ঢাকার মিরপুরে গার্মেন্টসে আগুনে ১৬ জন নিহত, শ্রমিকদের অনেকে নিখোঁজ

    • Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

ঢাকার মিরপুর এলাকার একটি পোশাক কারখানায় আগুন লেগে কমপক্ষে ১৬ জন নিহত হয়েছে। কারখানাটির শ্রমিকদের অনেকেরই খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা।

ফলে মঙ্গলবারের এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া নিহত ১৬ জনের সবার মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

নিহতদের সবার নাম পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। আগুনে বেশ কয়েকজনের শরীর এমনভাবে পুড়ে গেছে যে, তাদের চেনার উপায় নেই বলেও জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের কর্মকর্তারা।

এদিকে, শ্রমিকদের মধ্যে এখনও যাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি, তাদের সন্ধানে পোড়া কারখানাটির সামনে ভিড় করছেন পরিবারের সদস্যরা।

তাদের মধ্যে অনেকেই হাতে নিখোঁজ স্বজনের ছবি ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কেউ কেউ আহাজারি কান্না-কাটিও করছেন।

কারখানার ভেতরে আর কোনো হতাহত আছে কি-না, সেটি জানার জন্য তল্লাশি চালমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।

এদিকে, পোশাক কারখানার পাশেই একটি রাসায়নিক গুদামেও আগুনের ঘটনা ঘটেছে। সেখানকার আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করছেন ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা।

মঙ্গলবার রাত নয়টা পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা গেছে, রাসায়নিকের গুদামের আগুন পুরোপুরি নেভেনি।

পোশাক কারখানাটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা থেকে বেশি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা।

তারা বলছেন, আগুন লাগার পর পাশের রাসায়নিকের গুদামে একটি বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর গুদামে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিকের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে পোশাক কারখানাটির উপরের তলায় থাকা শ্রমিকরা অজ্ঞান হয়ে পড়েন বলে ধারণা করছেন উদ্ধারকর্মীরা।

এ ঘটনার কারণে প্রাণহানী বেশি হয়েছে বলে ধারণা করছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।

এছাড়া পোশাক কারখানা ভবনের ছাদের দরজা তালাবদ্ধ ছিল। এ কারণে শ্রমিকেরা কেউ ভবনের ছাদে উঠতে পারেননি। হতাহতের সংখ্যা বেশি হওয়ার এটিও একটি বড় কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন কর্মকর্তারা।

আগুনের সূত্রপাত কীভাবে?

মিরপুর এলাকার রূপনগর থানার শিয়ালবাড়িতে চারতলা ভবনে থাকা পোশাক কারখানাটির নাম 'আনোয়ার ফ্যাশন'। সেটার পাশেই টিনের চাল দেওয়া রাসায়নিক গুদামে।

অগ্নিকাণ্ডে জ্বলে যাওয়া ভবন দু'টির কোনটিতে আগে আগুন লেগেছে এবং কীভাবে ঘটনাটি ঘটলো, সেটি নিশ্চিত হতে পারেননি ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা।

ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি অফিসার খালেদা ইয়াসমিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, মঙ্গলবার সকাল ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে তারা মিরপুরের ওই কারখানায় আগুন লাগার খবর পান।

এরপর বেলা ১১টা ৫৬ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। পর্যায়ক্রমে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট সেখানে নিয়ে আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেয়।

"যারা শুরুতে আগুন নেভাতে এসেছেন, তাঁরা রাসায়নিকের গুদাম ও পোশাক কারখানার দুই দিকেই আগুন দেখেছেন," সাংবাদিকদের বলেন ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে কেউ কেউ সাংবাদিকদের জানান, চারতলার পোশাক কারখানাটির নিচতলায় ছিল 'ওয়াশ ইউনিট'। সেখানেই প্রথমে আগুন দেখতে পেয়েছেন তারা।

এরপর সেখান থেকে পাশের টিনের ছাউনির রাসায়ানিক গুদামে আগুন ছড়িয়ে পড়লে একটি বিস্ফোরণ ঘটে।

এতে আগুনটি আরও তীব্র আকার ধারণ করে পোশাক কারখানার পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। এ অবস্থার মধ্যে শুরুর দিকে সেখানে কর্মরত কিছু শ্রমিক বের হতে পারলেও বেশির ভাগই ভেতরে আটকা পড়েন বলে জানা যাচ্ছে।

তবে কারখানাটিতে তখন ঠিক কতজন কাজ করছিলেন, সেটি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা।

বিকেল চারটা নাগাদ কারখানা থেকে নয় জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে সন্ধ্যা সাতটার দিকে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬ জন হয়েছে বলে নিশ্চিত করে ফায়ার সার্ভিস।

সন্ধ্যায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, পোশাক কারখানাটিতে তল্লাশি অভিযান চলমান রেখেছেন তারা।

কিন্তু পাশের রাসায়নিক গুদামে তখনও আগুন নেভানোর কাজ শুরু করতে পারেননি তারা।

"পাশে যে কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে, সেখানে এখনো আগুন জ্বলছে। এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ওখানে কাউকে যেতে দিচ্ছি না। আমরা সর্বোচ্চ প্রযুক্তি দিয়ে, ড্রোন দিয়ে এসব কার্যক্রম করছি," বিকেলে সাংবাদিকদের বলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মি. চৌধুরী।

পরে সন্ধ্যায় স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও একই কথা বলেন।

"কেমিকেল গোডাউনের ভেতরে কেউ প্রবেশ করতে পারছে না। তাই এখনো সেখানে হতাহতের বিষয়ে জানা যায়নি," বিবিসি বাংলাকে বলেন রূপনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোরশেদ আলম।

আগুনের ঘটনার পর থেকে রাসায়নিকের গুদামের মালিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাউকে পাওয়া যায়নি বলে ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের জানান ফায়ার ব্রিগেডের পরিচালক মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী।

রাসায়নিকের গুদামটির অনুমোদন ছিল কি-না, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।