ইসলাম গ্রহণের পর বিয়ে করে থেকে যাওয়া ভারতীয় নারীকে আটক করেছে পাকিস্তানের পুলিশ

ছবির উৎস, Ahmad Pasha
- Author, এহতেশাম শামি
- Role, বিবিসি নিউজ উর্দু, ইসলামাবাদ
সরবজিৎ কউর নামে যে ভারতীয় নারী পর্যটক ভিসায় পাকিস্তানে গিয়ে সেদেশের এক নাগরিককে বিয়ে করেছিলেন, তাকে এবং তার স্বামী – দুজনকেই আটক করেছে পাকিস্তানের পুলিশ।
সরবজিৎ কউর নামের ওই ভারতীয় নারীকে বৃহস্পতিবার ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে ভারতে ফেরত পাঠাতে পারে পাকিস্তান। তবে তার পাকিস্তানি স্বামীকে হেফাজতে রেখেই তদন্ত চলবে বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী সরদার রমেশ সিং আরোরা।
সরবজিৎ কউর গত বছরের চৌঠা নভেম্বর একদল শিখ তীর্থযাত্রীর সঙ্গে পাকিস্তানে প্রবেশ করেন এবং তার ভিসার মেয়াদ ছিল ১৩ই নভেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু তিনি ভারতে ফিরে যাননি।
মিজ. কউর এরপরে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে শেখুপুরার বাসিন্দা নাসির হুসেনকে বিয়ে করেন। সেই থেকে তিনি পাকিস্তানেই বসবাস করছেন।
পাকিস্তানের নানকানা সাহিব শিখ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অতি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। ভারতীয় শিখদের ওই তীর্থক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য পাকিস্তান বিশেষ ধর্মীয় ভিসা দিয়ে থাকে।
রমেশ সিং আরোরা বিবিসি উর্দুকে বলেছেন যে চৌঠা জানুয়ারি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা খবর পান যে নানকানা সাহিবের কাছে একটি গ্রামে সরবজিৎ কউর এবং নাসির হুসেন রয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গেই প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়।
তিনি বলেন, ওই অভিযানে সরবজিৎ কউর ও তার পাকিস্তানি স্বামীকে হেফাজতে নেওয়া হয়। এখন তাকে নানকানা সাহিব পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। দুজনই বর্তমানে নানকানা সাহিব পুলিশ সদর দফতরে রয়েছেন।
পুলিশ এবং ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর কর্মকর্তারা যৌথভাবে বিষয়টির তদন্ত করছেন বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন যে ২০১৬ সালে টিকটকের মাধ্যমে সরবজিৎ কউর এবং নাসির হুসেনের পরিচয় হয়।
বেশ কয়েকবার তারা ভিসার জন্য আবেদনও করেছিলেন। তবে আইনগত বাধার কারণে তাদের ভিসা দেওয়া হয়নি।

ছবির উৎস, ARIF ALI/AFP via Getty Images
'গ্রেফতার নয়, প্রত্যর্পন'
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বিবিসির সংবাদদাতা সুমাইলা খানকে মন্ত্রী মি. আরোরা জানিয়েছেন যে সরবজিৎ কউরকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার করা হয়নি, তবে ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করে মেয়াদের পরেও দেশে থেকে যাওয়ার কারণেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
"তিনি ধর্মীয় ভিসায় এসেছিলেন এবং ভিসার শর্ত মেনেই দেশে থাকার কথা ছিল তার। প্রথম থেকেই এ ব্যাপারে আমার অবস্থান স্পষ্ট ছিল," বলছিলেন মি. আরোরা।
তিনি আরও জানান যে, পাকিস্তানের আইন অনুযায়ী, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কেউ দেশে থেকে গেলে তাদের প্রত্যর্পন করা হয়। এই ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই করা হচ্ছে।
প্রত্যর্পনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য সরবজিৎ কউরকে ইভ্যাকুই ট্রাস্ট প্রপার্টি বোর্ডের (ইটিপিবি) হাতে তুলে দেওয়া হবে। এই সংস্থাটি ধর্মীয় তীর্থস্থান ও তীর্থযাত্রীদের বিষয়গুলো সমন্বয় করে থাকে।
সরকার ইতোমধ্যেই পাকিস্তান শিখ গুরদোয়ারা প্রবন্ধক কমিটির (পিএসজিপিসি) কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ভবিষ্যতে দর্শনার্থীদের জন্য ভিসা বিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে।
"তীর্থযাত্রীরা যদি তাদের যাত্রার নির্ধারিত উদ্দেশ্য মেনে না চলেন, তাহলে তা পুরো প্রক্রিয়াটিকেই বাধাগ্রস্ত করে। নানকানা সাহিবের মতো তীর্থস্থানের সঙ্গে গভীর ধর্মীয় অনুভূতি জড়িয়ে আছে এবং যে কোনো ধরনের অপব্যবহার শুধু কর্তৃপক্ষের জন্যই নয়, প্রকৃত তীর্থযাত্রীদের জন্যও জটিলতা তৈরি করে," বিবিসিকে জানিয়েছেন রমেশ সিং আরোরা।
এই মুহূর্তে নাসির হোসেন সম্পর্কে সীমিত তথ্যই সরকারের কাছে আছে বলে জানিয়েছেন মি. আরোরা। তবে মি. হুসেনকে এখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং তদন্ত কোন পথে এগোয়, সেটা দেখেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না তা জানার জন্য মি. হুসেনের মোবাইল ফোনটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
তবে এখন তাদের সম্পূর্ণ দৃষ্টি সরবজিৎ কউরকে প্রত্যর্পণ করার দিকে, এমনটাই জানিয়েছেন রমেশ সিং আরোরা।

