মাইলস্টোনে দিনভর অবরুদ্ধ থাকার পর সন্ধ্যায় যেভাবে বের হলেন উপদেষ্টারা

- Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
ঢাকার যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিমান বাহিনীর যুদ্ধ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ত্রিশ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, মঙ্গলবার সেই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিদর্শনে গিয়ে তোপের মুখে পড়েন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিক্ষা উপদেষ্টা সি. আর. আবরার এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
প্রায় নয় ঘণ্টা তাদেরকে কলেজ ভবনে অবরোধ করে রাখেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে সকাল থেকে আটকে থাকার পর সন্ধ্যায় পুলিশের পাহারায় বের হয়ে আসেন উপদেষ্টারা।
যুদ্ধ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় হতাহতের নাম-পরিচয় প্রকাশ, ক্ষতিপূরণ, সেনা সদস্যদের নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা সহ ছয় দফা দাবিতে মঙ্গলবার সকালে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে বিক্ষোভের ডাক দেন সেখানকার বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা।
সকালে আইন উপদেষ্টা, শিক্ষা উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তাদেরকে কলেজ ভবনে অবরুদ্ধ করে ফেলেন।
এক পর্যায়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ভবনের একটি জানালা দিয়ে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে শান্ত করার চেষ্টা করলেও বিক্ষোভকারীরা তা আমলে নেননি।
বিকেলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে আসলে ঘটনাস্থল থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন উপদেষ্টারা। কিন্তু তাদের গাড়ি দিয়াবাড়ি মোড় পর্যন্ত যেতে না যেতেই আবারও বাধার মুখে পড়ে।
বিক্ষোভের মুখে তখন তারা পুনরায় মাইলস্টোন প্রাঙ্গণে ফিরে আসতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যার পর পুলিশি প্রহরায় উপদেষ্টারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে সক্ষম হন।
এদিকে, শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার এবং শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জুবায়েরের পদত্যাগ দাবি ঘিরে সচিবালয়ের সামনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে।
এতে উভয়পক্ষের ৫০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন। তাদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার সচিবালয় এলাকায় সংঘর্ষের ওই ঘটনা ঘটে। এ সময় ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
শুরুতে ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলেও একপর্যায়ে তারা সচিবালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়েন। এসময় পুলিশ তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করতে গেলে দু'পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়।
এ ঘটনার মধ্যেই শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব সিদ্দিক জুবায়েরকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
নয় ঘণ্টা ধরে অবরুদ্ধ
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল থেকে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে একত্রিত হতে থাকেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা।
কিন্তু নয়টার দিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সেখানে অবস্থান, সভা-সমাবেশ ও দলবদ্ধ কর্মসূচি নিষিদ্ধ করা হয়।
পরে শিক্ষার্থীরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাইরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
এর মধ্যে সকাল ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে যান আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিক্ষা উপদেষ্টা সি. আর. আবরার এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
তারা সেখানে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরেই উপস্থিত শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন। উপদেষ্টাদের উদ্দেশ্য করে "ভুয়া, ভুয়া" বলে দুয়োধ্বনি দিতে থাকেন বিক্ষুব্ধরা।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে সহ আশেপাশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিক্ষোভে যোগ দেন।
কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে উপদেষ্টারা পরে কলেজের কনফারেন্স কক্ষে যান। সেখানে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের কয়েকজন প্রতিনিধিকে ডেকে নিয়ে কথা বলেন তারা।
দুপুর একটার দিকে কনফারেন্স রুম থেকে বের হয়ে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন।
"শিক্ষার্থীদের দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক। সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দিচ্ছি, আমরা প্রতিটি দাবি পূরণ করবো। বিশ্বাস রাখেন," বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন মি. নজরুল।
এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস উইং থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতেও শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোকে যৌক্তিক বলে উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু শিক্ষার্থীরা তারপরও বিক্ষোভ না থামানোয় উপদেষ্টারা পুনরায় কলেজ ভবনে ফিরে যান।

