবারও এসেছেন, গতবারও এসেছেন - কন্টিনিউ ওখানেই কালীঠাকুর আসেন!"

"আমি ওই কালীমন্দিরটা রেখেই পার্টি অফিসটা করেছি, এই যা", বলছিলেন তিনি।

তবে বীরভূম থেকে নির্বাচিত তৃণমূলের এমপি ও অভিনেত্রী শতাব্দী রায়ও মনে করেন, পার্টি অফিসের ভেতর ঠাকুরঘর অনায়াসেই থাকতে পারে - কারণ এটার সঙ্গে নেতাকর্মীদের ধর্মবিশ্বাস জড়িত।

তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, "কীসের অসুবিধা? হ্যাঁ, কমিউনিস্টরা বলতেন তারা ঠাকুর-দেবতা মানেন না। কিন্তু জ্যোতিবাবু সস্ত্রীক পুজো দিতে যেতেন, আর বলতেন আমি ঠাকুর-দেবতা না-মানলেও আমার বউ মানেন।"

বীরভূম জেলা থেকে নির্বাচিত তৃণমূল এমপি ও অভিনেত্রী শতাব্দী রায়

ছবির উৎস, The India Today Group

ছবির ক্যাপশান, বীরভূম জেলা থেকে নির্বাচিত তৃণমূল এমপি ও অভিনেত্রী শতাব্দী রায়

আমাদের পেজে আরও পড়ুন :

"কিন্তু আমাদের তৃণমূলে তো কেউ কখনও বলে না যে ঠাকুর-দেবতা বা আল্লা-যিশু মানি না। আমরা সবাই তো সব মানি, কমিউনিস্টদের মতো আমাদের লুকোনোরও কিছু নেই।"

"বরং আমরা যারা রাজনীতিতে আছি, তারাও প্রত্যেকে দিন শুরু করি নিজের নিজের ঠাকুর-দেবতা বা ওপরওলাকে দিয়েই। সেখানে নিজের বাড়ি-ঘর, অফিস বা পার্টি অফিসে ঠাকুরঘর থাকলে মন্দ কী? ভালই তো", বলছিলেন শতাব্দী রায়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী শিবাজীপ্রতিম বসুও বলছেন, রাজনীতির সঙ্গে প্রকাশ্য ধর্মাচরণের যে বিরোধ নেই, পশ্চিমবঙ্গ এই অভ্যাসের সঙ্গে আসলে অনেকদিন ধরেই রপ্ত হচ্ছে।

"এই পরিবর্তনগুলো বাম আমলের শেষদিক থেকেই আসতে আরম্ভ করেছিল, কিন্তু বিজেপির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সেটা অনেক প্রত্যক্ষ হয়েছে। আগে লোকে যেটা বলত না, এখন সেটা নি:সঙ্কোচে বলছে। রাজনৈতিক দলগুলো পাল্টাপাল্টি রামনবমীর মতো ধর্মীয় উৎসব পালন করছে।"

কলকাতায় সম্প্রতি বিজেপি ও আরএসেএসের উদ্যোগে রামনবমী উদযাপন হয়েছে ধূমধাম করে

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান, কলকাতায় সম্প্রতি বিজেপি ও আরএসেএসের উদ্যোগে রামনবমী উদযাপন হয়েছে ধূমধাম করে

"আর তৃণমূল কংগ্রেসের সামাজিক ভিত্তিটা যদি আপনি দেখেন, দেখবেন যে দক্ষিণ কলকাতা থেকে তাদের উত্থান সেখানকার বড় বড় পুজো কমিটিগুলো যারা পরিচালনা করতেন তারাই কিন্তু এখন দলের দাপুটে নেতা-মন্ত্রী। যেমন অরূপ বিশ্বাস, যেমন ববি হাকিম!"

কিন্তু তা-ই বলে শাসক দলের অফিসের ভেতরেই বিশাল ঠাকুরঘর থাকবে, এটাও কি আজ পশ্চিমবঙ্গ মেনে নিতে রাজি?

অধ্যাপক বসু বলছেন, "সেটা হয়তো এখনই অ্যাকসেপ্ট করবে না। তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক ডিসকোর্স বা ইডিয়ম তো বিজেপির চেয়ে কিছুটা হলেও আলাদা - আর কমিউনিস্টদের আইডিওলজি মানার কোনও দায়ও তাদের নেই - ফলে আমার ধারণা তারা মানুষের মন বুঝে প্রতিক্রিয়া দেখাবে।"

"যদি এই পার্টি অফিসে ঠাকুরঘর রাখা নিয়ে হইচই শুরু হয়, তখন হয়তো মমতা ব্যানার্জি বলে দেবেন না, ওসব রাখারই কোনও দরকার নেই। কিংবা হয়তো বলবেন ঠাকুরঘর রাখলে ওখানে কোরান শরিফও রাখ!"

