বাংলাদেশে পাঠ্যবইয়ে বিবর্তনবাদ নিয়ে বিতর্ক থামছে না কেন?

৬ষ্ঠ শ্রেণীর পাঠ্যবইযের এই অধ্যায়টি নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে।

ছবির উৎস, NCTB

ছবির ক্যাপশান, ৬ষ্ঠ শ্রেণীর পাঠ্যবইয়েের এই অধ্যায়টি নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে।
    • Author, মুন্নী আক্তার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবইয়ে বিবর্তন বিষয়ে ডারউইনের মতবাদের অন্তর্ভূক্তি নিয়ে বিতর্ক থামছেই না।

এরই মধ্যে সরকার বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেয়ার পরও ইসলামি দলগুলো প্রতিবাদ বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছে।

তারা বলছেন, ধর্মকে অপমানিত করার একটি 'ভূত' শিক্ষামন্ত্রণালয়ের ঘাড়ে চেপে বসে আছে যা সরানো দরকার।

সরকার বলছে, পাঠ্যবইয়ে বিবর্তন মতবাদ নিয়ে এখন অপ্রচার চালাচ্ছে একটি গোষ্ঠী। কারণ যারা আপত্তি তুলেছে তাদের বেশিরভাগই বলতে পারছে না যে বিতর্কিত তথ্যটি আসলে কী।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাঠ্যপুস্তকে বিবর্তনবাদের তত্ত্ব সংযোজনের বিষয়টি এখন আর শিক্ষার সাথে জড়িত নয় বরং সেটি এখন একটি রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

অনেক শিক্ষাবিদ আবার এই বিষয়টি নিয়েই কথা বলতে চান না এই যুক্তিতে যে, এগুলো নিয়ে বেশি কথা হলে আসলে তা এক ধরণের প্রশ্রয়ই জোগাবে।

মঙ্গলবার পাঠ্যবই নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে অপ্রচার বন্ধে বিবৃতি দিয়েছে ৬৬টি নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম ‘সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি।’

আবারো বিতর্ক কেন?

পাঠ্যবইয়ে বিবর্তনের মতবাদের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংসদেও আলোচনা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীও বার বার "বানর থেকে মানুষ" হওয়ার বিষয়টি ঠিক নয় উল্লেখ করেছেন এবং এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ব্যবস্থা হিসেবে বিশেষজ্ঞ কমিটি করার ঘোষণাও দিয়েছেন। তবে তারপরও এ নিয়ে বিতর্ক থামছে না।

বিবর্তনবাদের তথ্য ‘বিকৃত’ করে প্রকাশ করার প্রতিবাদে এবং তা সংশোধনের দাবিতে ঢাকার বায়তুল মোকাররমে শুক্রবার বিক্ষোভ কমর্সূচী ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নামে একটি ইসলামি সংগঠন।

বায়তুল মোকাররমে শুক্রবার বিক্ষোভ কমর্সূচী ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নামে একটি ইসলামি সংগঠন। (ফাইল ফটো)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বায়তুল মোকাররমে শুক্রবার বিক্ষোভ কমর্সূচী ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নামে একটি ইসলামি সংগঠন। (ফাইল ফটো)
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া উপ কমিটির সহকারী সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম কবির বলেন, ডারউইনের তত্ত্ব নিয়ে বরাবরই প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন তারা। তবে এবার যেহেতু পাঠ্যবইয়ে ছাপানোর মতো বড় পদক্ষেপ এসেছে তাই এই বিষয়টি নিয়ে তারা আগের তুলনায় আরো বেশি সক্রিয়।

তারা বলছেন, এ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বারবার এই বিষয়টি উত্থাপন করা হলেও তারা কার্যত কোন সমাধান পাননি। যার কারণে তারা তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছেন।

এ বিষয়ে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতি বা ধর্মকে ব্যবহার করে অনেকেই অপরাজনীতি করছেন যা ‘ঘৃণ্য’।

পাঠ্যবই নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। যে অভিযোগগুলো এসেছে সেগুলোর ভিত্তি ও যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করে বিশেষজ্ঞ কমিটি যে সুপারিশ দিবে সে অনুযায়ী পরিমার্জন বা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

কোনো বয়সের শিক্ষার্থীদের জন্য যদি কোনো মতবাদ উপযুক্ত নাহলে সে বিষয়ে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে "চিলে কান নিয়ে গেলো" এ ধরণের আলোচনায় অংশ নিয়ে আন্দোলন করার আগে সংশ্লিষ্ট বই পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

ধর্মশিক্ষার বাইরের বইগুলোতে ধর্মশিক্ষার দাবি এসেছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অন্য ধর্মের শিক্ষার্থীরাও এ বই পড়েন এবং সে কারণে এর কোন সুযোগ নেই।

