জুলাই সনদ কি রাজনীতিতে বড় ইস্যু হয়ে উঠতে যাচ্ছে

    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৭ মিনিট

বাংলাদেশে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ এবং গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা প্রশ্নে হাইকোর্টের রুল জারির পর এটিই আগামী দিনে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে যাচ্ছে কি না সেই কৌতূহল তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথেই হওয়া সংবিধান সংস্কার বিষয়ে গণভোটে হ্যাঁ জিতলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় যাওয়া বিএনপি।

এরপর আবার এ বিষয়টি আদালতে নিয়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটে থাকা এনসিপি। সংসদ নির্বাচনে দল দুটি থেকে নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের সময় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছে।

কিন্তু বিএনপি ওই শপথ না নেওয়ায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন আদৌ আর হবে কি-না সেই আলোচনাও আছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ''রাজনৈতিকভাবে অনেক ধরনের বক্তব্য আসতে পারে কিন্তু যেসব বিষয়ে আদালতে রিট হয়েছে, সেসব বিষয়ে আদালত থেকে কী নির্দেশনা আসে সেটিও সংসদকে আইন প্রণয়নের সময় বিবেচনায় নিতে হবে''।

ফলে জুলাই সনদ ও গণভোটের বৈধতার প্রশ্নে আদালত থেকে কী ধরনের সিদ্ধান্ত আসে এবং এ নিয়ে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত-এনসিপির রাজনৈতিক লড়াই কতদূর এগোয়, তার ওপর রাজনীতির গতি প্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, সব মিলিয়ে জুলাই সনদ প্রসঙ্গটিই সামনে রাজনীতিতে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

রিটে কী বলা হয়েছে, আদালত কী বলেছে

দুই হাজার চব্বিশ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক আলোচনার পর ২০২৫ সালের ১৭ই অক্টোবর 'জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫' স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

একই বছরের ১৩ই নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

পরে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না তা যাচাইয়ে ২৫শে নভেম্বর গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়।

তার ভিত্তিতে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন একই সাথে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তাতে হ্যাঁ ভোট জয়ী হয়েছে।

কিন্তু এরপর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোটের অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দুটি রিট দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের দুজন আইনজীবী।

রিটে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-কে কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে রুল জারির আবেদন করেছিলেন তারা।

একই সঙ্গে এই অধ্যাদেশ ও সনদের কোনো কার্যক্রম যাতে কার্যকর না হয়, সে বিষয়ে নিষেধাজ্ঞাও চাওয়া হয় রিটে। রিট আবেদনে বলা হয়, সংবিধানে গণভোট এবং জুলাই জাতীয় সনদের কোনো বিধান নেই।

মঙ্গলবার শুনানি শেষে আদালত জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোটের অধ্যাদেশ এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেন।

রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি সংসদ সচিবালয় থেকে নবনির্বাচিত সাংসদদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, তা কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না।

একই সঙ্গে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ৩ নম্বর তফসিল—যার অধীনে রাজনৈতিক দলগুলো ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছিল—তা কেন বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

আইন সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় সংসদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আদালতের এ রুলের পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দিক থেকে প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করে।

ওই দিনই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছেন যে বিচার বিভাগ থেকে এসব বিষয়ে কী ধরনের মতামত আসে সেদিকেও তাদের দৃষ্টি রয়েছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, "ক্ষমতাসীনদের প্রশ্রয়েই এ ধরনের রিট হওয়ার নজির বাংলাদেশে আছে। সে কারণেই বিরোধী দলগুলোর দিক থেকে এই রিটের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিএনপির অবস্থানও সে প্রশ্নকে জোরালো করেছে অনেকের মধ্যে"।

জামায়াত ও এনসিপি যা বলছে

হাইকোর্ট বিভাগ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত আদেশ, সংবিধান সংস্কার সভার শপথ গ্রহণ, গণভোটের প্রশ্ন এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে চার সপ্তাহের রুল জারির পর রাতেই জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

ওই বিবৃতিতে তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিষয়কে আদালতের বারান্দায় টেনে নেওয়া সমীচীন নয়। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যু আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তির যে চেষ্টা হয়েছে, তার পরিণতি ইতিবাচক হয়নি বরং তা জাতীয় জীবনে বিভ্রান্তি ও অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছে বলে বিবৃতিতে মন্তব্য করেছেন তিনি।

