কাঁচাবাজারের জন্য ছাড়তে হচ্ছিল শত বছরের আবাস, আদালতের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা

ছবির উৎস, SAUMITRA SHUVRA/BBC BANGLA
- Author, সৌমিত্র শুভ্র
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
ঢাকার মিরন জল্লা হরিজন পল্লির বাসিন্দাদের উচ্ছেদের ওপর এক মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছে উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ।
পুনর্বাসন নিশ্চিত না করে উচ্ছেদ কার্যক্রম কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না জানতে চেয়ে একটি রুলও জারি করা হয়েছে।
তবে পুনর্বাসন নিয়ে পরস্পর বিপরীত কথা বলছেন জনপ্রতিনিধি ও হরিজনরা।

ছবির উৎস, SAUMITRA SHUVRA/BBC BANGLA
সরেজমিন মিরণ জল্লা গিয়ে দেখা মিললো রাণু রানীর। তিনি যে ঘরটিতে থাকতেন সেটি দৈর্ঘ্যে প্রায় আট ফুট আর প্রস্থে চার ফুট। ঘরের আশপাশ যেন একটি ধ্বংসস্তূপ। তার মাঝে দাঁড়িয়েই বিবিসি বাংলার সাথে কথা বলছিলেন তিনি।
"ঘর দুয়ার সব ধ্বংস হয়ে গেল। এইটুকুন জায়গায় চার-পাঁচ জন আমরা থাকি। আমাদের জন্য কি কোনো মায়া দয়া লাগছে না? এইটুকু জায়গাটাও তোমরা লিয়ে লিচ্ছো..."
দুপুর বেলার সূর্যতাপের তীব্রতা বাড়তে শুরু করেছে ততক্ষণে। হরিজন সম্প্রদায়ের বাসস্থান হিসেবে পরিচিত ঢাকার বংশালের মিরন জল্লা সিটি কলোনির বাসিন্দারা এখানে সেখানে জটলা করে আছেন। সব জটলায় আলোচনার বিষয়বস্তু একই।
গত রোববার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বুলডোজার দিয়ে কয়েকটি ঘর ভেঙে দিয়েছে। লাল দাগ দিয়ে সীমানা চিহ্ন দিয়ে গেছে।
সীমানার মধ্যে থাকা সব ঘরই ভেঙে ফেলা হবে। রাণু রানীর ঘরটাও পড়েছে লাল দাগের মধ্যে।
উচ্ছেদের পর খালি হওয়া জায়গায় ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাঁচাবাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে সিটি করপোরেশনের তরফে জানানো হয়েছে।
করপোরেশন বলছে, ২৫ থেকে ৩০টি ঘর ভাঙা হবে। তাতে ২৩টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের পুনর্বাসন করা হবে।
কিন্তু, কলোনির বাসিন্দাদের দাবি ৮০ থেকে ৯০টি ঘর ভাঙা পড়বে। এর ফলে পূর্বপুরুষদের 'আড়াইশো' বছরের আবাস থেকে উচ্ছেদ হবে দেড়শোটি পরিবার।
তাই, আদালতের আদেশে এক মাসের জন্য রেহাই মিললেও উদ্বেগ কাটছে না তাদের।

ছবির উৎস, SAUMITRA SHUVRA/BBC BANGLA
কেবল স্থায়ী কর্মীদেরই পুনর্বাসন
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
মিরন জল্লা কলোনির হরিজনরা পেশায় মূলত পরিচ্ছন্নতা কর্মী। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শহরের পরিচ্ছন্নতায় রক্ষায় কাজ করে চলেছেন তারা।
এদের একটা অংশ সিটি করপোরেশনে নিযুক্ত। যাদের মধ্যে স্থায়ী এবং অস্থায়ী দুই ধরনের কর্মীই রয়েছে।
এর বাইরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা বাসাবাড়িতেও পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজ করেন অনেকে।
জমি বা ঘরের 'আইনগত' মালিকানা না থাকলেও বংশানুক্রমে সবাই-ই থাকছেন কলোনিতে।
কিন্তু, এবার যারা ঘর হারাচ্ছেন পুনর্বাসনের তালিকায় তাদের সবার নাম উঠছে না।
কলোনিতে দুটি ভবন নির্মাণ করেছে ডিএসসিসি।
ওয়ার্ড কাউন্সিলর আউয়াল হোসেন বিবিসি বাংলাকে জানালেন, যারা করপোরেশনের স্থায়ী কর্মচারী, তারাই শুধু ফ্ল্যাটে থাকার সুযোগ পাবেন।
নাম অপ্রকাশিত রাখার অনুরোধ করে বিমান বাংলাদেশে পরিচ্ছনতা কর্মী হিসেবে কর্মরত এক হরিজন বলেন, "আপাতত পাঁচটা ঘর বুলডোজার দিয়ে ভেঙে থুয়ে গেছে। ছেলেপেলে, মহিলারা বুলডোজার দেখলে ভয় পায়।"
"দু'দিন সময় দিয়েছে নব্বইটা ঘর ভাঙবেই। তবে আমাদের কোনো পুনর্বাসন করে দেয় নাই," যোগ করেন তিনি।
আরেক হরিজন যুবক বলেন, "চাকরি নাই বলে আমি অবৈধ হয়ে গেলাম?"
তার প্রশ্নের উত্তর মেলে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কাইজার মোহাম্মদ ফারাবীর কথায়।
"সিটি করপোরেশনের জায়গা, করপোরেশনের কর্মী যারা আছেন তারাই তো অগ্রাধিকার পাবেন এখানে," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. ফারাবী।