ছবির উৎস, Pakistan Police
ভারতে ফেরত পাঠানোর আবেদন আদালতে
সরবজিৎ কউরকে ভারতে ফেরত পাঠানোর জন্য লাহোর হাইকোর্টে আবেদন করেছেন পাঞ্জাবের মানবাধিকার কর্মী দাস মহিন্দর পাল সিং।
একটি ভিডিও বিবৃতি প্রকাশ করে মহিন্দর পাল সিং বলেন, "স্বেচ্ছায় বিয়ে করার সিদ্ধান্তটা সরবজিৎ কউরের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু তিনি ধর্মীয় ভিসার অপব্যবহার করেছিলেন, যা বিশ্বজুড়ে শিখদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে।
"ব্যক্তিগত জীবনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তাদের আছে, কিন্তু এর জন্য ধর্মীয় ভিসা ব্যবহার করা তাদের অনুচিত হয়েছে," মন্তব্য মহিন্দর পাল সিংয়ের।

ছবির উৎস, ARIF ALI/AFP via Getty Images
পুরো ঘটনাটা কী?
রমেশ সিং আরোরা বলছেন, গত বছর চৌঠা নভেম্বর নাসির নানকানা সাহিবে যান। সেখান থেকে তিনি সরবজিৎ কউরকে নিয়ে তার পৈতৃক ভিটা ফারুকাবাদের শেখুপুরায় পৌঁছন।
সরবজিৎ কউরের আবেদন মেনে নিয়ে গত নভেম্বর মাসে লাহোর হাইকোর্ট পুলিশকে নির্দেশ দেয় যে তাকে যে হয়রানি না করা হয়।
মিজ. কউরের আইনজীবী আহমেদ হাসান পাশার বলছেন যে পাঞ্জাব পুলিশ তার মক্কেলদের সন্ধানে আটই নভেম্বর নাসির হুসেনের বাড়িতে তল্লাশি অভিযান চালায় এবং তাদের ওপরে বিয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য চাপ দেওয়া হয়।
আহমদ হাসান পাশার কথায়, তারা সরবজিৎ কউর ও নাসির হুসেনের দাম্পত্য জীবনে হস্তক্ষেপ না করার জন্য আদালতকে আবেদন করেছিলেন।
লাহোর হাইকোর্টের বিচারপতি ফারুক হায়দার মিজ. কউরকে হয়রানি না করার নির্দেশ দেন পুলিশকে।
তবে শেখুপুরা পুলিশের মুখপাত্র রানা ইউনুস বিবিসি উর্দুকে বলেছেন, "পুলিশ কোনো ভারতীয় নারী বা তার পাকিস্তানি স্বামীকে হয়রানি করেনি। এ নিয়ে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা বাস্তবতা ঘটনার বিপরীত। এর সঙ্গে পুলিশের কোনো সম্পর্ক নেই।"
তিনি আরও বলেন, "বিষয়টি স্পর্শকাতর, অনেকগুলো তদন্ত সংস্থা এটি খতিয়ে দেখছে। যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হবে তা পাকিস্তানের আইন অনুযায়ী হবে।"
সরবজিৎ কউরের আইনজীবী বলেছিলেন যে তিনি ১৫ই নভেম্বর তাদের দুজনকে নিজের চেম্বারে ডেকেছিলেন যাতে তারা কর্তৃপক্ষের সামনে নিজেদের বক্তব্য রেকর্ড করতে পারেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ওই দম্পতি আসেনি এবং তখন থেকেই নাসির হুসেনের মোবাইল ফোনও বন্ধ হয়ে যায়।

ছবির উৎস, NARINDER NANU/AFP via Getty Images
ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে বিয়ে
সরবজিৎ কউর চৌঠা নভেম্বর একদল শিখ তীর্থযাত্রীর সাথে পাকিস্তানে এসেছিলেন। পরের দিন গুরু নানকের জন্মদিন উপলক্ষ্যে তার নানকানা সাহিব যাওয়ার কথা ছিল।
তবে সাতই নভেম্বর শেখুপুরার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দায়ের করা বয়ান অনুযায়ী মিজ. কউর জানিয়েছিলেন যে পাকিস্তানে আসার পরে তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নাসির হুসেন নামে একজন পাকিস্তানি নাগরিককে বিয়ে করেন।
ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যে নথি জমা দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পরে তার নাম রাখা হয়েছে 'নূর'।
আদালতে জমা দেওয়া 'নিকাহনামা' অনুযায়ী নাসির হুসেনের বয়স ৪৩ বছর, আর মিজ. কউরের বয়স ৪৮ বলে লেখা হয়েছে। ওই নথিতেই উল্লেখ রয়েছে যে নাসির হুসেন বিবাহিত এবং দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য তার কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই।
সরবজিৎ কউরের আইনজীবী বলছেন এদের দুজনের বিয়ের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন কাউন্সিলে নিবন্ধিত হয়েছে।
এই ভারতীয় নারীর পক্ষ থেকে আদালতে একটি অভিযোগও দায়ের করা হয় এই মর্মে যে পুলিশ তাদের হুমকি দিয়েছে এবং একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে।
আদালতে তিনি এও জানান যে তিনি স্বেচ্ছায় নাসির হুসেনকে বিয়ে করেছেন।
"আমাকে কেউ অপহরণ করেনি, আমি স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করেছি। আমি আমার বাবা-মায়ের বাড়ি থেকে মাত্র তিনটি জামাকাপড় নিয়ে এসেছি এবং আমার সঙ্গে অন্য কিছুও আনিনি," আদালতে জানিয়েছিলেন মিজ. কউর।
আদালতে জমা দেওয়া ওই বয়ানেই তিনি দাবি করেছেন যে, "বিয়ের করার কারণে পুলিশ আমার ওপরে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে এবং পাঁচই নভেম্বর রাত নয়টায় জোর করে আমাদের বাড়িতে পুলিশ ঢোকে। কর্মকর্তারা বলেন তাদের সঙ্গে যেতে, কিন্তু আমরা রাজি না হওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ হন।"
তিনি বলেন, "আমি চেঁচামেচি শুরু করায় প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসেন।"
সরবজিৎ কউর তাকে এবং তার স্বামীকে পুলিশের হাত থেকে নিরাপদ রাখার আবেদন করেছিলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
দুজনের নয় বছর আগে আলাপ
সরবজিৎ কউর ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের কাপুরথালা জেলার বাসিন্দা। কাপুরথালা পুলিশ জানিয়েছে, এই মামলার তদন্ত চলছে। সরবজিৎ কউর প্রায় দুই হাজার শিখ তীর্থযাত্রীর একটি দলের অংশ ছিলেন।
দলটি ১০ দিনের সফর শেষ করে ১৩ই নভেম্বর ভারতে ফিরে আসে, কিন্তু সরবজিৎ কউর তাদের সঙ্গে ফেরেননি।
বিবিসির পাঞ্জাবি বিভাগ জানাচ্ছে যে গত বছর নভেম্বরে কাপুরথালার সহকারী পুলিশ সুপার ধীরেন্দ্র ভার্মা জানিয়েছিলেন যে খবর পেয়েই তারা তদন্ত শুরু করেছেন। সরবজিৎ কউরের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা বা তার বিয়ের ব্যাপারে পুলিশের কাছে কোনো তথ্যই ছিল না বলে জানিয়েছিলেন মি. ভার্মা।
তিনি বলেছিলেন যে গণমাধ্যমে এই খবর প্রকাশিত হলেও পুলিশের কাছে এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা তথ্য নেই।
বিবিসি পাঞ্জাবি বিভাগের সহযোগী সংবাদদাতা রবীন্দর সিং রবিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শিখ ধর্মাবলম্বীদের শীর্ষ সংগঠন শিরোমণি গুরদোয়ারা প্রবন্ধক কমিটির সচিব প্রতাপ সিং বলেছিলেন যে বিষয়টি খতিয়ে দেখে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে এখন থেকে কোনো নারীকে একলা আর পাকিস্তানে শিখ তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে পাঠানো হবে না।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, সরবজিৎ কউরের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গেছে এবং তার আগের বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে দুটি ছেলে রয়েছে। সংবাদমাধ্যম থেকেই জানা যায় যে সরবজিৎ কউরের স্বামী প্রায় তিন দশক ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন।
ওদিকে নাসির হুসেন একজন জমিদার।
বিবিসিকে একটি ভিডিও দেখিয়েছেন মিজ. কউরের আইনজীবী, যেখানে তাকে বলতে শোনা যায় যে ভারতে তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে এবং তিনি নিজেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নাসির হুসেনকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেখানেই মিজ. কউর দাবি করেছেন যে নাসির হুসেনকে তিনি নয় বছর ধরে চেনেন।
আইনজীবী আহমেদ হাসান পাশা বলেন, সরবজিৎ কউর ও নাসির হুসেনের মধ্যে ইনস্টাগ্রামে কথা হত এবং ছয় মাস আগে দুজনে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।








