যুদ্ধ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই খাদ্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় তেহরানের বাসিন্দারা

    • Author, ঘনচে হাবিবিয়াজাদ
    • Role, সিনিয়র সংবাদদাতা, বিবিসি নিউজ পার্সিয়ান
  • পড়ার সময়: ৪ মিনিট

ইরানে যুদ্ধ কতদিন চলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এর মধ্যেই দেশটির রাজধানী তেহরানের বাসিন্দারা এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুত করতে শুরু করেছেন।

শহরের বিভিন্ন জায়গায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয়রা বিবিসি পার্সিয়ানকে জানিয়েছেন, তারা চিন্তিত যে সামনের দিনগুলোতে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়া যাবে কি না। তারা এও মনে করছেন, জিনিসপত্রের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।

তেহরানের এক বাসিন্দা নাসরিন বলেন, "এই পরিস্থিতি কতদিন চলবে তা আমরা জানি না, সেজন্যই আমাদের জিনিসপত্র মজুত করে রাখতে হচ্ছে। আগে থেকে মজুত করে না রাখলে পরে জিনিসপত্র ফুরিয়ে যেতে পারে বলে আমরা মনে করছি"।

সাম্প্রতিক সময়ের এই যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই ইরানে নিত্যপণ্যের দাম অনেক বেশি ছিল।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে গত ডিসেম্বরে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। পরে ইসলামিক রিপাবলিক সরকার কঠোরভাবে সেই বিক্ষোভ দমন করে।

ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলা

গত কয়েক দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার কারণে ইরানের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির কয়েকজন বাসিন্দা।

ইরানজুড়ে এখন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট চলছে। কিন্তু অল্প সময়ের জন্য ইন্টারনেট সংযোগ পেয়ে বিবিসি ফার্সির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছিলেন ওই বাসিন্দারা।

সাধারণত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে ইরানের ভিসা দেওয়া হয় না। ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য এমনিতেই কঠিন। তার ওপর ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ইরান থেকে খবর সংগ্রহ করা আরও বেশি কঠিন হয়ে গেছে।

তেহরানের বাসিন্দা পৌয়া বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে।

"আমি একটু আগে দেখছিলাম, চালের দাম এখন ৬২৫ টোমান। যুদ্ধের আগে ছিল ৫৩০," তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে আলুর ওপর।

প্রসঙ্গত, ইরানে মূল মুদ্রা রিয়ালের পাশাপাশি প্রচলিত আরেকটি মুদ্রা হলো টোমান। এক টোমান সমান ১০ রিয়াল।

এদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, জরুরি পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার আপাতত সব ধরনের খাদ্য ও কৃষিপণ্য রপ্তানি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সরকারের গৃহীত এই নতুন সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকবে।

ইরানে এখন ইন্টারনেট প্যাকেজের দামও বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন কারাজের বাসিন্দা শায়ান। তেহরান থেকে গাড়িতে করে কারাজ যেতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগে যায়।

তিনি বলেন, "এখন অনলাইন হওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়েছে"। তিনি আরও জানান, ইলন মাস্কের স্টারলিংক সেবার ইন্টারনেট প্যাকেজের দামও ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

ছাব্বিশ বছর বয়সী ওমিদ তেহরানের বাসিন্দা। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি কতদিন ধরে চলবে তা নিয়ে মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে অস্বস্তি বাড়ছে।

শুরুতে সবার ধারণা ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হয়তো গত শনিবার নিহত হওয়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মতো নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হামলা চালাবে এবং এরপর এই আক্রমণ দ্রুত শেষ হয়ে যাবে, বলছিলেন তিনি।

কিন্তু মঙ্গলবার বিকেলেও তিনি শহরে বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। ক্রমাগত হামলা চলতে থাকায় তিনিও এখন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মজুত করেছেন।

তিনি আরও বলেন, সব দোকানও খোলা নেই।

"রাস্তায় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি এখন অনেক। বিশেষ করে যেসব এলাকায় হামলা হয়েছে, সেসব এলাকার অনেক দোকান বন্ধ"।

তেহরান ছেড়ে চলে যাওয়ার হিড়িক

কিছু বাসিন্দা জানিয়েছেন, সোমবার ও মঙ্গলবার তারা রাজধানীতে বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে তা চোখেও দেখেছেন।

তেহরানের আরেক বাসিন্দা মারিয়াম বলেন, সোমবার রাতে যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল, তিনি সেখানেই ছিলেন।

তিনি টেক্সট মেসেজে বিবিসিকে জানান, "গত রাতের হামলাটি ছিল ভয়াবহ। আমাদের পুরো বাড়ি কেঁপে উঠেছিল"।

কিছু বাসিন্দা জানিয়েছেন, চলমান হামলার কারণে তারা তেহরান ছেড়ে চলে গেছেন।

তবে মারিয়াম জানান, তিনি আপাতত তেহরানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তিনি বলেন, "অনেকে তেহরান ছেড়ে গেছে, কিন্তু আমরা বাড়িতেই থাকছি"।

যদি হামলায় মারা না যান, তাহলে রাস্তায় বিক্ষোভের ডাক থাকা পর্যন্ত তিনি সেখানেই থাকবেন এবং তখন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিক্ষোভে যোগ দেবেন বলে জানান তিনি।

তার ভাষায়, "এই কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলা হচ্ছে, এতে আমি খুবই খুশি। তারা সবাই (ক্ষমতা থেকে) সরে না যাওয়া পর্যন্ত আমরা এই হামলার মাঝে এখানেই থাকবো"।

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করার পর থেকে ইরানে অন্তত ৭৮৭ জন নিহত হয়েছেন।

পরিস্থিতি এখনও বেশ উত্তপ্ত। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, মঙ্গলবার তারা তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

ভিডিও যাচাই করে বিবিসি দেখেছে,তেহরানের পূর্বদিকে পারদিস এলাকায় বিস্ফোরণ হয়েছে।

এদিকে, ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়েছে। তেল আভিভসহ ইসরায়েলের বিভিন্ন সরকারি ও সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে দেশটি।

এছাড়া, যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে সেসব দেশেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে রয়েছে কাতার, বাহরাইন, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েত।

পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ ওমান ও সৌদি আরবেও হামলা চালিয়েছে ইরান।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তারা তাদের হামলার পরিধি বাড়িয়ে আরও নতুন নতুন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে।

এর মধ্যে রয়েছে জাহাজ চলাচলের পথ, বেসামরিক স্থাপনা, দুবাইয়ের কিছু হোটেল, এমনকি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও।