বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড ম্যাচে স্পিনাররা 'তুরুপের তাস' হতে পারে

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের তৃতীয় ম্যাচেই দৃশ্যপটের নাটকীয় পরিবর্তন। হিমালয়ের কোলে ধরমশালা থেকে সোজা সুদূর দক্ষিণে সাগরতীরের চেন্নাই – দিনের তাপমাত্রাও ধুপ করে প্রায় দশ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়া!
এই সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশেই নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপে আজ (শুক্রবার) দিন-রাতের ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ, সেমিফাইনালে যাওয়ার রাস্তা পরিষ্কার রাখতে যে ম্যাচটা জেতা টাইগারদের জন্য খুব জরুরি।
ম্যাচের আগের সন্ধ্যায় সাংবাদিক সম্মেলনে এসে ভাইস ক্যাপ্টেন নাজমুল হোসেন শান্ত অবশ্য দাবি করে গেলেন, “সেমিফাইনাল নিয়ে এখনই অত ভাবার দরকার নেই।”
“সবে তো দু’টো ম্যাচ হয়েছে, আমরা বরং একটা একটা করেই এগোই”, প্রত্যয়ী কন্ঠেই জানিয়ে গেলেন শান্ত।
উল্টোদিকে আজকের এই ম্যাচ দিয়েই প্রায় সাত-আট মাস পরে নিউজিল্যান্ডের হয়ে প্রত্যাবর্তন করছেন অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন, যিনি বিশ্বকাপে দলের হয়ে প্রথম দুটো ম্যাচ খেলতে পারেননি।
উইলিয়ামসন খেলবেন কি না, গতকাল (বৃহস্পতিবার) সাংবাদিক সম্মেলনে নিজেই হাজির হয়ে সেই জল্পনার অবসান ঘটান তিনি।
তবে সেই সঙ্গেই জানিয়ে দেন, আঘাত ধীরে ধীরে সারিয়ে উঠলেও টিম সাউদি-র অবশ্য বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ম্যাচে খেলা হচ্ছে না।

ছবির উৎস, Getty Images
চেন্নাইয়ের খটখটে আবহাওয়া আর টার্নিং ট্র্যাকে ম্যাচটায় দুই দলের স্পিনাররাই তুরুপের তাস হয়ে উঠতে পারেন, সেই সম্ভাবনা খুবই জোরালো।
বিশেষ করে এই মাঠেই গত রবিবার অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে ভারতের রবীন্দ্র জাদেজা ও কুলদীপ যাদব যেরকম অসাধারণ সাফল্য পেয়েছেন, তাতে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ড দুই দলই আজ তাদের স্পিনারদের ওপর বিরাট ভরসা রাখছে।
চেন্নাইয়ের যে মাঠে আজকের খেলা, সেই এম এ চিদম্বরম স্টেডিয়াম বা ‘চিপক’ ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ক্রিকেট স্টেডিয়ামগুলোর অন্যতম।
তবে ইদানীং কালে চিপকের সবেচেয়ে বেশি পরিচিতি আইপিএলের ইতিহাসে সফলতম টিম চেন্নাই সুপার কিংসের ‘হোম’ হিসেবে।
এই মাঠে যখন চেন্নাই সুপার কিংসের খেলা থাকে, তখন তাদের সমর্থকরা যেভাবে হলুদ রঙের বন্যায় গ্যালারি ভাসিয়ে দেন আর ‘হুইশল পোডু’ স্লোগানে মাঠ মাতিয়ে তোলেন তা এখন আইপিএল লোকগাথার অংশ হয়ে উঠেছে।
তামিল ভাষায় ‘হুইশল পোডু’ মানে হল ‘বাজাও বাঁশি’!

ছবির উৎস, Getty Images
আজ শুক্রবারের ম্যাচে বাংলাদেশকে জিততে হলেও কিন্তু ভালো বাঁশি বাজাতেই হবে – স্পিনারদের যেমন দ্রুত উইকেট তুলতে হবে, তেমনি ব্যাটিং টপ অর্ডারেরও ছন্দে ফেরাটাও খুব জরুরি!
‘ইংল্যান্ড ম্যাচ অতীত’
মঙ্গলবার ধরমশালায় ইংল্যান্ডের কাছে ১৩৭ রানে হারার পর ড্রেসিং রুমে নিশ্চয় সেই পরাজয় নিয়ে কাটাছেঁড়া হয়েছিল? কী কথাবার্তা হয়েছিল সেটা কি কিছুটা শেয়ার করা সম্ভব?
বাংলাদেশ দলের হয়ে প্রেস কনফারেন্সে আসা নাজমুল হোসেন শান্ত বাউন্সারটা বেশ ভালই সামলালেন।
জানালেন, “হ্যাঁ, কোথায় আমাদের ভুলভ্রান্তি হয়েছে আর কীভাবে আমরা কামব্যাক করতে পারি, সেটা নিয়ে নিশ্চয় কথাবার্তা হয়েছে।”
তবে ইংল্যান্ডের কাছে শোচনীয় পরাজয় নিয়ে বেশি না-ভেবে তারা যে এখন সামনের ম্যাচগুলোর দিকেই তাকিয়ে আছেন, সেটাও জানাতে ভোলেননি তিনি।
তামিম ইকবাল ক্যাপ্টেন্সি ছেড়ে দেওয়ার পর সাকিব আল হাসানকে যেন কিছুটা অনিচ্ছাতেই বিশ্বকাপে নেতৃত্বের ভার নিতে হয়েছে ... দল কি সেই সমস্যাটা সামলে উঠতে পেরেছে, এই জাতীয় একটা গুগলির মুখেও পড়তে হল শান্তকে।
প্রথমে একটু ইতস্তত করেও সেটাও ফ্রন্ট ফুটেই খেললেন তিনি, “ওটা কোনও ইস্যুই নয়। যা হয়েছে সে সব অনেক আগেই চুকেবুকে গেছে। আমরা জানি আমাদের ক্যাপ্টেন পুরোপুরি প্রস্তুত!”

ছবির উৎস, Getty Images
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন :
তবে ব্যাটিং অর্ডারে টপ থ্রি-কে যে এবারে রান পেতেই হবে, সেটাও স্বীকার করলেন তিনি। কেরিয়ারের শুরুতে তানজিদ হোসেন ওরফে ‘জুনিয়র তামিম’কে যে সাপোর্ট দিয়ে যেতে হবে, সেটাও জানালেন খোলাখুলি।
বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে আসা ইস্তক সবচেয়ে বেশি চর্চা হচ্ছে তাদের ওপেনিং পার্টনারশিপ নিয়ে।
সেই প্রসঙ্গে শান্তকে অবশ্য একটু বিরক্তই শোনাল. “ওপেনিং নিয়ে না-হয় চিন্তাই না-করি? ওইটা নিয়ে ভাবাটা একটু বাদ দেই না?”
স্পিনাররা সাহায্য পেতে পারে, এটা হিসেবে থাকলেও বাংলাদেশ দল অবশ্য “উইকেট নিয়ে বেশি না-ভেবে গেমপ্ল্যানটা ঠিকমতো এক্সিকিউট করার দিকেই মন দিচ্ছে” বলে জানিয়ে গেলেন শান্ত।
চিপকের উইকেটে ৩২০ বা সোয়া তিনশো রান ওঠা সহজেই সম্ভব, সেটাও জানালেন তিনি।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে বাংলাদেশের ফাস্ট বোলারদের প্রচুর রান দেওয়া প্রসঙ্গেও বললেন, “ওরা কিন্তু হতাশ না মোটেই। এখানে যে রকম পিচ হচ্ছে তাতে একজন ফাস্ট বোলার ৬৫ বা ৭০ রান দিলেও সেটা মোটেই অস্বাভাবিক কিছু নয়!”
‘ওদের ম্যাচ উইনার আছে’
বাংলাদেশ টিম যেমন ধরমশালায় দুটো ম্যাচ খেলে চেন্নাইতে এসে পৌঁছেছে, নিউজিল্যান্ডও তেমনি এই শহরে এসেছে আহমেদাবাদ ও হায়দ্রাবাদে তাদের প্রথম দুটো ম্যাচ খেলে।
সেই দুটোতেই তারা বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছে ইংর্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসকে, যদিও অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন তার কোনওটাতেই খেলেননি। তিনি টুর্নামেন্টে নামছেন আজ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়েই।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বর্তমান প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ ব্যাটারদের একজন বলে গণ্য করা হয় উইলিয়ামসনকে, তবে ক্রিকেটীয় কথাবার্তায় তিনি কখনোই খুব একটা আগ্রাসী বা আক্রমণাত্মক নন।
শুক্রবার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগেও প্রতিপক্ষের সম্বন্ধে রীতিমতো সমীহ আর সম্ভ্রমই ঝরে পড়ল তার গলায়।
উইলিয়ামসন যেগুলো জানালেন : এক) “বাংলাদেশ দলে বেশ কয়েকজন ম্যাচ উইনার আছে, যারা খেলার মোড় ঘোরানোর ক্ষমতা রাখে।”
দুই) “উপমহাদেশের টিমগুলোর কাছে (চেন্নাইয়ের) এই কন্ডিশনটা খুব চেনা। আর বিশ্বকাপের মতো লম্বা একটা টুর্নামেন্টে প্রায় সবগুলো দলই এক একটা দিনে অন্য যে কোনও দলকে হারানোর ক্ষমতা রাখে।” মানে বলতে চাইলেন, কোনও দলই সেই অর্থে আজ ফেভারিট নয়।
তিন) “বাংলাদেশের স্পিনারদের খেলাটা অবশ্যই বড় একটা চ্যালেঞ্জ। তবে মনে রাখতে হবে, আমাদের দুটো টিমেই কিন্তু বেশ ভাল কয়েকজন স্পিনার আছে!”
বস্তুত কালকের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের মিচেল স্যান্টনার-ইশ সোধি, না কি বাংলাদেশের সাকিব-মিরাজ – কারা বেশি ভাল করেন তার ওপর ম্যাচের ফল অনেকটাই নির্ভর করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ তো সাকিব-মিরাজের পাশাপাশি শেখ মাহেদিকেও খেলাবে, এমন কী চতুর্থ স্পিনার হিসেবে নাসুম আহমেদও দলে জায়গা পেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই বলে অনেকে মনে করছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
ওদিকে নিউজিল্যান্ডের প্রথম দুটো ম্যাচে রাচিন রবিন্দ্রা দারুণ পারফর্ম করে তাকে দল থেকে বসানোর কাজটা প্রায় অসম্ভব করে তুলেছেন।
ফলে কেন উইলিয়ামসন দলে ফিরলেও স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান কাম তৃতীয় স্পিনার হিসেবে রবিন্দ্রাকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও নিশ্চয় খেলতে দেখা যাবে।
কিউই অধিনায়ক অবশ্য জানিয়ে গেলেন, শুক্রবার সকালে সারফেস (উইকেট) দেখেই তারা প্রথম এগারো নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
‘থালা’ আর ‘চিন্না থালা’
আজ যে এমএ চিদম্বরম স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের খেলা হচ্ছে, সেই মাঠের একজন ‘থালা’ আছেন।
থালা মানে হল তামিল ভাষায় নেতা। আর এই স্টেডিয়ামের অবিসংবাদিত নেতা হলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি।
চেন্নাই সুপার কিংসকে আইপিএলে পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন আর পাঁচবার রানার-আপ করিয়ে চিপকের সর্বোচ্চ থালা-র মর্যাদা পেয়েছেন ধোনি। বস্তুত এ মাঠে তাকে কেউ ধোনি বলেও ডাকে না – সবার কাছেই তিনি ‘থালা’।

ছবির উৎস, Getty Images
আর কে না জানে, নেতা থাকলে তাঁর একজন ডান হাতও থাকেন!
নেতার সেই ডান হাত-কে চেন্নাই সুপার কিংসের ভক্তরা ডাকেন ‘চিন্না থালা’ বলে। মানে থালা যদি সিংহ হন, চিন্না থালা হলেন জুনিয়র সিংহ।
বহুদিন ধরে এই ফ্র্যাঞ্চাইজিতে খেলা সুরেশ রায়না-ই এই শিরোপার অধিকারী, যদিও আগে অনেকে রবীন্দ্র জাদেজাকেও ওই নামে ডাকতেন।
যা-ই হোক, এ মাঠে বাংলাদেশকে আজ জিততে হলে দলের কোনও একজন-কে ‘থালা’ আর বাকি অন্তত দু’তিনজনকে ‘চিন্না থালা’ হয়ে উঠতেই হবে।
হতে পারে সেটা সাকিব আল হাসান এবং মিরাজ-শেখ মাহেদি। কিংবা ধরা যাক লিটন দাস এবং শান্ত-মুশফিক!
একজন ‘থালা’-র মতো থালা আর তার উপযুক্ত দু’তিনজন সঙ্গী পেলে দুর্ধর্ষ ফর্মে থাকা নিউজিল্যান্ডকে হারানোর স্বপ্ন বোধহয় দেখাই যায়!








