রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুনের ঘটনায় 'পরিকল্পিত নাশকতার' প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুন দুই হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ও দোকানপাট পুড়ে গেছে

ছবির উৎস, TAHJIBUL ANAM

ছবির ক্যাপশান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুন লেগে দুই হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ও দোকানপাট পুড়ে গেছে

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুনের ঘটনা ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নাশকতা’ বলে প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

গত ৫ই মার্চ কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুন লেগে দুই হাজারের বেশি ঘরবাড়ি পুড়ে যায়। তবে সেখানে হতাহতের কোন ঘটনা ঘটেনি।

এরপর ওই আগুনের ঘটনা তদন্তে যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, রবিবার তারা প্রতিবেদন দিয়েছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের একটি সংবাদ সম্মেলনে কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আবু সুফিয়ান তাদের তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য তুলে ধরেন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১১ নম্বর ক্যাম্পের ১৭ নম্বর ব্লক থেকে আগুনের সূত্রপাত হলেও কারা আগুন লাগিয়েছে, তা জানাতে পারেনি কমিটি।

তবে আগুনের ঘটনায় মামলা করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

মোঃ আবু সুফিয়ান সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘’আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আগুন লাগিয়েছে। রোহিঙ্গারা বলেছে, এটা পরিকল্পিত নাশকতা, এজন্য দায়ী ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির নাম বলেছে তারা, কিন্তু এদের শনাক্ত করা কঠিন। তাই এই ঘটনায় মামলা করে তাদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমরা সুপারিশ করেছি।’’

‘’রোহিঙ্গারা আগুন নেভাতে গেলে তাদের নিষেধও করা হয়েছিল, যদিও সেটা কৌশলে করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বলা হয়েছে, আগুন নেভানোর চেয়ে জীবন বাঁচানো জরুরি।‘’

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, দুপুর ২.৩০ মিনিটে আগুনের সূত্রপাত হয়, যা নিয়ন্ত্রণে আনতে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় লাগে। এতে ২,২০০ শেল্টার হোম পুড়েছে এবং ১৫ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু নিহতের কোন খবর পাওয়া যায়নি।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে মামলা দায়ের করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোসহ ১০ দফা সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।

এই তদন্ত কমিটি মোট ৭৫ জনের সাক্ষ্য নিয়েছে, যাদের মধ্যে রোহিঙ্গারা ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি এনজিও, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা রয়েছে।

গত বছরের জানুয়ারি মাসে উখিয়ার একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুন লেগে ৬০০ ঘরবাড়ি পুড়ে গিয়েছিল।

এর দুই মাস পরে মার্চ মাসে এই বালুখালী ক্যাম্পেই আরেকটি অগ্নিকাণ্ডে ১০ হাজারের মতো ঘরবাড়ি পুড়ে যায়। তখন ১৫ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছিল।

এই বছরের ১৫ই ফেব্রুয়ারি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় মোট ২২২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৬৩টি আগুন নাশকতামূলক বা ইচ্ছে করে লাগানো হয়েছে। ৯৯টি অগ্নিকাণ্ড দুর্ঘটনাজনিত কারণে হয়েছে আর ৬৩টির কারণ জানা যায়নি।

সংসদীয় কমিটির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় বর্তমানে ১০টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে হত্যাকাণ্ড ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একজন বাসিন্দা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্বে এর আগেও বেশ কয়েকবার ক্যাম্পে আগুন দেয়া হয়েছে। এক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় আরেক গ্রুপ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।

আগুন নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

পাঁচই মার্চ রবিবার বেলা পৌনে তিনটার দিকে আগুন লাগে।

ছবির উৎস, ABDUR RAHMAN

ছবির ক্যাপশান, পাঁচই মার্চ রবিবার বেলা পৌনে তিনটার দিকে আগুন লাগে।

উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন রোহিঙ্গা বিবিসি বাংলা বলেছেন, এই এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কয়েকটি গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ রয়েছে।

তিনি বলেন, সেখানে ‘আরাকান স্যালভেশন আর্মি- আরসা’, ‘আরাকান সলিডারিটি অর্গানাইজেশন- আরএসও, ‘আল-ইয়াকিনসহ রোহিঙ্গাদের বিশটির বেশি গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। তাদের মধ্যে এর আগে সংঘর্ষ হয়েছে। গত এক মাসের মধ্যে তাদের মধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন হতাহতও হয়েছে।

এই রোহিঙ্গা বাসিন্দা বলছেন যে তিনি অন্য রোহিঙ্গাদের কাছে শুনেছেন, আগুন লাগানোর আগে বন্দুকধারী কিছু ব্যক্তি এসে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে বলেন। সেই সময় ফাঁকা গুলিও করা হয়। এরপর বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় এই আগুন নিয়ে আরও কিছু গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গা নেতা একজন মাঝি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, আগুনে ঘরবাড়ি পুড়ে গেলে বিদেশি সাহায্য আসবে, আন্তর্জাতিক মনোযোগ পাওয়া যাবে, এমন চিন্তা থেকেও আগুন লাগানো হয়ে থাকতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

সেই সময় মোবাইলে ধারণ করা একটি ভিডিও দেখতে পেয়েছে বিবিসি বাংলা।

দূর থেকে ধারণ করা ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, কয়েকজন ব্যক্তি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি ঘরে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, এই ব্যক্তিরাও রোহিঙ্গা, যদিও তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তবে বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে ভিডিওটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযানে সাড়ে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযানে সাড়ে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা অতীশ চাকমা বলছেন, ‘’রোহিঙ্গারা কাঠ, বাঁশ, প্লাস্টিক, কাগজ দিয়ে ঘরবাড়িগুলো তৈরি করে। এর সবগুলোই সহজ দাহ্য পদার্থ। আগুন নিয়ে তাদের সচেতনতারও অভাব রয়েছে। ফলে একবার কোন বাড়িতে আগুন লাগলে তা দ্রুত আশেপাশের বাড়িঘর এবং পুরো ক্যাম্পেই ছড়িয়ে পড়ে।

‘’আবার ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের যাতায়াতে সমস্যা থাকায় এবং পানির ভালো ব্যবস্থা না থাকায় আগুন লাগলে সেটা সহজে নেভানোও যায় না। প্রতিটা বাড়িতেই গ্যাসের সিলিন্ডার আছে, সেগুলোও দ্রুত আগুন ছড়িয়ে দেয়।‘’

পুরো রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই আগুন লাগলে তা নেভানোর বা প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা নেই বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।