“যদি কেউ মনে করে সব বিষয়েই ধর্ম থাকতে হবে তাহলে তো এটা পড়ানোটা কঠিন হয়ে যাবে।”

এদিকে শিক্ষাবিদরা বলছেন, পাঠ্যবই নিয়ে যে বিতর্কটি তৈরি হয়েছে সেটি আসলে শিক্ষার গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। আর এর সমাধানও হতে হবে রাজনৈতিকভাবেই।

এক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকার ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারের একটি স্পষ্ট অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে।

শিক্ষাবিদ ড. মনজুর আহমেদ বলেন, সরকারের জনসমর্থন শক্ত না থাকলে এই সমস্যার সমাধানে রাজনৈতিকভাবে আপোষ করে পাঠ্যবই থেকে বিবর্তন মতবাদ বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে সে সিদ্ধান্ত শিক্ষাব্যবস্থা, রাষ্ট্র বা সমাজ- কারো জন্যই ভাল কিছু হবে না।

শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যপুস্তক তুলে দেয়ার পর থেকেই এতে থাকা বিবর্তনবাদের নানা তথ্য নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

ছবির উৎস, NCTB

ছবির ক্যাপশান, শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যপুস্তক তুলে দেয়ার পর থেকেই এতে থাকা বিবর্তনবাদের নানা তথ্য নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

যা নিয়ে বিতর্ক

চলতি বছর পহেলা জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যপুস্তক তুলে দেয়ার পর থেকেই এতে থাকা বিবর্তনবাদের নানা তথ্য নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

মাধ্যমিক পর্যায়ে ষষ্ঠ শ্রেণীর ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের একটি অধ্যায় নিয়ে এই বিতর্ক শুরু হয়।

যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর কথোপকথনের মধ্যে শিক্ষার্থী জানতে চান যে মানুষ বানর থেকে সৃষ্টি হয়েছে কিনা। উত্তরে শিক্ষক বলেন, এই তথ্যটি ভুল। মানুষ বানর থেকে সৃষ্টি হয়নি। তবে ওই বইটিতে কিছু চিত্র এঁকে বিবর্তনের বিষয়টি বোঝানো হয়েছে যাতে দেখা যায় অস্ট্রালোপিথেকাস থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে হোমো স্যাপিয়েন্স বা মানুষের বর্তমান রূপ এসেছে।

অস্ট্রালোপিথেকাসকে মানুষের পূবপ্রজন্ম বলে উল্লেখ করা হয়েছে বইটিতে। এই বিষয়টি নিয়েই আপত্তি তুলেছে ইসলামি দলগুলো।

ডারউইনের বিবর্তনবাদ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীব প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল আজীম আখন্দ বলেছেন, বাংলাদেশে বিবর্তনবাদ নিয়ে যে বিতর্কটি চলছে সেটি আসলে বিবর্তনবাদে কী বলা হয়েছে সেটি না বুঝেই করা হচ্ছে।

প্রাণীবিদ্যার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডারউইনের বিবর্তনবাদ একটি মতবাদ। এটি কোন তত্ত্ব নয়। বিজ্ঞানে কোন কিছুকে তত্ত্ব তখনই বলা যায় যখন সেটি প্রমাণিত হয় এবং তার পরীক্ষিত প্রমাণ থাকে।

বিবর্তন মতবাদে বলা হয়েছে যে, সময়ের সাথে বির্বতনের সাথে সাথে প্রাণীকুল বা জীবিত যেকোন জিনিস প্রতিকূল পরিবেশ, নিজ প্রজাতি এবং আন্তঃপ্রজাতির মধ্যে টিকে থাকার জন্য খাপ খাইয়ে নেয়।

নতুন প্রজাতি সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিবর্তনের ক্রমধারায় এক সময় কোন একটা বিশেষ কারণে এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতির সৃষ্টি হতে পারে বলে একটা মতবাদ আছে।

এটাকে পুঁজি করেই বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে অনেকে বলে থাকেন যে, বানর থেকে মানুষের সৃষ্টি। তবে ডারউইনের বই “অন দ্য অরিজিন অব স্পিসিস” সেখানে কোথাও এরকম কিছু লেখা নেই বলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।

বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই মতবাদ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

শিক্ষাবিদ ড. মনজুর আহমেদ বলেন, বিশ্বের আরো অনেক দেশে অনেক ধর্মের মধ্যেই হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। তার মতে, বিজ্ঞানের বিষয়গুলো অনেক সময় ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যেতে পারে। তবে এটা মনে রাখতে হবে যে, পাঠ্যবইয়ে কোন পক্ষ নিয়ে এ ধরণের আলোচনা দেয়া হয় না, বরং একটি তথ্য হিসেবেই সেটি তুলে ধরা হয়।