বিএনপি প্রায় চার বছর পর আবার হরতাল করছে

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
পুলিশ ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নিজেদের মহাসমাবেশে হামলার অভিযোগ করে দেশজুড়ে আজ রবিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে বিএনপি।
এর মাধ্যমে তিন বছর আট মাস পর আবারো হরতাল কর্মসূচিতে ফিরে গেলো বিরোধী দল বিএনপি।
দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার বিকেল সোয়া তিনটার দিকে নয়াপল্টনে মহাসমাবেশের মঞ্চ থেকে রোববার হরতাল পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর পরপরই কার্যত সমাবেশের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
এমনকি সমাবেশে মি. আলমগীর সভাপতির ভাষণ দেয়ার কথা থাকলেও তাও দিতে পারেননি।
ওদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিএনপির এই হরতাল কর্মসূচির তীব্র সমালোচনা করে একে প্রতিহত করতে রোববার মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে।
দলটির সাধারণ সম্পাদক ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশ থেকে আজ রোববার দেশজুড়ে শান্তি সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন শনিবারের মহাসমাবেশ পণ্ড হলেও বিএনপিকে তার এই হরতাল কর্মসূচি নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়তে হবে কারণ রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে এটি অনেক আগেই গুরুত্ব হারিয়েছে।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একসময় তাদের সরকার বিরোধী আন্দোলনে নিয়মিত হরতাল করলেও গত দুই দশকে এই হরতাল কার্যত গুরুত্বহীন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে জনভোগান্তির কারণে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
কতদিন পর হরতালে ফেরা
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বিরোধী দল বিএনপি সর্বশেষ হরতাল করেছিলো ২০২০ সালের দোসরা ফেব্রুয়ারি। তখন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে ওই হরতাল ডেকেছিলো বিএনপি।
সেই হরতাল নিয়েও অনেক আলোচনা হয়েছিলো রাজনৈতিক অঙ্গনে। কারণ দলটি সেবারও দীর্ঘ সময় পর হরতাল কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলো।
তখন ৩ বছর ১০ মাস ১১ দিন পর ঢাকায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করেছিলো দলটি। তার আগে ২০১৭ সালের ১৩ই ডিসেম্বর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে সর্বশেষ হরতাল দিয়েছিল বিএনপি।
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করার পর ২০১৫ সালে ওই নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তিতে টানা তিন মাস হরতাল-অবরোধ পালন করে দলটি৷
ওই হরতাল-অবরোধ ও আন্দোলন এক পর্যায়ে সহিংস রূপ নেয়। একের পর বাসে আগুন ও পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের মতো ঘটনায় বহু মানুষ হতাহত হলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
সরকার এসব ঘটনার জন্য বিএনপি-জামায়াত জোটকে দায়ী করলেও তারা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে উল্টো সরকারকেই এর জন্য দায়ী করে আসছে।
তখন হরতাল অবরোধ চলতে চলতে পরিস্থিতি নিজ থেকেই এক পর্যায়ে স্বাভাবিক হয়ে আসলে, বিএনপি শেষ পর্যন্ত নিজেরাই সেই কর্মসূচি স্থগিত করে। ২০১৫ সালের এপ্রিলে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির অবসান ঘটান।
সেদিনের পর থেকে বিভিন্ন দল ও সংগঠনের হরতাল কর্মসূচিতে বিএনপি সরাসরি সমর্থন দিলেও তারা নিজেরা প্রায় চার বছর কোন হরতালের ডাক দেয়নি।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

'হরতাল আবেদনহীন'
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়াকে কেন্দ্র করে কিংবা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ করলেও দলের পক্ষ থেকে কোন হরতাল ডাকা হয়নি।
এর আগে ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের পর ২০০৯ সালের সাতই জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই বছরের ২৭শে জুন বিভিন্ন দাবিতে সকাল সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছিলেন তখনকার বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া।
এরপর ২০১০ সালের নভেম্বরে মিসেস জিয়াকে ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার প্রতিবাদে বিএনপি দ্বিতীয় হরতাল পালন করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলছেন বিএনপি একদিকে সমাবেশ করতে পারেনি আবার অন্যদিকে প্রতিবাদে যে কর্মসূচি দিয়েছে তার কোন আবেদনই জনগণের কাছে নেই অনেক কাল ধরেই।
“আমার ধারণা আওয়ামী লীগ এ সুযোগও নেবে কারণ মানুষ হরতাল পছন্দ করে না বহুকাল ধরেই। আগে সহিংসতা করে হরতাল সফল করা হতো। কিন্তু এখন তেমনটাও সম্ভব হবে না। এসব জেনেও বিএনপি এই কর্মসূচিই দিয়েছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. আহমেদ।
জামায়াতসহ আরও কয়েকটি দলও হরতাল করছে
বিএনপির সাথে হরতাল পালনের ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী এবং সমমনা আরো কয়েকটি রাজনৈতিক দল।
জামায়াতে ইসলামী হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করে এক বিবৃতিতে বলেছে, “২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশে পুলিশের বাধাদান ও মহাসমাবেশে যোগ দিতে আসা নেতাকর্মীদের অন্যায়ভাবে গ্রেফতারের প্রতিবাদে এই কর্মসূচি দেয়া হয়েছে"।
বিএনপির সমমনা দলের প্ল্যাটফর্ম গণতন্ত্র মঞ্চ, সেখান থেকে হরতালের ঘোষণা দেয়া হয় শনিবার বিকেলে।
এই প্ল্যাটফর্ম রবিবার পরবর্তী কর্মসূচির ঘোষণা দেবে বলে জানিয়েছে।

এক সময় হরতাল আহবানকারী রাজনৈতিক দলগুলো হরতাল সফল করতে হরতালের দিন ভোর থেকেই পিকেটিং করতো, অর্থাৎ যানবাহন চলাচলে বাধা দিতো।
এমনকি হরতাল সফল করতে গিয়ে অফিসগামী সরকারি কর্মকর্তাকে দিগম্বর করার ঘটনাও ঘটেছে, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত একটি ঘটনা।
এখনকার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এক সময় বিএনপি সরকারের এক মেয়াদেই ১৭৩ দিন হরতাল করেছিলো বলে আলোচনা আছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
দুই হাজার এক সালের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত হরতাল মোটামুটি কার্যকর করা সম্ভব হতো আহবানকারী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে।
কিন্তু এরপর আওয়ামী লীগ বিএনপি সরকারের সময়ে হরতাল আহবান করলেও সেগুলো সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিলো বঙ্গবন্ধু এভিনিউ ও আশেপাশের এলাকায়।
আবার ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে বিএনপি যেসব হরতাল ডেকেছে সেগুলো নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে মিছিল মিটিংয়েই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিলো।
তবে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে বিএনপির দীর্ঘকালীন হরতাল অবরোধের এক পর্যায়ে দুটোই অকার্যকর হয়ে পুরোমাত্রায় গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিলো।
ওই সময় হরতালের মধ্যেই ঢাকার রাস্তায় নামলে যানজটের মধ্যে পড়া আর অফিস আদালত, দোকান-পাট সবই খোলা থাকতে দেখা গেছে।
শুধু বড় শহরগুলোতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখা হয়েছিলো আর পাবলিক পরীক্ষায় পিছিয়ে দেয়ার মধ্যেই তখন সীমিত হয়ে পড়েছিলো হরতাল।