যেভাবে বের হলেন উপদেষ্টারা
উপদেষ্টাদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাসের পরও বিক্ষোভ না থামানোয় একপর্যায়ে সেটি ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া পর্যন্ত গড়ায়।
দুপুর সোয়া দুইটার দিকে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মাঝে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং ইট-পাটকেল ছোঁড়াছুড়ির ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত তিন জন আহত হন।
এ ঘটনার পর সেখানে পুলিশের উপস্থিতি আরও বাড়তে দেখা যায়।
বিকেল তিনটার দিকে বিক্ষোভকারীরা সরে গেলে কলেজ থেকে বের হন উপদেষ্টারা। কিন্তু তাদের গাড়ি দিয়াবাড়ি মোড়ে পৌঁছালে শিক্ষার্থীরা ফের পথ আটকান।
এসময় তারা আইন উপদেষ্টা ও শিক্ষা উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে নানান স্লোগান দিতে থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে উপদেষ্টারা পুনরায় মাইলস্টোন ক্যাম্পাসে ফিরে যান।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে হঠাৎ সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দেখা যায়। তখন দুই উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের সদস্যরা আবার বের হয়ে গাড়িতে ওঠেন এবং দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

সচিবালয়ে সংঘর্ষ
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের উপদেষ্টাদের অবরুদ্ধ করার ঘটনা যখন ঘটছিল, সেই সময় শিক্ষা উপদেষ্টাএবংশিক্ষা সচিবেরপদত্যাগ দাবি ঘিরে সচিবালয় এলাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
মঙ্গলবার বিকেলের এই ঘটনায় উভয়পক্ষের ৫০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন। এছাড়া বন্ধ হয়ে যায় ওই এলাকায় যান চলাচল।
উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর যুদ্ধ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণহানির ঘটনার পর সোমবার রাত পৌনে তিনটার দিকে পরদিনের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা স্থগিত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
কিন্তু খবরটি জানা না থাকায় পরীক্ষার্থীদের অনেকেই মঙ্গলবার সকালে পরীক্ষা কেন্দ্রে হাজির হন। পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেরিতে দেওয়ায় এই ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরীক্ষার্থীরা।
মূলতঃ সেই ক্ষোভ থেকেই মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা কলেজ, আইডিয়াল কলেজ ও সিটি কলেজ সহ আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সচিবালয় অবরোধ করেন।
শুরুতে ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলেও একপর্যায়ে তারা সচিবালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়েন। এসময় পুলিশ তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করতে গেলে দু'পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়।

ছবির উৎস, TV Screen Grab
গাড়ি ভাংচুর, লাঠিপেটা
মধ্যরাতে পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণায় ক্ষোভ শিক্ষার্থীরা মঙ্গলবার দুপুরে প্রথমে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও করতে যান। পরে সেখান থেকে বেলা দেড়টার দিকে মিছিল নিয়ে তারা সচিবালয়ের সামনে আসেন।
শুরুতে মূল ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। এসময় শিক্ষা উপদেষ্টা এবং শিক্ষা সচিবের পদত্যাগ দাবিতে তাদেরকে নানান স্লোগান দিতে দেখা যায়।
বিকেল চারটার দিকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ফটক পেরিয়ে সচিবালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়েন। তখন পার্কিংয়ে রাখা বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠিপেটা শুরু করে পুলিশ। এসময় কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুঁড়তেও দেখা যায় তাদের।
ছত্রভঙ্গ শিক্ষার্থীরা এরপর শিক্ষাভবন, গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট সহ আশেপাশের এলাকায় অবস্থান নেন।
এরপর পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারী ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ফের কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করতে থাকে। অন্যদকে, শিক্ষার্থীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে।
প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে এভাবে সংঘর্ষ চলার পর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে শিক্ষার্থী ওই এলাকা থেকে সরে গেলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে আসে।

ছবির উৎস, TV Screen Grab
শিক্ষা সচিবকে প্রত্যাহার
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব সিদ্দিক জুবায়েরকে প্রত্যাহার করেছে সরকার।
"ইতোমধ্যে শিক্ষা সচিবকে অপসারণ করা হয়েছে। ন্যায্য যেকোনো দাবি মানতে সরকার দায়বদ্ধ," মঙ্গলবার বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় লিখেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তে শিগগিরই কমিটি গঠিত করা হবে বলেও জানান মি. আলম।
এর আগে, সোমবার গভীর রাতে নিজের ফেসবুক পাতায় মঙ্গলবারের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্তের কথা প্রথম জানান তথ্য উপদেষ্টা।
এরপর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াও তার ফেসবুক পাতায় লেখেন, "আজকের (মঙ্গলবারের) এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।"
কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে আরও অনেক পরে, যা নিয়ে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।








