জার্মানির ভেতরে ‘স্বাধীন ও স্বঘোষিত এক রাজ্যে’ গিয়ে যা দেখা গেছে

- Author, জেনি হিল
- Role, বিবিসি বার্লিন সংবাদদাতা
জার্মানির পূর্বাঞ্চলে একটি শহরতলির ভেতরে আছে অদৃশ্য এক সীমান্ত।
সেখানে চোখে পড়ে দুর্গের মতো প্রাসাদ-সদৃশ এক ভবন। তার সদর দরজায় একটি সাইনবোর্ড লাগানো। ওই সাইনবোর্ড দর্শনার্থীদের জানিয়ে দিচ্ছে যে কার্যত তারা ‘নতুন এক দেশে’ প্রবেশ করেছে।
এই দেশের নাম ‘ক্যোনিগরাইশ ডয়েচলান্ড’ বা কিংডম অব জার্মানি। এটি একটি স্বঘোষিত স্বাধীন দেশ বা রাজ্য। এমনকি তারা তাদের নিজেদের জন্য একজন রাজাও নিযুক্ত করেছে।
রাজার দুর্গে
এই রাজা নিজের পরিচয় দিতে জান পিটার দ্যা ফার্স্ট এই নামে। তিনি আমাদেরকে কাঠের তৈরি একটি বাড়ির হলের ভেতরে নিয়ে গেলেন।
তার রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার পর প্রায় এক দশক পার হয়ে গেছে।
সেসময় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে এই রাজার অভিষেক সম্পন্ন হয়েছিল- তার মাথায় পরানো হয়েছিল রাজমুকুট এবং তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল রাজদণ্ড।
জার্মানির ভেতরে প্রতিষ্ঠিত তথাকথিত এই রাজ্যে ছাপানো হয়েছিল নিজেদের পৃথক মুদ্রা। শুধু তাই নয়, তাদের নিজেদের জন্যে ছিল নিজস্ব আইডি কার্ড বা পরিচয়পত্র। এমনকি নিজেদের আলাদা পতাকাও।
কেন তারা আলোচনায়
জার্মানিতে স্বঘোষিত এই রাজ্যের সদস্যরা পরিচিত ‘রাইশবুর্গার’ হিসেবে যার অর্থ সাম্রাজ্যের নাগরিক।
ধারণা করা হয় জার্মানিতে এরকম রাইশবুর্গারের সদস্য প্রায় ২১ হাজারের মতো।
জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল।
এই রাইশবুর্গাররা যুদ্ধপরবর্তী জার্মানিকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।

এই গোষ্ঠীটি এ-সপ্তাহেই ব্যাপক আলোচনায় এসেছে যখন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের সন্দেহভাজন ২৫ জন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে তারা জার্মান সরকারকে সহিংস অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাতের অংশ হিসেবে পার্লামেন্ট ভবন রাইশটাগে হামলার পরিকল্পনা করছিল।
কী বলছেন 'কিং পিটার'
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
রাজা পিটার বলছেন, এরকম সহিংস আন্দোলনের কোনো ইচ্ছাই তাদের ছিলো না।
তবে তিনি মনে করেন জার্মানি একটি “ধ্বংসাত্মক ও রুগ্ন” রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
“এরকম ফ্যাসিবাদী ও অশুভ ব্যবস্থার অংশ হওয়ার কোনো আগ্রহ আমার নেই,” বলেন তিনি।
আলোচনার জন্য আমরা অন্য একটি ঘরে গিয়ে বসি। ওই ঘরে ছিল আরামদায়ক ও জেল্লাদার হাতলওয়ালা চেয়ার এবং মাথার উপরে চকচকে ঝকঝকে ঝাড়বাতি।
চারপাশ থেকে আমাদের ঘিরে ছিল বাতি ও ক্যামেরা। এটা কিং পিটারের নিজস্ব টিভি স্টুডিও।
তিনি নিজেই একটি টিভি চ্যানেল চালু করবেন বলে আশা করছেন।
তখন আমি জানতে পারলাম যে তার একজন প্রজা ওখানে আমরা যা কিছু বলি তার সবকিছুই রেকর্ড করবেন।
রাজা পিটার বললেন, এই রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া তার সামনে আর কোনো বিকল্প ছিলো না বলে তিনি মনে করেন।
এর আগে তিনি একজন মেয়র এবং জার্মান পার্লামেন্টের সদস্য হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন।
“যেসব লোক দুর্নীতিগ্রস্ত, অপরাধী এবং যারা জার্মান ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে বড় হতে চায় এবং যাদের হৃদয় সৎ, যারা এই পৃথিবীকে আরো ভালো করার জন্য পরিবর্তন আনতে চায়, সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা ভেবে, তাদের কোনো সুযোগ নেই,” বলেন তিনি।

