শান্তি চুক্তির ২৫ বছর পরও পাহাড়ে সংঘাত থামেনি

    • Author, আকবর হোসেন
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

খাগড়াছড়ির দীঘিনালার বাসিন্দা দীপঙ্কর প্রসাদ চাকমা ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখার সদস্য। জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখাটি শান্তিবাহিনী হিসেবে পরিচিত ছিল।

দীপঙ্কর প্রসাদ চাকমার মতো শান্তিবাহিনীর বহু সদস্য ১৯৮০ এবং ৯০’র দশকে পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে লড়াই করেছিলেন।

তাদের প্রায় দুই দশকের সশস্ত্র লড়াইয়ের ইতি হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ২রা জুলাই এক শান্তি চুক্তির মাধ্যমে।

সে চুক্তির দুই মাস পরে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেছিল শান্তি বাহিনীর সদস্যরা।

এরপর শান্তি বাহিনীর সদস্যরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিও দেশের নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে যোগ দেয়।

চুক্তিতে কী ছিল?

শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে সে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন চিফ হুইপ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষে স্বাক্ষর করেন তাদের নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা, যিনি সন্তু লারমা হিসেবে পরিচিত।

অস্ত্র সমর্পণের পর শান্তিবাহিনীর প্রায় দুই হাজার সদস্যের প্রত্যেককে সরকার ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিল।

এছাড়া শান্তি বাহিনীর সাতশর বেশি সদস্যকে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।

সে চুক্তিতে পাহাড়িদের জন্য অনেক প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।

চুক্তির মোদ্দা কথা কথা ছিল, পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং সে জন্য বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এবং আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছিল।

এর মধ্যে অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে-

  • তিন পার্বত্য জেলার স্থানীয় সরকার পরিষদ সমন্বয়ে একটি আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হবে। উপজাতীয় আইন এবং সামাজিক বিচারকাজ এই পরিষদের অধীনে থাকবে।
  • পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা
  • উপজাতীয়দের ভূমি মালিকানা অধিকার ফিরিয়ে দেয়া।
  • পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা।

বাস্তবায়ন কতটা?

শান্তি চুক্তির ধারাবাহিকতায় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সে অঞ্চলে গঠন করা হয়েছে। কিন্তু চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার জনসংহতি সমিতির বলছে প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়েছে বটে কিন্তু সেগুলোর হাতে ক্ষমতা নেই।

যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হচ্ছেন জ্যেতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা। এই প্রতিষ্ঠানটি কার্যত নিষ্ক্রিয় রয়েছে।

জেলা পরিষদগুলোর উপর আঞ্চলিক পরিষদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।

জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি উষাতন তালুকদার বলেন, যদিও কিছু বিষয় বাস্তবায়ন হয়েছে, কিন্তু মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন হয়নি।

সাধারণ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, পুলিশ, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং বন ও পরিবেশ – এসব বিষয় জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের হাতে থাকার কথা।

“তাহলে এ থেকে বুঝতে পারেন আমরা কী পেলাম?” প্রশ্ন তোলেন উষাতন তালুকদার।

ভূমি বিরোধ মিটছে না

জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন তখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তিনি লাখের বেশি বাঙালিকে পার্বত্য এলাকায় পুনর্বাসন করা হয়েছিল। পাহাড়িদের ভাষায় তারা ‘সেটেলার’।

শান্তি বাহিনীর সাথে সেনাবাহিনীর সংঘাত চলার সময় বহু পাহাড়ি ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল। অনেকে পার্বত্য এলাকার ভেতরেই উদ্বাস্তু হয়েছিলেন।

পাহাড়িদের অভিযোগ হচ্ছে, ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত যেসব বাঙালিকে পার্বত্য এলাকায় আনা হয়েছিল তাদের পুনর্বাসন করা হয়েছিল পাহাড়িদের ভূমিতে।

পাহাড়িদের দাবি হচ্ছে, সেসব ‘সেটেলারদের’ কাছ থেকে ভূমি নিয়ে পাহাড়িদের ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু বাঙালিরা বলছেন তাদের কাছে ভূমির বৈধ কাগজপত্র রয়েছে।