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক শিবাজীপ্রতিম বসু

ছবির উৎস, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়

ছবির ক্যাপশান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক শিবাজীপ্রতিম বসু

বস্তুত যে মুসলিম সমাজকে তৃণমূলের সমর্থনের বড় ভিত্তি বলে ধরা হয়, বোলপুরে পার্টি অফিসের ঠাকুরঘরে তাদের বিশ্বাসকেও মর্যাদা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি অনুব্রত মন্ডলের।

তিনি বলছিলেন, "আপনারা হয়তো আমাদের জেলার পাথরচাপুড়িতে দাতা বাবার মাজারের নাম শুনেছেন - সারা ভারত থেকে মুসলিমরা সেখানে মাথা ঠেকাতে আসেন। আমাদের কালীমন্দিরে কিন্তু আমরা সেই মাজারেরও ছবি রেখেছি।"

"আর গতকালই তো জেলা মিটিংয়ে পার্টি অফিসে সব মুসলিম নেতারা এসেছিলেন। আজও সংখ্যালঘু সেলের বৈঠকে মুসলিম নেতাকর্মীরা সবাই এলেন - তাদের কারও কিন্তু এই মন্দির নিয়ে কোনও আপত্তি নেই", জানাচ্ছেন অনুব্রত মন্ডল।

এমনি কী বিজেপিও বলছে, কমিউনিস্টরা এতদিন বাঙালিকে ভুল বুঝিয়ে এলেও বাড়ি-অফিস-দোকানপাটে পুজোআচ্চা করার মধ্যে অন্যায় কিছু নেই - যদিও তৃণমূলের কাজটা 'লোকদেখানো'।

কলকাতায় দুর্গাপুজার বিসর্জন শোভাযাত্রা। শহরে বহু তৃণমূল নেতার উত্থানের পেছনেই আছে তাদের দুর্গাপূজার ভূমিকা

ছবির উৎস, NurPhoto

ছবির ক্যাপশান, কলকাতায় দুর্গাপূজার বিসর্জন শোভাযাত্রা। শহরে বহু তৃণমূল নেতার উত্থানের পেছনেই আছে তাদের নিজ নিজ ক্লাবের দুর্গাপূজার ভূমিকা

দলের পলিসি রিসার্চ সেলের অনির্বাণ গাঙ্গুলির কথায়, "চল্লিশ বছরের বাম শাসনে পাবলিকলি পুজোআচ্চাকে ঘৃণার চোখে দেখা হত। মানুষের মনে একটা ভীতিও এসে গিয়েছিল, ভাবা হত যে পাবলিক স্পেসে এসবের বোধহয় কোনও স্থান নেই। কিন্তু সেটা তো আমাদের পরম্পরা নয়, আমরা ঢাকঢোল পিটিয়ে পুজো করেই তো অভ্যস্ত!"

"ফলে সে দিক থেকে এটা ভাল জিনিস অবশ্যই। কিন্তু বীরভূমে কেষ্ট মন্ডলের অফিসে পুজোর জন্য মন্দির হচ্ছে, এটা মেনে নেওয়া একটু কষ্টকর বই কি! এর মধ্যে আন্তরিকতা থাকলে ঠিকই বোঝা যেত!"

"সোভিয়েতের পতনের পর রাশিয়ান অর্থডক্স চার্চেও লোকের ভিড় হঠাৎ করে প্রচুর বেড়ে গিয়েছিল। কারণ মানুষ আগে যেটা ভয়ে ভয়ে বা গোপনে করত, তখন সেটাই তারা বুক ফুলিয়ে, প্রকাশ্যে করতে পারত। সেটা বোঝা যায় - কিন্তু তৃণমূল এখানে যেটা করছে তা নেহাতই টোকেনিজম, লোকদেখানো", বলছিলেন ড: গাঙ্গুলি।

এই বিতর্কের মধ্যে সবচেয়ে বিব্রতকর অবস্থা সম্ভবত বামপন্থীদের।

রাজনৈতিক আদর্শের জন্য তৃণমূলের অফিসে ঠাকুরঘরকে তারা না-পারছেন সমর্থন করতে, আবার মানুষের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ভয়ে না-পারছেন সরবে এর নিন্দা করতে!