ভারতের ছত্তিশগড়ে দুই প্রেমিকাকে একই সঙ্গে বিয়ে করলেন এক যুবক

চন্দু মুরিয়া, সাথে দুই স্ত্রী হাসিনা ও সুন্দরী

ছবির উৎস, Devendra Shukla/BBC

ছবির ক্যাপশান, চন্দু মৌরিয়া, সাথে দুই স্ত্রী হাসিনা ও সুন্দরী
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি, কলকাতা

বিয়ের আগে একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা, আবার তা লুকিয়ে রেখে নারীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন কোন পুরুষ -এমন খবর প্রায়ই শোনা যায়।

কিন্তু দুই নারীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের পর তাদের দুজনকে একই সঙ্গে বিয়ে করেছেন কোন যুবক - এরকম কি শুনেছেন ?

ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যে কদিন আগের এরকমই এক ঘটনা এখন সামনে এসেছে।

মাওবাদী প্রভাবিত বস্তারের চন্দু মৌরিয়া তার দুই প্রেমিকা সুন্দরী কাশ্যপ এবং হাসিনা বাঘেল - দুজনকে একই দিনে, একই মন্ডপে বিয়ে করেছেন সব সামাজিক রীতি মেনে।

দুজনকে একই দিনে, একই মন্ডপে বিয়ে

গত রবিবার বিয়ের পরে চারদিন ধরে চলেছে উৎসব। চন্দু এবং হাসিনার পরিবার বিয়েতে উপস্থিত থাকলেও সুন্দরীর বাড়ি থেকে কেউ আসেন নি।

মুরিয়া জনজাতির যুবক মৌরিয়ার বয়স ২৪। তার থেকে বছর তিনেকের ছোট মি. মৌরিয়ার বড় স্ত্রী সুন্দরী। আর ছোট স্ত্রী হাসিনা চার বছরের ছোট।

কিছুটা জমিজমা আছে মি. মৌরিয়ার, তাতে চাষাবাদ করেন তিনি।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছিলেন, "বছর তিনেক আগে সুন্দরীদের গ্রামে গিয়েছিলাম কাজে। সেখানেই ওর সঙ্গে আলাপ হয়। তারপরে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল মোবাইলের মাধ্যমে।"

চন্দু মুরিয়া

ছবির উৎস, Devendra Shukla/BBC

ছবির ক্যাপশান, চন্দু মৌরিয়া

"সেখান থেকে প্রেম হয় আমাদের মধ্যে। তার বছর খানেকের মধ্যে হাসিনা আমাদের গ্রামে এসেছিল কোনও বিয়ে বাড়িতে।"

তার কথায়, "হাসিনাই আমাকে নম্বর দিয়ে ফোন করতে বলে। আমি ভেবেছিলাম বন্ধুত্ব পাতাতে চাইছে।"

হাসিনার সাথে কথা বলতে চাইলেন সুন্দরী

"কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম শুধু বন্ধুত্বতেই আর ও থেমে থাকছে না। একদিন তো বলেই দিল যে সে আমার প্রেমে পড়েছে।"

চন্দু পড়লেন মহা সমস্যায়। একদিকে সুন্দরীর সাথে পুরনো প্রেম , আর অন্যদিকে তার জীবনে নতুন আগমন ঘটেছে হাসিনার।

একদিন তিনি সুন্দরীকে জানিয়ে দিলেন বিষয়টা।

"প্রথমে চন্দুর কাছ থেকে হাসিনার ব্যাপারে জেনে খারাপ লেগেছিল। কিন্তু তারপরে বললো, আমি নিজেই হাসিনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। মোবাইলে কথা বলে আমার বেশ ভাল লেগেছিল," বলছিলেন চন্দুর বড় স্ত্রী সুন্দরী।

"আমরা দুজনে দুজনকে বোন বলে ডাকতে শুরু করেছিলাম। আমাদের দুজনের দেখাও করিয়ে দিয়েছিল চন্দুই।"

