মমতা ব্যানার্জীর দলে প্রবীণ ও তরুণ নেতাদের মধ্যে ‘দ্বন্দ্ব’ যে কারণে

মমতা ব্যানার্জীর দলে দ্বন্দ্ব বেঁধেছে নবীন আর প্রবীণ প্রজন্মের মধ্যে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মমতা ব্যানার্জীর দলে দ্বন্দ্ব বেঁধেছে নবীন আর প্রবীণ প্রজন্মের মধ্যে

ভারতের পশ্চিবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস দলের নবীন আর প্রবীণ নেতা-নেত্রী-মন্ত্রী-বিধায়করা যেভাবে দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছেন, লাগাতার বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতি চলছে, তা আগে কখনও এত বড় করে সামনে আসেনি।

নবীনদের কেউ কেউ পুরনো নেতাদের কটাক্ষ করে বলছেন, ‘তাদের সফটওয়্যার আপডেট হয়নি। পুরোনো সফটওয়্যার দিয়ে হোয়াটস্অ্যাপ চলেনা’।

কেউ আবার বলছেন, নবীনরা চোখে চোখ রেখে লড়াই করবেন আর প্রবীণরা বসে দেখবেন, নির্দেশ দেবেন। প্রবীনদের দিক থেকে নতুন প্রজন্মকে ‘নাবালক, নাদান’ বলে বর্ণনা করা হচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জীও ক'দিন আগে এক জনসভায় বলেন যে নেতাদের বয়স হলে কর্মক্ষমতা কমে ।

তার কথায়, “আমার বয়স কম বলে রাস্তায় থাকতে পেরেছি। এটা সত্যি কথা মানতে হবে।"

সংগঠনের নেতৃত্বে কার হাতে থাকবে? অভিষেক ব্যানার্জীর অনুসারী তরুণ প্রজন্মের হাতে নাকি প্রবীণ নেতাদের হাতে? এ বিষয়টি নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে বলে জানান কলকাতার সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী, যিনি গত কয়েক দশক যাবত মমতা ব্যানার্জীর রাজনীতি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন।

মমতা ব্যানার্জী ও তার ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মমতা ব্যানার্জী ও তার ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জী

'দলে কোনও দ্বন্দ্ব নেই'

দলে ‘দ্বন্দ্ব’ দেখতে পাচ্ছেন না তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম মুখপাত্র অধ্যাপক মনোজিৎ মণ্ডল।

তার কথায়, “ দলে কোনও দ্বন্দ্ব নেই দুই প্রজন্মের মধ্যে। কিছু মতপার্থক্য তো থাকতেই পারে। তবে দিন শেষে আমাদের নেত্রী মমতা ব্যানার্জী আর সেনাপতি অভিষেক ব্যানার্জী।“

দ্বন্দ্বের কথা এখন মানতে না চাইলেও দুই প্রজন্মের মধ্যে বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতির রাশ টানতে যদিও শেষমেশ মমতা ব্যানার্জীকেই বলতে হয়েছে যে দলের কোনও বিষয়ে বাইরে মুখ খুললে শাস্তি পেতে হবে। দলীয় মুখপাত্রদের বদল করারও প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

আর প্রধান বিরোধী দল বিজেপিও বলছে যে তৃণমূলে 'নবীন-প্রবীণ কোনও দ্বন্দ্ব নেই' – সবই মানুষের দৃষ্টি ঘোরানোর কৌশল।

দলের অন্যতম মুখপাত্র কেয়া ঘোষের কথায়, “সবটাই আইওয়াশ হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ দুর্নীতি, হাজার দিনের ওপরে চাকরির দাবিতে শিক্ষকদের ধর্না – এসব নিয়ে যাতে মানুষ আর কথা না বলে, মিডিয়া যাতে ওসব আর না দেখায়, তাই তৃণমূল কংগ্রেসের দৃষ্টি ঘোরানোর কৌশল এটা।"

সংগঠনের রাশ ২০১৯ সাল থেকে নিজের হাতে অনেকটাই নিয়ে নেন অভিষেক ব্যানার্জী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সংগঠনের রাশ ২০১৯ সাল থেকে নিজের হাতে অনেকটাই নিয়ে নেন অভিষেক ব্যানার্জী

যেভাবে অভিষেকের আধিপত্য

তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী গত বছর পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে পশ্চিম ও দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত ‘নবজোয়ার যাত্রা’ করছিলেন।

এরপর দাবি আদায় গিয়ে দিল্লি ও কলকাতার রাজভবনের সামনে দিন-রাত ধর্নায় বসেছিলেন অভিষেক ব্যানার্জী।

তখন অনেকেই তার মধ্যে 'লড়াকু মেজাজের' ছাপ দেখেছিলেন। যেমনটা ছিল মমতা ব্যানার্জীর মধ্যে ছিল বিরোধী নেত্রী থাকার সময়।

তবে ওই যাত্রা বা ধর্নার ইত্যাদির অনেক আগেই কিন্তু স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে মি. ব্যানার্জীই হতে চলেছেন দলের উত্তরাধিকারী – অর্থাৎ মমতা ব্যানার্জীর পরে শীর্ষতম নেতা।

মমতা ব্যানার্জী নিজের ভাইয়ের ছেলের হাতে তুলে দিয়েছিলেন সেই ব্যাটন।

অবশ্য ওই দায়িত্ব পাওয়ার অনেক আগেই, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকেই মি. ব্যানার্জী দলের সাংগঠনিক কাজকর্ম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছিলেন।

তার উদ্যোগেই ভোটকৌশলী প্রশান্ত কুমারের সংস্থা আইপ্যাককে দায়িত্ব দেওয়া হয় দলের হয়ে নির্বাচনী কৌশল তৈরি করার।

Skip YouTube post
Google YouTube কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: বিবিসির নয় এমন ওয়েবসাইটের কনটেন্টের জন্য বিবিসি দায়ী না YouTube কনটেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of YouTube post

সেই প্রথম কোনও পরামর্শদাতা সংস্থা নিযুক্ত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের ভোটের কাজে। ওই সংস্থার কর্মীরাই ঠিক করে দিচ্ছিলেন নেতা-নেত্রী বা প্রার্থীদের ভাষণ, সভার সময়সূচী ইত্যাদি।

তখন থেকেই প্রবীণ নেতাদের কেউ কেউ বলছিলেন যে তারা রাজনীতি অনেক বেশি বোঝেন অভিজ্ঞতা দিয়ে। তাই বাইরের কোনও যুবক কী করে তার বক্তব্যের বিষয় ঠিক করে দিতে পারে!

সেসব অভিযোগ-অনুযোগ অবশ্য টেকেনি। পরপর নির্বাচনী লড়াইতে প্রফেশনাল সংস্থাকে দিয়েই ভোট করিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস, আর সেই সূত্রে সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ আরও বেশি করে নিজের হাতে নিয়েছেন অভিষেক ব্যানার্জী।

এই অবস্থায় গত বছর অক্টোবর মাসের পর থেকে সেভাবে আর সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচীগুলিতে দেখা যাচ্ছিল না মি. ব্যানার্জীকে। তিনি যেন কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছিলেন নিজেকে।

আর তখনই শুরু হয় নবীন-প্রবীণদের মধ্যে বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতির পালা।

'লক্ষ লক্ষ তরুণ অভিষেক ব্যানার্জীকে দেখেই রাজনীতিতে এসেছেন'

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, 'লক্ষ লক্ষ তরুণ অভিষেক ব্যানার্জীকে দেখেই রাজনীতিতে এসেছেন'

‘অভিষেককে দেখেই নতুন প্রজন্ম তৃণমূলে’

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

দলের অন্যতম মুখপাত্র মনোজিৎ মণ্ডল যদিও দ্বন্দ্বের কথা মানতে চাননি। তার মতে, দুই প্রজন্মের নেতা-নেত্রীদের মধ্যে স্টাইল অফ ফাংশানিংএ ফারাক তো থাকবেই।

