পথচারীর মাথায় ইট পড়ে মৃত্যুর ঘটনায় বিচার কী?

ছবির উৎস, CCTV
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অফিস শেষে বাসায় ফিরছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা দিপু সানা। রাজধানীর মগবাজারে ফুটপাত ধরে হেঁটে যাবার সময় আকস্মিক তার মাথায় উপর থেকে একটা ইট পড়ে এবং তাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান ৩৭ বছর বয়সী ওই নারী।
এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মানুষজন তাতে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।
সেই সাথে আবারও সামনে আসছে রাস্তার পাশে ভবনগুলোতে পথচারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি।
ভিডিওতে কী আছে?
সিসি ক্যামেরার এই ভিডিওটি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার। দেখা যাচ্ছে ব্যস্ত ফুটপাতে আরো অনেকের মতোই হেঁটে যাচ্ছিলেন দিপু সানা। হঠাৎ তার মাথায় উপর থেকে একটা ইট পড়ল, সাথে সাথেই ঘটনাস্থলে লুটিয়ে পড়েন তিনি।
আশপাশের হতবিহ্বল মানুষ একজন দুইজন করে ভিড় জমায় তার কাছে। পরে তাকে দ্রুত পাশের হাসপাতালে নিলে সেখানকার চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত দিপু সানার ৩ বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। এমন আকস্মিক মৃত্যুতে একেবারে দিশেহারা হয়ে গিয়েছে তার পরিবার।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবরটি আসার পর, সামাজিক মাধ্যমে অনেককেই এটি নিয়ে নানান প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা যায়।
জনি রায়হান নামের একজন লিখেছেন, "এই শহর মৃত্যু কূপ"।
করিম ফয়সাল নামের আরেকজন লিখেছেন, "মৃত্যুর এক সেকেন্ড আগেও কি তিনি কল্পনা করেছেন এভাবে ইটের আঘাতে চিরতরে মাটিতে লুটিয়ে পড়বেন? তার ৩ বছরের অবুঝ শিশুটি কি জানে তার মা আর কখনো এসে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরবে না!"
অনেকেই অনিরাপদ নির্মাণ কাজকে এই মৃত্যুর জন্য দায়ী করে পোস্ট দেন। কিন্তু পুলিশ বা পরিবারের কেউই নিশ্চিত করতে পারেনি আসলে ইটটি কোথা থেকে পড়েছে, আশেপাশে কোন নির্মাণাধীন ভবন ছিল না বলেও জানা যাচ্ছে, তবে কয়েকটি ভবনে সংস্কার কাজ চলছিল।
নিহতের পরিবার একটি মামলা দায়ের করেছে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি চাইছেন তারা।

ছবির উৎস, Google
পুলিশ কী বলছে?
ঘটনাটা ঘটেছে চারতলা একটি রেস্টুরেন্ট ভবনের ঠিক সামনে। তার সাথেই লাগোয়া একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১২ তলা ভবন। আর সেখানে রাস্তার উপর মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার।
ঘটনার পরপরই পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়ে আশেপাশের ভবনগুলোর প্রত্যেকটি তলা যাচাই করে বলে জানান রমনা থানার সহকারি পুলিশ কমিশনার সালমান ফারসি।
“আমরা সব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছি। যেটা মনে হচ্ছে ফখরুদ্দিন বা সিদ্ধেশ্বরী ভবন থেকে ইট পড়ার সম্ভাবনা কম। ফ্লাইওভার থেকে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। হতে পারে কোনও ট্রাকে তিরপল দিয়ে তার উপর ইট ছিল, সেটাই বাতাসে উড়ে এসে পড়েছে, তবে এ সবই সম্ভাবনা।”
আপাতত তাই পুলিশকে আগে ইটের উৎস খুঁজে বের করতে হবে বলে জানান তিনি। কে দায়ী সেটা নিশ্চিত হলে তারপর শাস্তির ব্যাপারটি আসবে।
তবে এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান ঘটনাটি যে কারও জন্যই আতঙ্কের। “এটা তো কোনওভাবেই স্বাভাবিক না, নিজেদের জন্যই আতঙ্কিত হওয়ার বিষয়। আমার বা আপনার ক্ষেত্রেও এমনটি হতে পারে।”
“এটা খুনের মতোই”
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
“এটা খুন নয়, কারণ খুন উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা হয়, কিন্তু এটা এতোটাই বেপরোয়া যে প্রায় খুনের কাছাকাছি”, বলেন আইনজীবী মিতি সানজানা।