"সরকারের আচরণে প্রতীয়মান হচ্ছে যে রাজনৈতিক দায় এড়িয়ে আদালতের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টা চলছে। পরিকল্পিতভাবে রিট পিটিশন দায়ের করিয়ে পর্দার আড়াল থেকে ইন্ধন দেওয়া হলে তা হবে দ্বিচারিতা ও আত্মঘাতী পদক্ষেপ," বিবৃতিতে বলেছেন তিনি।

এর আগে সোমবার রিট পিটিশন দুটি দায়েরের পর ওই রাতেই জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও আইনজীবী শিশির মনির রিট দায়েরকে 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' বলে আখ্যায়িত করেন।

তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে, "তাড়াহুড়ো করে দুইজন আইনজীবীর মাধ্যমে এই রিট পিটিশন দায়েরের পেছনে সরকারের ইন্ধন রয়েছে। আদালতে আইনজীবীদের মধ্যে সরকারের ইন্ধন দেখা যাচ্ছে"।

এরপর এ বিষয়ে অনেক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া আসে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির দিক থেকেও।

দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন যে, সরকারি দল বিএনপি জুলাই সনদ নিয়ে একধরনের 'ডুয়েল গেম' খেলছে।

"বিএনপি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে জুলাই সনদকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য ও সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা করার জন্য আদালতে গিয়েছে। তারা একধরনের ডুয়েল গেম খেলছে। বিএনপির পক্ষ থেকে সংসদের ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, অথচ ঐকমত্য কমিশনে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল এবং গণভোটের মাধ্যমে বৈধতা পেয়েছে, এখন সেখানে সাপ-লুডু খেলার মতো পিক অ্যান্ড চ্যুজ করা হচ্ছে," সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন তিনি।

বিএনপির অবস্থান কী

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, আদালত থেকে যে সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা আসবে সেটি সংসদকেও বিবেচনায় নিতে হবে, যাতে করে আইন প্রণয়নের পর সেটি আবার আদালতে বাধাগ্রস্ত না হয়।

এর আগে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের দিনই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপস্থিতিতে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ কে পড়াবেন এবং শপথের ফরম সংযুক্ত নেই বলে তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিচ্ছেন না।

পরে সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মি. আহমদ এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, "গণভোটের রায় অনুসারে জনগণের যে ইচ্ছে ও রায়ের প্রতিফলন ঘটাতে হলে সংসদে যেতে হবে আগে এবং সংসদে প্রয়োজনীয় আইন ও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। বিদ্যমান সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো বিধান নেই। সে বিবেচনায় আমরাও শপথ নেইনি এবং আমাদের এপ্রোচও করা হয়নি"।

এরপর সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাতের পর মি. আহমদ এ বিষয়ে আবারো সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন।

তিনি বলেন, "সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে সংবিধানে কিছু না থাকায় যারা সেই শপথ নিয়েছে সেটা তাদের ব্যাপার। ১২ই মার্চ সংসদ শুরু হবে এবং এখানে শুধু সংসদ সদস্যরা যোগ দিবেন। অসাংবিধানিক কিছু আমরা জাতীয় সংসদে উত্থাপন করতে পারি না। সংবিধান সংস্কার পরিষদ হতে হলে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে। সংবিধানে সংশোধনী আনতে হবে। এরপর শপথ নেয়া হবে কি-না। এগুলো দীর্ঘ প্রক্রিয়া"।

একই সঙ্গে তিনি তখন বলেন, "আমরা শুনেছি এ নিয়ে রিট হয়েছে। দেখা যাক বিচার বিভাগ থেকে কী মতামত আসে"।

'ইস্যু হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে'

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, জুলাই সনদ ও গণভোট ইস্যুতে বিএনপির সাথে জামায়াত ও এনসিপির অবস্থানগত পার্থক্য পরিষ্কার এবং এখন দেখার বিষয় হবে এই পার্থক্য কতদূর অগ্রসর হয়।

"এগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপির মধ্যে ইতস্তত বোধটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ফলে জামায়াত ও এনসিপি এটি নিয়ে চাপ তৈরির চেষ্টা করলে এটা ইস্যু হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ।

আরেকজন বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলছেন, জুলাই সনদ ও গণভোট ইস্যুতে বিএনপির অবস্থান আগে থেকেই পরিষ্কার, কারণ দলটি আগেই বলেছে তাদের ইশতেহার নির্বাচনে জনরায় পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিবে তারা।

"এখন এটি রাজনৈতিক ইস্যু হবে কি-না তা নির্ভর করবে বিরোধীরা এটিকে কতদূর এগিয়ে নিতে পারে এবং তা জনসমর্থন পায় কি-না তার ওপর," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. রহমান।