"প্রবীণ নেতাদের তুলনায় কম বয়সীদের কর্মক্ষমতা বেশি হওয়া স্বাভাবিক। আবার এটাও ঠিক যে তরুণ প্রজন্মের লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ে তৃণমূল কংগ্রেসে এসেছে অভিষেক ব্যানার্জীকে দেখেই।তারা তো চাইবেই অভিষেকের যেভাবে রাজনীতি করে, সেভাবে কাজ করতে,” বলেন মি. মণ্ডল।

“তবে অভিষেক সহ এই তরুণরাও কিন্তু নেত্রী হিসাবে মমতা ব্যানার্জীকেই মেনে চলেন। এর মধ্যে কোনও দ্বিমত কোথাও নেই। তাই দুই প্রজন্মকে নিয়েই দল চলবে। এখানে কোনও দ্বন্দ্ব নেই,” বলছিলেন মি. মণ্ডল।

সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরীর কথায়, “তৃণমূল কংগ্রেস বলছে বটে যে কোনও দ্বন্দ্ব নেই, এগুলো সব সংবাদ মাধ্যমের তৈরি করা। তবে দ্বন্দ্ব আছে দলের ভেতরে, তা এই বয়স নিয়েই।এর শুরুটা হয়েছিল ২০১৯ সাল থেকেই। এখন জেলে রয়েছেন বা মারা গেছেন, এমন অনেক প্রবীণ নেতার সঙ্গেই সেই সময় থেকেই দ্বন্দ্ব বেঁধেছিল।"

“তবে এটাও ঠিক মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্ব নিয়ে কোনও বিরোধ নেই, সেটাকে কেউ চ্যালেঞ্জ করে না কখনই। তবে অভিষেক ব্যানার্জীর যে অনুগামী গোষ্ঠী রয়েছে, তারা চায় সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ করতে।"

"অন্যদিকে সুব্রত বক্সী বা বর্তমানে জেলবন্দী পার্থ চ্যাটার্জী, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক যারা প্রথম দিন থেকে মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গে রয়েছেন, যাদের ওল্ড গার্ড বলা হয়, ওই অংশটা মনে করছেন যে তারা দলে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছেন। বিরোধ এখানেই,” বলছিলেন মি. চৌধুরী।

মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে নি, বলছেন বিশ্লেষকরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে নি, বলছেন বিশ্লেষকরা

কেন সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ?

ভারতের রাজনীতিতে দেখা যায় যে মন্ত্রিত্ব বা বিধায়ক – সংসদ সদস্য বা অন্য কোনও সরকারি পদ পাওয়ার জন্য নেতা-নেত্রীদের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা থাকে। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসে সাংগঠনিক কাজের দখল নিয়ে যে দ্বন্দ্ব, সেটা বেশ অভিনব।

জয়ন্ত চৌধুরি এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলছিলেন, সাড়ে তিন দশকের বামপন্থী শাসনামলেও সাংগঠনিক কাজটাকেই খুব গুরুত্ব দেওয়া হতো, বিশেষত সিপিআইএম দলে। সংগঠন দেখভালের দায়িত্ব 'ওজনদার নেতাদেরই' দেওয়া হত, তাদের বেশিরভাগ কখনই মন্ত্রী বা সরকারি পদে বসেননি।

কিন্তু ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পরে সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ প্রায় নিরঙ্কুশ হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গে। বাম আমলেও কোথাও কংগ্রেস, পরের দিকে তৃণমূল কংগ্রেস স্থানীয় ভোটে জয়ী হত, পুরসভা নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু এখন সেই অবস্থাটা আর নেই, তৃণমূলই প্রায় সব জায়গায় নিয়ন্ত্রক।

"তাই সংগঠনের রাশ যার হাতে থাকবে, তারই গুরুত্ব অনেক বেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক। সেটাই নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে দলের তরুণ প্রজন্ম,” বলছিলেন মি. চৌধুরি।

তবে এই দ্বন্দ্ব কয়েকমাস পরের লোকসভা নির্বাচনে পড়বে কী না, তা এখনও স্পষ্ট নয় বলেই তিনি মনে করেন।