এরকম ঘটনায় শাস্তি কী হয়ে থাকে? “কোম্পানির বিরুদ্ধে হলে টর্ট আইনে সাজা হয়”, বলেন মিতি সানজানা। তবে অবহেলাজনিত মৃত্যুর জন্য ব্যক্তির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে জরিমানা ও সাজার পরিমাণ খুব কম হয় বলে জানান তিনি।
আইনে বলা আছে, ৩০৪ এর (ক) ধারা হচ্ছে অবহেলাজনিত মৃত্যু, অর্থাৎ যদি কোনো ব্যক্তি নরহত্যা বলে গণ্য নয়, এমন কোনও বেপরোয়া বা তাচ্ছিল্যপূর্ণ কাজ করে কোনও ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায়, সে ব্যক্তি পাঁচ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে বা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।
কিন্তু এই আইনজীবী মনে করেন, এটা অনেকটা খুনের মতোই।
“আমি যখন কোনও কিছু নিচে ফেলবো, সেটা যদি পাবলিক প্লেস হয়, যেখানে মানুষ হাঁটাচলা করে, সেটা কারো মাথায় লেগে সে মারা যেতে পারে, কাজেই এটা অবহেলার। শতভাগ তাকে এর দায়িত্ব নিতে হবে”, বলেন তিনি।
এক্ষেত্রে তিনি অপরাধজনক নরহত্যায় ৩০৪ ধারার কথা বলেন। যেখানে বলা আছে, যে ব্যক্তি খুন নয় এমন শাস্তিযোগ্য নরহত্যা করে, সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা দশ বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং পাশাপাশি অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারে।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Faisal Titumir/BBC
বাংলাদেশে ভবন নির্মাণে নিরাপত্তার গুরুত্ব কতটুকু?
দিপু সানার মৃত্যু ছাড়াও বাংলাদেশে প্রায়ই নির্মাণাধীন ভবনে শ্রমিক বা ভবন থেকে কিছু পড়ে পথচারীর মৃত্যুর খবর আলোচনায় আসে।
নির্মাণ কাজে নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয় না, এমন অভিযোগ বহু পুরনো।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় নির্মাণ কাজের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা প্রকৌশলী আজমির শরীফের সাথে। তিনি জানান ভবন নির্মাণের নীতিমালা থাকলেও সেটা না মানার প্রবণতা এমন দুর্ঘটনার কারণ।
“রাজউকের নিয়ম অনুযায়ী রাস্তার পাশে কোনও প্রজেক্ট করতে গেলে যেখানে মানুষ চলাচল করবে সেখানে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ জায়গা ছেড়ে দিয়ে করতে হবে। এক্ষেত্রে সেফটি অটো চলে। আবার ফুটপাতের উপর ভবন চলে আসতে পারবে না, অনেক সময় নিচে ফুটপাত ছেড়ে ভবন নির্মাণ শুরু হলেও, উপরে সেটা আবার রাস্তার সীমানা বরাবর চলে আসে।”
এছাড়া বাংলাদেশে নির্মাণাধীন ভবনে সেফটি নেট বা সেফটি ক্যানোপি ব্যবহারের কথা বলা থাকলেও অনেকই সেটি করেন না। ফলে দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়তে থাকে।
“তিনটি ফ্লোর পরপর সেফটি ক্যানোপি দেওয়ার কথা, যাতে কোনও কিছু উপর থেকে পড়লে ওখানে আটকে থাকে, মাটিতে পড়বে না। এর পাশাপাশি সেফটি নেট, যাতে কোনকিছু বিল্ডিং এরিয়ার ভেতরেই থাকে। কিন্তু এগুলো অনেক জায়গায় মানা হয় না”, বলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ইলেকট্রিকাল প্রধান প্রকৌশলী।
তিনি মনে করেন এটা নির্মাণ খাতের একটা বড় সমস্যা। আইন থাকলেও সেটার প্রয়োগ না হওয়ায় প্রতি বছর অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে।
“এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। কনস্ট্রাকশান লাইনে এমনটা প্রায়ই ঘটছে। হয়তো কারও মাথার উপর কিছু পড়ে সে মারা গেল, সে হয়তো মামলা করছে না - ফলে দোষীরা পার পেয়ে যাচ্ছে”, বরছিলেন আজমির শরীফ।
তিনি এই সঙ্কট সমাধানে নির্মানাধীন প্রতিটি ভবনে একজন সেফটি এক্সপার্ট ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগের তাগিদ দেন। যারা সাইটে সেফটি কিট ঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, শ্রমিকদের নিরাপত্তা আবার রাস্তার নিরাপত্তার দিকটাও দেখবে।