এরই মধ্যে হাসিনা তার গ্রাম ছেড়ে চন্দুর গ্রামে চলে আসেন একসঙ্গে থাকবেন বলে।

চন্দু মুরিয়ার বিয়ের অনুষ্ঠান

ছবির উৎস, Devendra Shukla/BBC

ছবির ক্যাপশান, চন্দু মৌরিয়ার বিয়ের অনুষ্ঠান

মুরিয়া আদিবাসী সমাজে বিয়ের আগেই যুবক-যুবতীর এক সঙ্গে থাকার চল রয়েছে।

এদিকে হাসিনা চন্দুর সঙ্গে থাকতে চলে এসেছে জানতে পেরে সুন্দরীও এসে হাজির হন চন্দুর বাড়িতে।

চন্দুর মা বললেন, দু'জনকেই বিয়ে করো

সেটা অবশ্য সুন্দরীর পরিবার মানতে পারে নি। তাই তারা সুন্দরীকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

"একদিন সুন্দরী বাড়ি থেকে পালিয়ে আমাদের বাড়িতে চলে আসে। সেই থেকে আমরা তিনজনেই একসঙ্গে থাকছিলাম আমাদের বাড়িতে। বাবা-মা আর পরিবারের অন্যান্যরাও আছেন।"

"আমার মা-ই একদিন বলেন যে বিয়ে করে নিতে। সমাজ থেকেও বলা হয়। কিন্তু আমি কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম," জানালেন চন্দু মৌরিয়া।

সুন্দরী এবং হাসিনা অবশ্য এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিলেন স্বামীকে ভাগাভাগি করে নিতে। কিন্তু দ্বিধা ছিল চন্দুর।

তিনি বলছিলেন, "দুজনকে বিয়ে করলে বন্ধুরা হাসাহাসি করবে! একসঙ্গে যখন গ্রামে বের হবো, তখন লোকে কী বলবে, এসব ভাবনা কাজ করছিল আমার মাথায়। কিন্তু ওরা দুজন রাজী হয়ে যাওয়ায় আমিও আর না করি নি।"

'কোনও সমস্যা হয় না আমাদের মধ্যে'

তাদের বিয়ের যে কার্ড ছাপা হয়েছে, তা বিবিসির হাতে এসেছে।

সেখানে মাঝখানে পাত্রের নাম চন্দু মৌর্য। আর দুদিকে দুই পাত্রীর নাম ছাপা হয়েছে। সব সামাজিক রীতি নীতি মেনেই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।

দুই নারীর সাথে চন্দু মুরিয়ার বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র

ছবির উৎস, Devendra Shukla/BBC

ছবির ক্যাপশান, দুই নারীর সাথে চন্দু মৌরিয়ার বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র

ছোট স্ত্রী হাসিনার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয় নি। তাই তার কথা জানা যায় নি।

কিন্তু বড় স্ত্রী সুন্দরী বলছিলেন, "আমরা তিনজন তো বছরখানেক হয়ে গেল একসঙ্গেই আছি। কোনও সমস্যা হয় না আমাদের মধ্যে। সব কাজ মিলে মিশেই করি। আর হাসিনা তো আমার বোনের মতো। ওকে আমি ডাকিও বোন বলেই।"

আদিবাসী সমাজ এবং তিনটি পরিবার এই বিয়ে মেনে নিলেও আইন কী মানবে এই বহুবিবাহ?

আদিবাসী সমাজের এক নেতা প্রকাশ ঠাকুর বলছেন, "এরা তিনজনেই সাবালক এবং মুরিয়া সমাজের মানুষ। ওই সমাজে বহুবিবাহে কোনও বাধা নেই।"

আইনজীবীরা বলছেন হিন্দু বিবাহ আইন এক্ষেত্রে কার্যকর হবে না কারণ তপশীলি জাতির নাগরিকদের ওপরে হিন্দু আইন বলবৎ করা যায় না।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন: