ধর্ম উপদেষ্টার অনুষ্ঠানে নারী সাংবাদিককে প্রবেশে বাধা, কী ঘটেছিল সেখানে?

বাংলাদেশে রাজধানী ঢাকায় কওমী উদ্যোক্তাদের আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে একজন নারী সাংবাদিককে সংবাদ সংগ্রহের কাজে প্রবেশে বাধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে বেশ আলোচনা।

বুধবার ঢাকায় আগারগাঁয়ে অবস্থিত চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে 'কওমী উদ্যোক্তা সম্মেলন ২০২৫' নামে এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন।

বাংলাদেশের একটি বেসরকারি সংবাদ সংস্থা ইউএনবিতে কর্মরত ওই সাংবাদিক এমি জান্নাত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এ বিষয়ে একটি স্ট্যাটাস দিলে আলোচনা-সমালোচনার সূত্রপাত হয়।

মিজ জান্নাত বিবিসি বাংলাকে জানান, বুধবার বিকেল তিনটায় চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সংবাদ সংগ্রহ করতে যান তিনি। কিন্তু সেখানকার নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে প্রবেশে বাধা দিয়ে জানায়, মেয়েদের প্রবেশ করতে দেওয়ায় নিষেধ রয়েছে।

এদিকে, বৃহস্পতিবার দুপুরে আয়োজক গোষ্ঠী ফেসবুকভিত্তিক গ্রুপ 'কওমী উদ্যোক্তা'র পক্ষ থেকে এ ঘটনায় 'দুঃখ প্রকাশ' করে একটি সংবাদ বিবৃতি দেয়।

এতে বলা হয়, "এ ধরনের কোনো ঘটনার দায় কোনোভাবেই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ধর্ম উপদেষ্টার নয়। এরূপ কোনো ঘটনার জন্য ধর্ম উপদেষ্টার ওপর দায় চাপানো অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক।"

পরে দুপুরেই সচিবালয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন এক সংবাদ সম্মেলনে এই বিবৃতির কথা উল্লেখ করে 'বিতর্কের অবকাশ নেই' বলে মন্তব্য করেন।

অতিথি হিসেবে ঘটনার দায় তার নয় বলে মন্তব্য করেন উপদেষ্টা মি. হোসেন।

কী ঘটেছিল এমির সাথে ?

ইউএনবির সাংবাদিক এমি জান্নাত বিবিসি বাংলাকে জানান, অফিস থেকে দেয়া অ্যাসাইনমেন্ট কাভার করতে বুধবার বিকেল তিনটায় চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে যান তিনি।

মিজ জান্নাত বলেন, "গেট দিয়ে ঢোকার সময় গার্ডরা বলে- আপনি তো ঢুকতে পারবেন না। কওমী, উনাদের প্রোগাম। উনারা মানা করছে। ভলান্টিয়ার আছে। তাদের সাথে কথা বলেন ওরা যেতে দেয় কিনা।"

অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করতে চেয়ে আরও ২০ মিনিট অপেক্ষার পর নিরাপত্তা প্রহরীরা ভেতর থেকে জেনে এসে মিজ জান্নাতকে জানান, 'মেয়েদের ভেতরে যেতে দেয়া হবে না'।

পরে তিনি তার অফিসকে এ বিষয়ে অবহিত করেন।

একইসাথে ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন যা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।

মিজ জান্নাত তার পোস্টে লিখেছেন, "দেশের দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের মধ্যে মাননীয় ধর্ম উপদেষ্টাকে শুধু আলাদা করে ছেলেদের সেবায় কাজ করার জন্য নিয়োজিত করা হয়েছে কি না, প্রশ্ন রেখে গেলাম। যদি এটাই হয়ে থাকে, স্পষ্টত উল্লেখ করে কাজ করার অনুরোধ।"

"একজন 'নারী' সাংবাদিক বলে নিউজ কাভার করতে পারবে না, এটা কতটা দুঃখজনক এবং অবমাননাকর, বলতে পারেন?" ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন মিজ জান্নাত।

মন্ত্রণালয় থেকে অনুষ্ঠানটি কাভার করতে যে আমন্ত্রণ করা হয়েছে তাতে নারী রিপোর্টার পাঠানো যাবে না এমন বিষয় কেন উল্লেখ করা হয়নি সে বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

এর আগেও বহুবার এ সংক্রান্ত প্রোগ্রাম কাভার করতে গিয়ে করতে না দেয়ার ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে মিজ জান্নাত লিখেছেন, " আবার তাদের মধ্যেই অনেকে ভেতরে সসম্মানে ঢুকতে দিয়েছেন, আমাদের সহকর্মী ভাইয়েরা জায়গা করে দিয়েছেন। কিন্তু সেগুলো দেশের দায়িত্বে থাকা সুনির্দিষ্ট কারও প্রোগ্রাম না হওয়ায় চুপ থেকেছি। "

মিজ জান্নাত ধর্ম উপদেষ্টার অনুষ্ঠানে নারীদের প্রবেশ নিয়ে এ ধরনের নির্দেশনা যারই হোক সংশ্লিষ্টরা দায় এড়াতে পারেন কিনা সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

ফেসবুকে এমির এই পোস্টের পরে দেশটির গণমাধ্যমকর্মীদের অনেককেই এ বিষয়ে প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে।

ধর্ম উপদেষ্টার ব্যাখ্যা কী ?

ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বুধবারের ওই অনুষ্ঠানে ইতিবাচক মানসিকতা থেকে গিয়েছেন।

তিনি বলেন, "এটাকে আমি মনে করছি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, আর্থিক সচ্ছলতা আসবে। এটা যদি বাইরে যায় তবে বৈদেশিক মুদ্রা আসবে। তারা ইনভেস্ট করবেন, বাজারে একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, কম্পিটিটিভ বাজার তৈরি হবে। এজন্য এটাকে (সম্মেলন) আমি ইতিবাচকভাবে দেখেছি।"

তবে অনুষ্ঠানে অবস্থানকালীন সময়ে নারী সাংবাদিককে প্রবেশ করতে না দেয়ার খবরটি জানতেন না বলে জানান মি. হোসেন।

তিনি বলেন, "আমি ওখানে ছিলাম মাত্র এক ঘণ্টা। অনেক সাংবাদিক ছিলেন, নিউজও কভার করেছেন। আমি তখনও জানতাম না বা আমারে কেউ বলে নাই এখানে নারী সাংবাদিককে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়েছে। আমাকে কেউ বলেও নাই, আমি শুনিও নাই।"

মি. হোসেন বলেন, "রাত সাড়ে এগারটায় আমাকে জানানো হয় আ্যামি জান্নাত নামে এক মহিলা একটা পোস্ট দিছেন। এগুলো করতে করতে রাত বারটা হয়ে গেল।"

"আমি প্রয়োজনে এমি জান্নাতের সাথে কথা বলতাম। কিন্তু রাত গভীর হওয়ার কারণে আর যোগাযোগ করতে পারিনি। আজকেও এটা নিয়ে ফেসবুকে নানা কথা হয়েছে," বলেন মি. হোসেন।

পরে কওমী উদ্যোক্তার পক্ষ থেকে দেয়া বিবৃতি পড়ে শোনান তিনি।

তিনি দাবি করেন, "এই দায় তো আমার ওপর কোনো দিন নয়। আমি তো তাদের অনুষ্ঠানে গেস্ট হিসেবে গেছি। একটা পজিটিভ মানসিকতা নিয়ে গেছি যে আসুক না আলেমরা উদ্যোক্তা হিসেবে আসুক।"

আয়োজকদের বক্তব্য

'কওমী উদ্যোক্তা' প্ল্যাটফর্মটির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি রোকন রাইয়ানের সাথে বৃহস্পতিবার সকালে বিবিসি বাংলার কথা হয়।

এই 'অনাকাঙ্ক্ষিত' ঘটনায় ধর্ম উপদেষ্টার কোনো দায় নেই বলে জানান তিনি।

মি. রাইয়ান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এখানে একটা মিসলিড হচ্ছে। আমাদের অনুষ্ঠানে কোনো নারী আসতে পারবে না এ ধরনের কোনো এথিকে আমরা বিশ্বাস করি। এটা সবার জন্য ওপেন ছিল, সবাই আসছে। কিন্তু কোনো একজন অডিয়েন্স কর্তৃক বিষয়টা এরকম হইছে।"

আরেকজন নারী সাংবাদিকের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমরা যখন জানতে পারছি আমাদের স্বেচ্ছাসেবক নিজে চ্যানেল আইয়ের একজন নারী সাংবাদিককে নিয়ে অনুষ্ঠানে বসাইছে। ওনার নামটা বলতে পারছি না।"

এ ঘটনাকে 'একটা ভুল' বলে মনে করেন মি. রাইয়ান।

তিনি বলেন, "ধর্ম উপদেষ্টাকে টার্গেট করে বলা হচ্ছে। আমাদের কোনো ত্রুটি বা এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ ছিল না যে এরকম নারী সাংবাদিককে হেনস্থা করা হবে বা করা হবে না। জাস্ট এটা একটা মিসটেক বলা যায়।"

"আমাদের নারী সাংবাদিক আসতে পারবে না এ ধরনের কোনো ইয়েই... ছিল না। আমরা তো নারী উদ্যোক্তাদের নিয়েই কাজ করি। আমরা কেন না করবো? আমাদের হলো উদ্যোক্তা প্রোগ্রাম," বলেন মি. রায়হান।

কিন্তু এই অনুষ্ঠানে সব আলেম ওলামা ছিলেন উল্লেখ করে মি. রায়হান বলেন, "আমাদের অনুষ্ঠানে যারা ছিল সবাই আলেম-ওলামা। হয়তো অডিয়েন্স থেকে কোনো একজন এটা করতে পারেন। এটা খুবই নিন্দনীয়।"

নিজেদের অনুষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে না উল্লেখ করে মি. রাইয়ান বলেন, "এটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। আমরা এটা বিশ্বাস করি না যে আমাদের অনুষ্ঠানে নারী সাংবাদিক আসতে পারবে না। এটা টোটালি একটা মিসটেক বলা যায়। আমাদের আগত কোনো গেস্ট কর্তৃক এরকম একটা মিসটেক হতে পারে আরকি।"

"আমাদের নারী উদ্যোক্তাও আছে। তো আমরা নারীদেরকে বাধা দিবো এটা আমরা বিশ্বাস করি না।"

মি. রায়হান আরও বলেন, "দোষ দিলে আমাদের আয়োজকদের দিতে পারে। আমাদের আগত কোনো অডিয়েন্স কর্তৃক এটা ঘটছে। এখানে আমরা দোষী। ধর্ম উপদেষ্টা তো দোষী না। আমরা দোষ স্বীকার করছি।"