ছবির উৎস, SAUMITRA SHUVRA/BBC BANGLA
বিরূপ প্রচারণার অভিযোগ
রোববার তাৎক্ষণিকভাবে ঘরের মালামাল সরিয়ে নেন হরিজনরা। কলোনির একটি ভবনের নিচ তলার একটি কক্ষে সেগুলো রাখা হয়েছে।
নিজেরা আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীর বাড়িতে।
"মাকে রাখছি বড় ভাইয়ের বাসায়। আমি আছি সম্বন্ধী বাসায়," বলছিলেন রাজেশ দাস।
এক নারী জানালেন, যে বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন সন্তানকে সেখানে রেখে এসেছেন।
স্থানীয়ভাবে কিছু প্রতিকূলতার মুখে পড়ার অভিযোগও করলেন তারা।
"আমাদের কেউ বাসা ভাড়াও দিতে চাচ্ছে না। কাউন্সিলরের লোকেরা মানা করে দিছে। বলছে যে এদের ভাড়া দিবা না। দিলে টিপ, চুড়ি এগুলো পরতে দিবা না," বলেন ওই নারী।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কাউন্সিলর আউয়াল হোসেন।
পুরান ঢাকায় হুট করে বাসা ভাড়া পাওয়া যায় না জানিয়ে তিনি বলেন, "বাড়িওয়ালা তার বাসা ভাড়া কাকে দিবেন না দিবেন সেটা তার সিদ্ধান্ত, সেখানে আমি বলার কে?"
সিটি কলোনির বাসিন্দারা সন্ত্রাস ও মাদকের সাথে যুক্ত, স্থানীয়ভাবে এমন প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ হরিজনদের।
"যদি আমরা সন্ত্রাস, মাদকব্যবসা করতাম, তাহলে আমাদের শিক্ষার হার বাড়তো না। আমাদের ছেলেপেলে কলেজে যেতে পারতো না," বলছিলেন দীপা রানী।
কিন্তু, এখন শিশু-কিশোরদেরও স্কুল-কলেজে গিয়ে এই 'অপবাদ' শুনতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
"এমন দুর্নাম করতে থাকলে আমাদের সন্তানরা কীভাবে পড়বে? তাহলে হরিজনের ছেলেদের ভবিষ্যৎ কোথায়?"
এই প্রচারণা স্থানীয়ভাবে আছে বলে স্বীকার করছেন কাউন্সিলর আউয়াল। তবে দাবি করেন, এর সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা বা ইন্ধন নেই।
"ওরা যেই কাজটা করে সেটা মাদক না নিলে করা কঠিন। যেই কারণে সবাই এমন ধারণা পোষণ করে," বলেন তিনি।

ছবির উৎস, SAUMITRA SHUVRA/BBC BANGLA
নাগরিক সুবিধা বনাম 'উদ্বাস্তু' হওয়ার শঙ্কা
মিরন জল্লায় কলোনি লাগোয়া একটা কাঁচাবাজার আগে থেকেই ছিল। এখন সেটিকে আরো বড় পরিসরে নির্মাণের উদ্যােগ নেয়া হয়েছে।
কারণ, "করপোরেশন প্রতিটি ওয়ার্ডে কিছু নাগরিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে চাচ্ছে," বলেন প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা।
তার দাবি, বাজার সম্প্রসারণে যাদের ঘর ভাঙা পড়ছে তাদেরকে রিপ্লেস করে দেয়া হচ্ছে।
বিভিন্ন তথ্য ভুলভাবে ছড়াচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এখানে দুই থেকে আড়াইশো ঘরবাড়ি আছে। বাজারের প্রয়োজনে পঁচিশ থেকে তিরিশটা ঘর ভাঙা পড়ছে।"
পুনর্বাসনে কেবল সিটি করপোরেশনের কর্মীরা অগ্রাধিকার পেলে বাকিরা উদ্বাস্তু হয়ে যাবেন কি না এমন প্রশ্নে আর কথা বাড়াতে চাননি মি. ফারাবী।
হরিজন ও দলিতদের অধিকার নিয়ে লেখালেখি করেন লেখক ও গবেষক গওহার নঈম ওয়ারা।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের আদেশ আছে কাউকে উচ্ছেদ করার আগে পুনর্বাসন করতে হবে।
"তাছাড়া, বহু বছর আগে যখন ভারতের বিভিন্ন অংশ থেকে এই মানুষগুলোকে নিয়ে আসা হয়েছিল তখন তাদের এই নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল যে তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে। তাই এভাবে উচ্ছেদ করে তাদের উদ্বাস্তুতে পরিণত করা আইনের লঙ্ঘন," বলেন তিনি।