এই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য শান্তি চুক্তি হবার দুই বছর পরে ‘ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন’ গঠন করা হয়েছিল। এই কমিশনের কাছে এখন প্রায় ১৬ হাজারের মতো আবেদন জমা পড়ে আছে।

কিন্তু গত ২৩ বছরে এই কমিশন কোন কাজই করতে পারেনি। খাগড়াছড়ি শহরে এই কমিশনের অফিসে গিয়ে দেখা যায় সেখানে কোন কর্ম তৎপরতাও নেই।

২০১৬ সালের পর থেকে এই কমিশন আর কোন আবেদনও গ্রহণ করেনি।

পাহাড়িদের বক্তব্য হচ্ছে, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি না হলে এখানকার পরিস্থিতি অশান্ত থেকেই যাবে।

তবে বাঙালিরা বলছেন এই কমিশন নিরপেক্ষ নয়।

খাগড়াছড়ির সাবেক এমপি এবং বিএনপি নেতা ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, “এই কমিশনে বাঙালিদের কোন প্রতিনিধিত্ব নেই। একমাত্র বাঙালি হচ্ছেন চেয়ারম্যান। বাকি সবাই উপজাতি। তাহলে বাঙালিরা কিভাবে ন্যায়বিচার পাবে?”

“বাঙালিরা এখানে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে গেছে। এখানে আপনি ভূমি ক্রয় করে কিছু করতে পারবেন না। আপনি যদি খুলনায় গিয়ে, রংপুরে গিয়ে বাড়ি কিংবা ব্যবসা করতে চান সেটা বাংলাদেশের সংবিধান অ্যালাউ করেছে। পার্বত্য এলাকায় এটা হয়ে গেল উল্টো।”

চুক্তির সুফল কতটা?

পার্বত্য শান্তি চুক্তির ফলে সে অঞ্চলে অর্থনৈতিক এবং অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

যোগাযোগ ব্যবস্থার যেমন উন্নয়ন হয়েছে তেমনি শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যখাতেও উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে পার্বত্য এলাকায়।

শান্তি চুক্তির পরে গত ২৫ বছরে পার্বত্য এলাকায় ব্যাপক পর্যটন বেড়েছে। এর ফলে স্থানীয় পাহাড়ি এবং বাঙালি উভয়েই আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।

বাংলাদেশের যে কয়েকটি জায়গায় পর্যটকরা সবচেয়ে বেশি বেড়াতে যান তার মধ্যে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান অন্যতম।

শান্তিচুক্তি না হলে এটি কখনোই সম্ভব হতো না।

সুনীল দে রাঙামাটিতে সাংবাদিকতা করেন ৪০ বছরের বেশি সময় যাবত।

তিনি বলেন, “এমনও অবস্থা গিয়েছে, সকাল কয়টার পরে আমি বের হতে পারবো, বিকেল কয়টার আগে আমাকে হিলট্র্যাকসে ঢুকতে হবে, আদৌ ফিরতে পারবো কিনা কোন গ্যারেন্টি নাই। - এগুলো করেই আমাদের চলাফেরা করতে হয়েছে। এই অবস্থা যখন ছিল তখনই এই চুক্তির কার্যক্রম শুরু হয়।”

এর আগেও কয়েকবার এই চুক্তির কার্যক্রম শুরু হলেও শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার পর সেটি আলোর মুখ দেখে। ওই আমলে প্রথমবারের মতো এ বিষয়ে একটি রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয় বলে তিনি জানান।

দল, উপদল এবং কোন্দল

শান্তি চুক্তির পরে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে জটিল এক রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে।

চুক্তি সম্পাদনের সাথে সাথেই এর বিরোধিতা করে তৈরি হয়েছিল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ।

বর্তমানে ইউপিডিএফ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির দুটো করে গ্রুপ রয়েছে। এরা সবাই পরস্পরের প্রতিপক্ষ।

গত কয়েক বছর যাবত এসব সংগঠন একে অপরের সাথে সংঘাতে লিপ্ত। নিত্যদিন খুনোখুনি হচ্ছে।

অবৈধ অস্ত্র এবং চাঁদাবাজি এখন সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে পাহাড়ে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বিবিসিকে বলে, “আমাদের দম বন্ধ হয়ে যাবার মতো অবস্থা হয়েছে। বিভিন্ন গ্রুপকে চাঁদা দিতে দিতে আমরা শেষ হয়ে যাচ্ছি।”

পাহাড়ে বিভিন্ন উপদল তৈরি হবার পেছনে নিরাপত্তা বাহিনীর বড় ভূমিকা আছে বলে মনে করেন অনেকে। বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করে পাহাড়ে ‘ডিভাইড এন্ড রুল’নীতি গ্রহণ করা হয়েছে বলে পাহাড়ি নেতাদের অভিযোগ।

নানা গ্রুপিং এবং উপদলের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা সন্তু লারমার প্রভাব কিছুটা খর্ব হয়েছে।

ইদানীং তাকে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানেও খুব একটা দেখা যায় না। সংবাদমাধ্যমকেও এড়িয়ে চলেন মি. লারমা।

বিএনপি নেতারা চুক্তির বিপক্ষে কথা বলছেন। আওয়ামী লীগ নেতারা চুক্তির বিপক্ষে কথা না বললেও তারা সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির সমালোচনা করছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে যেসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে তার মধ্যে আওয়ামী লীগে কিছু নেতা-কর্মী রয়েছে বলে উল্লেখ করেন রাঙামাটির সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা দীপঙ্কর তালুকদার।

এজন্য তিনি সরাসরি জেএসএসকে দায়ী করে।

মি. তালুকদার বলেন, “শান্তি চুক্তি সাধিত হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। আর জনসংহতি সমিতি চায় আওয়ামী লীগ নিশ্চিহ্ন করতে। জনসংহতি সমিতি যদি আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়, তাহলে চুক্তি বাস্তবায়ন করবেন কাকে দিয়ে?”

“আওয়ামী লীগের শেকড় এখানে অনেক গভীরে। এটাই ওদের (জনসংহতি সমিতি) মাথা ব্যথার কারণ। স্বাভাবিক কারণে এখানে তো বিশ্বাস আস্থান সংকট তৈরি হয়ে থাকে।”

অভিযোগ রয়েছে জনসংহতি সমিতির অনেক সদস্য চাঁদাবাজি এবং খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়েছে।

কিন্তু মি. লারমার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড এবং জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি উষাতন তালুকদার সেটি অস্বীকার করেন।

রাঙামাটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “সরকারের মধ্যে কেউ কেউ বলে থাকেন আমরা অস্ত্র গোলাবারুদ পুরোপুরি জমা দেই নাই। আমি বুকে হাতে দিয়ে হলফ করে বলতে পারি আমরা একটা বুলেটও রেখে আসি নাই। চুক্তি বিরোধীরা আমাদের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মারধর ও খুন করেছে।”

তাহলে সমাধান হবে না?

আওয়ামী লীগ নেতা ও এমপি দীপঙ্কর তালুকদার ২০০৯ সালে থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।

তিনি মনে করেন, কোন চুক্তি শতভাগ বাস্তবায়ন করা না গেলেও সবগুলো পক্ষ কিছুটা ছাড় দিলে অনেকটাই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

“আপনি হান্ড্রেড পার্সেন্ট সমস্যার সমাধান করতে পারবেন, এমন চুক্তি বাস্তবায়ন কখনো হয় নাই। উভয় পক্ষ যদি রিজিড (অনমনীয় ) থাকে তাহলে সমস্যার সমাধান কখনো হয় না।”

জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি উষাতন তালুকদার বলেন, বল প্রয়োগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান হবে না। এটা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে।

“আমাদের মনে কোন খারাপ উদ্দেশ্য নেই। আমরা এক পায়ে খাড়া আছি। অস্ত্রবাজি দমন করার ক্ষেত্রে আমরা সহযোগিতা করব। সরকার সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে আসুক, আমরা অবশ্যই সহযোগিতা করবো,” বলেন উষাতন তালুকদার।