কে এই কিং পিটার
তার আসল নাম পিটার ফিতজেক। তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি প্রায়শই জার্মানির আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন।
জার্মানি এই রাজ্য এবং রাজ্যের তৈরি করা দলিলপত্রকে স্বীকৃতি দেয়নি।
লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোর দায়ে মি. ফিতজেককে কয়েকবার দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। অনুমোদন ছাড়া নিজের স্বাস্থ্য বীমা কর্মসূচি পরিচালনার কারণেও তার সাজাও হয়েছে।
শুধু তাই নয়, তার প্রজাদের অর্থ তছরুপের কারণে তাকে কারাভোগও করতে হয়েছে।
কিন্তু পরে তার এসব দোষ আইনগতভাবে বাতিল করা হয়েছে।
আঞ্চলিক গোয়েন্দা বিভাগ কিং পিটার ও তার রাজ্যের ওপর প্রায় দু’বছর ধরে নজর রাখছিল।
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব
গোয়েন্দারা বিবিসিকে বলেছেন যে তারা এই রাজ্যটিকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছেন।
তারা এটিকে এমন একটি গোষ্ঠীর সাথে তুলনা করেন যারা চরমপন্থি এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী।
এধরনের আদর্শ ও তত্ত্ব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জার্মানিতে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
মহামারির কারণে সেগুলো আরো চাঙ্গা হয়েছে।
দেখা গেছে কোভিড-১৯ মহামারির সময় এই রাজ্যের প্রতি সমর্থন এবং তাদের সদস্য সংখ্যা বেড়ে গেছে।
মি.ফিতজেক আমাদের বলেছেন যে তার নাগরিকের সংখ্যা পাঁচ হাজারের মতো।
তিনি তার রাজ্য সম্প্রসারিত করছেন। জার্মানিতে কিছু জমি কিনছেন যেখানে বিভিন্ন সমাজ গড়ে তোলা হবে এবং শেষ পর্যন্ত এই গোষ্ঠীর লোকেরা এসব জায়গায় বসবাস করতে পারে।
জমি কিনে রাজ্য সম্প্রসারণ
আমরা রাজার দুর্গ থেকে প্রায় ১৫০ মাইল দূরে এরকম একটি জায়গা ঘুরে দেখেছি।
বার্লিন থেকে গাড়িতে করে এই জায়গাতে পৌঁছাতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টার মতো।
প্রাচীন সব গাছপালা এই এলাকাটিকে ঘিরে রেখেছে। সেখানে রয়েছে আরো একটি দুর্গ।
ওখানে মূল ভবনে কিম্বা আরো কিছু ক্যারাভানে ৩০ জনের মতো লোক বসবাস করে।
এসব ক্যারাভান এই জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে।
দুর্গের সৌন্দর্য ক্ষয়িষ্ণু। তবে সেটি একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থান।
তারা ভবনগুলো এখনও মেরামত ও পরিষ্কার করার কাজ করছে।
সেখান পুরনো একটি গ্রিনহাউজের ভেতর দিয়েই বড় হচ্ছে গাছের শাখা প্রশাখা।
কিন্তু এখানকার লোকজন তাদের এই বাড়ির ব্যাপারে খুব খুশি। এমনকি তারা ওই রাজ্যের ভূখণ্ড হওয়ার কথাও বিবেচনা করছে।
এই নাগরিকরা জার্মান সরকারকে কর দেয় না।

ছবির উৎস, Reuters
এমনকি তারা তাদের সন্তানদের স্কুলেও পাঠায় না। জার্মানিতে সন্তানকে স্কুলে না পাঠানো বেআইনি হিসেবে বিবেচিত।
এই লোকগুলোর রয়েছে নিজেদের আইন যা তারা মেনে চলে। আমাদেরকে বলা হয়েছে যে কিং পিটার এসব আইন দেখাশোনা করেন।
তারা তাদের নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতেও আগ্রহী।
“আপনার দৈনন্দিন জীবনের জন্য যা কিছু প্রয়োজন, এই রাজ্য থেকে তার সবকিছুই সরবরাহ করা যাবে। খাদ্য, পুষ্টিসাধন, সামাজিক নিরাপত্তা- সব ব্যবস্থাই সেখানে আছে,” বলেন বেনিয়ামিন, যিনি সম্প্রতি তার ছোট্ট পরিবার নিয়ে এখানে চলে এসেছেন এবং এই রাজ্যের জনসংযোগের দায়িত্বে রয়েছেন।
তাদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে একটি টেকসই পরিবেশবান্ধব সমাজ গড়ে তোলা।
আধুনিক চিকিৎসা ও ওষুধের প্রতি এই নাগরিকদের কোনো আস্থা নেই।
কোভিড মহামারির সময় তাদের কেউ টিকা নেয় নি বলে বেনিয়ামিন আমাকে জানিয়েছেন।
টিকার বিষয়ে এটাই রাইশবুর্গারদের অবস্থান।

ছবির উৎস, DPA PICTURE ALLIANCE
মহামারি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে এই নাগরিকদের অনেকেই অংশ নিয়েছিলেন।
“যেসব মানুষ তাদের নিজেদের কথা চিন্তা করে, আজকের দিনে তাদেরকে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বিশ্বাসী হিসেবে নিন্দা করা হয়,” বলেন বেনিয়ামিন।
“কিন্তু এটাই সত্য যে এই লোকগুলো বিভিন্ন সমস্যার কথা চিন্তা করে রাতের বেলাতেও জেগে থাকছে। শুধু তাদের নিজেদের নিয়ে ভাবছে না। তারা সমাজ ও রাজনীতির সমস্যাগুলো নিয়েও ভাবছে।
জার্মানরা কী ভাবছেন
আমরা যখন সেখান থেকে চলে আসার উদ্যোগ নেই, এবং ওই গ্রামের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হতে থাকি, সেখানে একজন তার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
আমি যখন তার কাছে তার এই প্রতিবেশীদের ব্যাপারে জানতে চাইলাম, তিনি ভ্রুকুটি সহকারে তাকালেন।
তিনি বললেন তাদের কর দেওয়া উচিত। কারণ তারা তো জার্মানির সম্পদ ভোগ করছে।
কিন্তু তিনি সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন তার নিজের সন্তানদের নিয়ে।
“আমি ভাবছি এই শিশুদের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে?”
জার্মানিতে এই রাইশবুর্গারদের নিয়ে বহু বছর ধরেই হাসি ঠাট্টা হয়েছে।
কিন্তু জার্মানি এখন তাদেরকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে শুরু করেছে।