ছবির উৎস, SAUMITRA SHUVRA/BBC BANGLA
মিরন জল্লার হরিজন পল্লি সংক্রান্ত 'কিংবদন্তী'
মিরন জল্লা হরিজন সেবক সমিতির সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা মূলত হিন্দিভাষী। যেটিকে তারা বলেন "কানপুরী হিন্দি"।
মুঘল আমলে কানপুর থেকে তাদের নিয়ে আসা হয়। উদ্দেশ্য, পরিচ্ছন্নতা বিধান ও পয়ঃনিষ্কাশন।
ঢাকার বংশালের ওই স্থানটিতে হরিজন পল্লি গড়ে ওঠা নিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে একটি লোককথা প্রচলিত আছে।
"মুঘল আমলে মিরন বাই নামে একজন বাইজী (সঙ্গীত ও নৃত্যশিল্পী) লখনৌ থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। তার জন্মস্থান কানপুরে হওয়ায় সেই জায়গা থেকে আসা এই জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের প্রতি তার মমত্ববোধ ছিল।" বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন জয়ন্ত কুমার।
জয়ন্ত হরিজন সম্প্রদায়ের সেইসব সদস্যদের একজন যারা আর্থ সামাজিক বাধা পার করে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন।
দেশে স্নাতক শেষে পরবর্তীতে ভারতের বিশ্বভারতী থেকে স্নাতকোত্তর করেন জয়ন্ত।
জয়ন্ত বলছিলেন, "মিরন বাই ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার সময়, দলিতরা তার কাছে গিয়ে নিজেদের আবাসনসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা বলেন।"
"মিরন বাই তখন বর্তমান জায়গাটি তাদের বসবাসের জন্য দান করে যান।"
প্রজন্মান্তরে তারা এই আখ্যানটিই শুনে এসেছেন বলে জানান জয়ন্ত কুমার।
তবে, সুইপারদেরকে কবে নিয়ে আসা হয়েছে বা কীভাবে তারা মিরন জল্লায় থিতু হয়েছে এ ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ মেলেনি বলে জানিয়েছেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন।
"যে যেরকম পারে নানা রকম কথা বলে। খোঁজখবর নিয়েছিলাম, এইরকম কোনো তথ্য আমরা পাইনি," বিবিসি বাংলাকে বলেন অধ্যাপক মামুন।
"যখন চা বাগানের জন্য শ্রমিকদের নিয়ে আসা হয়েছিল। তখনই এদের আনা হয়েছিল," বলেন তিনি।

ছবির উৎস, SAUMITRA SHUVRA/BBC BANGLA
মুনতাসীর মামুনের "ঢাকা: স্মৃতি-বিস্মৃতির নগরী" বইটিতে "মীরণ জলা" সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে লেখা আছে।
"বংশালে মীরণ জলা নামটি এখনও প্রচলিত। অনেকের ধারণা মীরজাফরের পুত্র মীরণের নামে এই জলা। হয়ত এখানে তিনি কোনো জলাশয় খুঁড়িয়েছিলেন। এই ধারণাটিই বেশি প্রচলিত।"
আসামে ভাষা আন্দোলন ও বাঙ্গালি প্রসঙ্গ ১৯৪৭-১৯৬১' বইয়ে ইতিহাসবিদ সুকুমার বিশ্বাস লিখেছেন, ''উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আসামে শ্বেতাঙ্গ চা-করেরা যখন চা-বাগান প্রতিষ্ঠা আরম্ভ করেন, তখন স্থানীয়ভাবে শ্রমিক না পাওয়ায় তারা আসাম সরকারের মাধ্যমে চা-শিল্পে কাজ করার জন্য ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার শ্রমিক আনার ব্যবস্থা করেন।"
সেই সময় সিলেট অঞ্চলের চা বাগানের পাশাপাশি বর্ধনশীল ঢাকা ও পৌর শহরগুলোর পরিচ্ছন্নতার কাজে তাদের নিয়োগ দেয়া হয়। কারণ এসব কাজের জন্য তারা স্থানীয় বাঙালি কর্মী পাওয়া যাচ্ছিল না।








