যারা আমাদের নিষেধাজ্ঞা দেয়, তাদের কাছ থেকে কিছু কিনবো না- হাসিনা

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যারা বাংলাদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেবে, সেসব দেশ থেকে কোনরকম কেনাকাটা করবে না বাংলাদেশ। অর্থ মন্ত্রণালয়কে তিনি এই বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছেন।

নির্বাচনকালীন সরকার, ডলার সংকট এবং আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঘোষণা নিয়েও তিনি কথা বলেছেন।

সোমবার গণভবনে একটি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এসব মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য সফর করেছেন। সেই সফরের বিস্তারিত তুলে ধরতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল।

গত ২৫শে এপ্রিলে জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি নয়ই মে দেশে ফিরে আসেন।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি ও আলোচনার বর্ণনা তুলে ধরেন।

কিন্তু সংবাদ সম্মেলনের পর প্রশ্নোত্তর পর্বে উঠে আসে নির্বাচন, সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় এবং রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশ্নোত্তর পর্বে উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গ।

এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ''আমাদের কী কারণে স্যাংশন দিল? যাদের দিয়ে আমরা সন্ত্রাস দূর করলাম, জঙ্গি দূর করলাম, তাদের ওপরে? হোলি আর্টিজানে যারা হামলা করেছিল, তাদের দমন করে মানুষ জীবিত উদ্ধার করতে কিন্তু ২৪ ঘণ্টাও লাগেনি। এরপরেও আরও কোন ঘটনা কেউ ঘটাতে পারেনি। এরপরেও স্যাংশনটা কিসের জন্য?''

বাংলাদেশের সামরিক ও পুলিশের কর্মকর্তাসহ সাতজনের ওপর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ।

এরপর ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে সরকার থেকে উদ্যোগের কথা বলা হলেও এখনো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়নি।

সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘’আমি এই জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রীকে বলে দিয়েছি, আমাদের কেনাকাটা - বিদেশ থেকে জিনিস ক্রয়ের ক্ষেত্রে একটা ক্লজ (শর্ত) থাকবে, যারা আমাদের ওপর স্যাংশন দেবে, তাদের কাছ থেকে কোন জিনিস আমরা কিনবো না। তাতে ভয়ের কি আছে? আমরা তো কারও ওপর নির্ভরশীল না। আমাদের যা দরকার, আমরা নিজেরাই তো উৎপাদন করতে পারি।‘’

''কথা নাই বার্তা নাই, স্যাংশনের ভয় দেখাবে, আর আমরা ভয়ে মুখ বুঝে থাকবো কেন? আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি, যারা আমাদের সপ্তম নৌবহরের ভয় দেখিয়েছিল, সেটাও পার করে বিজয় অর্জন করেছি, এই কথা ভুললে চলবে না। দরকার হলে এক বেলা খেয়ে থাকবো, তাতেও অসুবিধা নেই,'' বলছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

''আমাদের ওপর যারা স্যাংশন দেবে, তাদের কাছ থেকে আমরা কিছু কিনবো না, পরিষ্কার কথা। এর মধ্যেই আমি দুটি অ্যাকশন নিয়েছি আগেই।''

তবে সেই অ্যাকশনের বিস্তারিত জানান নি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সম্প্রতি বাংলাদেশের গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ফ্রান্স থেকে ১০টি এয়ারবাস কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপরই ঢাকায় বোয়িং একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, এতে বিমান বাংলাদেশের খরচ অনেক বেড়ে যাবে। বাংলাদেশ আগে একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে বিমান কিনলেও এখন ফ্রান্সের এয়ারবাস কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ডলার ও রিজার্ভ সংকট

ডলার সংকট এবং রিজার্ভ নিয়ে একটি প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘’ডলার সংকট তো বিশ্বব্যাপী, শুধু বাংলাদেশের নয়। প্রথমে করোনা সংকট, এরপর ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধ। সারা বিশ্বে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে গেছে, পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে।''

শেখ হাসিনা জানান, করোনা অতিমারীর সময় বাংলাদেশ রিজার্ভটা ভালোভাবে ধরে রাখতে পেরেছে কারণ আমদানি-রপ্তানি, বিদেশে যাতায়াত বন্ধ ছিল। এরপরে যখন অর্থনীতি উম্মুক্ত হলো, স্বাভাবিকভাবে ডলার খরচ হচ্ছে। বিনিয়োগ হচ্ছে, উন্নতি হচ্ছে, ফলে ডলারের ওপর চাপ পড়বে।

অতীতে বিএনপি সরকারের সময় বাংলাদেশের রিজার্ভের আকার অনেক কম ছিল, এই তথ্য জানিয়ে শেখ হাসিনা বলছেন, ‘’এর আগে আমাদের রিজার্ভ কতটুকু ছিল? ২০০৬ সালে রিজার্ভ ছিল এক বিলিয়ন ডলারের কম। আমাদের অন্তত তিনমাসের কেনাকাটার মতো ডলার আমাদের হাতে যেন থাকে, রিজার্ভ নিয়ে সেটাই চিন্তা, এর বেশি তো চিন্তার দরকার নেই।''

''আমাদের রিজার্ভ যা আছে, তাতে বলতে পারি, আমাদের তেমন কোন সংকট নেই। এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার খুব বেশি কারণ নেই।‘’

নির্বাচন ও বিরোধী দল

সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক জানতে চান, নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে? সেই সঙ্গে বিএনপির আন্দোলন জোরদার করায় সরকার কোন চাপ অনুভব করছে কিনা?

এই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘’নির্বাচন আসতেছে, ভয় পাবো? কেন ভয় পাবো? আমি জনগণের জন্য কাজ করেছি। জনগণ যদি ভোট দেয়, আছি, না দিলে নাই।

''আমি ইলেকশন করবো এই কারণে, যেহেতু করোনার কারণে আমরা যা ২৪ সালের মধ্যে করতে পারি নাই, সেটুকু আমি করে দিয়ে যেতে চাই।''

নির্বাচনকালীন সরকার প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা জানান, বাংলাদেশ ওয়েস্টমিনিস্টার টাইপ অফ ডেমোক্রেসি অনুসরণ করে। তাই ব্রিটেনে যেভাবে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশেও সেভাবেই করা হবে।

''এর মধ্যে আমরা এইটুকু উদারতা দেখাতে পারি, পার্লামেন্টে সংসদ সদস্য যারা আছে, তাদের মধ্যে কেউ যদি ইচ্ছাপ্রকাশ করে যে, নির্বাচনকালীন সময়ে তারা সরকারে আসতে চায়, আমরা রাজি আছি,'' তিনি বলেন।

তিনি জানান ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় বিএনপিকেও এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তারা আসেনি। এখন যেহেতু তারা পার্লামেন্টেও নাই, তাদের নিয়ে চিন্তারও কারণ নেই।

তবে নির্বাচন ঘিরে যদি কোনরকম জ্বালাও পোড়াও করা হয়, সেটি সহ্য করা হবে না বলে তিনি সতর্ক করে দেন।