ময়মনসিংহের বাড়িটি কি সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষের? সরকারের দুই দফতরের ভিন্ন বক্তব্য

ছবির উৎস, KAMRUZZAMAN MINTO
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশের ময়মনসিংহে চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষদের শত বছরেরও বেশি প্রাচীন একটি জীর্ণ ভবন ভেঙে ফেলা হচ্ছে–– এমন খবর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে তোলপাড়। এরই মধ্যে এ বাড়ি ভাঙার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাংলাদেশ সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে ভারত সরকার।
একই সাথে ভবন সংস্কার ও পুনর্নির্মাণে সহযোগিতা করার কথাও জানিয়েছে দেশটি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে মঙ্গলবার দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়েছে।
এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বাংলাদেশ সরকারের কাছে এই বাড়িটিকে রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স – এ এক পোস্টে এ আহ্বান জানান তিনি।
সমালোচনার মুখে আজ বুধবার ভবন ভাঙার কাজ বন্ধ রেখেছে শিশু একাডেমি।
আলোচিত এই বাড়িটি ময়মনসিংহ শহরের হরিকিশোর রায় রোডে অবস্থিত।
২০০৮ সালে এই জমি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু পরে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় ভবনটি ভাঙার সিদ্ধান্ত নেয় সরকারি এই সংস্থাটি। এই স্থাপনাটি ভেঙে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
কিন্তু যে বাড়িটি ভাঙা নিয়ে এতো আলোচনা সেটি কি আসলেই সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষদের বাড়ি? কবে এটি পরিত্যক্ত হয়েছে? কখন থেকে কার অধীনে ছিল? এমন নানা প্রশ্ন উঠেছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা মনে করেন এটি সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষেরই। এছাড়া স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার তালিকায় নেই এই ভবনটি।
ময়মনসিংহের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ময়মনসিংহের ফিল্ড অফিসার সাবিনা ইয়াসমিন জানান, ময়মনসিংহ বিভাগে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার জরিপ এখনো চলছে, সেটি শেষ হওয়ার পর সংরক্ষিত তালিকায় যে কোনো স্থাপনা তালিকাভুক্ত হয়। সে কারণেই এই ভবন যাতে আর ভাঙা না হয়, মৌখিকভাবে সেই অনুরোধ করেছে অধিদপ্তর।
এছাড়া ভাঙার বিষয়ে যাবতীয় কাগজপত্র চেয়ে শিশু একাডেমির কাছে লিখিত আবেদনও করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে, অংশীজনদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক মুফিদুল আলম জানান, এই ভবনটি সত্যজিৎ রায়ের ভবন নয়।
প্রশাসনের মতো একই দাবি করেন প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক ময়মনসিংহের একজন গবেষক ও কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক স্বপন ধর। তার দাবি, বাড়িটি সেটি সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষদের বাড়ি নয়, বরং এটি দানবীর রনদাপ্রসাদ সাহার একটি বাড়ি।
২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার ও জার্মানির যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত এক গবেষণায় এই তথ্য পাওয়া গিয়েছিল বলে দাবি করেন মি. ধর।
তবে ওই হরিকিশোর রোডে সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষদের একটি বাড়িও ছিল, আরও বছর দশেক আগেই তা ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে জানান এই গবেষক।
ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুনের মতে, সাবেক পূর্ববঙ্গ জুড়ে এরকম বাড়ি ছিল। যাদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তাদের পূর্বপুরুষরা দেশ ভাগের অনেক আগেই চলে গেছেন। অল্প কিছু বাড়ি বা স্থাপনা সংরক্ষণ করা গেলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাকিগুলো জরাজীর্ণ হয়ে গেছে।
বিবিসি বাংলাকে মি. মামুন বলেন, "সার্কভুক্ত পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও এমন সব স্থাপনা সেভাবে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।"
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর

ছবির উৎস, COLLECTED/BBC
স্থাপত্যের দিক থেকে গুরুত্ব আছে
স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে এই ভবনটি গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ময়মনসিংহের ফিল্ড অফিসার সাবিনা ইয়াসমিন। সে কারণে ভবন ভাঙা স্থগিত রাখতে এবং তা রক্ষা করতে শিশু একাডেমির কাছে মৌখিকভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।
একই সাথে ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যে কাগজপত্র প্রয়োজন সেগুলো চেয়ে গত সোমবার লিখিতভাবে আবেদন করেছিলেন তিনি।
এরই মধ্যে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষিত বলে শিশু একাডেমি জানিয়েছে বলে জানান প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা।
ইতোমধ্যেই ভবনটির এক - তৃতীয়াংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে জানান তিনি।
মিজ ইয়াসমিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "স্ট্রাকচারাল দিক থেকে এটা তো শতবর্ষী ভবন। চুন – সুরকির উপাদানে নির্মিত, দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার। স্থাপত্যের দিক থেকে গুরুত্ব আছে।"
একটি বইয়ের কথা উল্লেখ করে মিজ ইয়াসমিন জানান, সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষ মসুয়ার জমিদার রায় পরিবারের বাড়ি এটি।
এছাড়া ফেসবুকের বিভিন্ন লেখা, ইতিহাসের বই, ইউটিউবের বিভিন্ন কন্টেন্ট এমনকি জনশ্রুতিও প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয়ের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয় বলে জানান তিনি।
মিজ ইয়াসমিন বলেন, "দরজি আবদুল ওয়াহাবের লেখা 'ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শন' বইয়ে লেখা হইছে। সরাসরি এভাবে ওই বইটাতে লেখে নাই। আমি অনলাইন, ইউটিউব ও বাংলাপিডিয়ার অনলাইনেও দেখলাম এটা (ভবন) রায় পরিবারের। আমার যুক্তি হলো এটা হতে পারে, কারণ ওই ভবনের সামনের রোডটা হরিকিশোর রায় রোড।"
"এটাও আছে লেখা যে ওখানে একটা স্থাপনা ছিল যেটা ভেঙে ফেলা হইছে, ওটা নাকি ছিল রায় পরিবারের। তো রায় পরিবারের একটা বাড়িতে তো অনেকগুলা স্থাপনা থাকে। সেই সুবাদে আমার কাছে মনে হলো এটা রায় পরিবারের তাদেরই কোনো পূর্বপুরুষদের বাড়ি হতে পারে" দাবি করেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা।
তবে এখনো পুরাকীর্তি বা প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষিত স্থাপনার তালিকায় এ ভবনটি নেই বলে জানান তিনি, কারণ ময়মনসিংহ বিভাগে জরিপ এখনো চলমান রয়েছে।
মিজ ইয়াসমিন বলেন, "এটা তো দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। আমরা তো সার্ভের মাধ্যমে প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন অফিসে দেই। স্টেপ বাই স্টেপ সংরক্ষিত তালিকায় আনা হয়। গত অর্থবছর থেকে ময়মনসিংহ বিভাগে আমাদের সার্ভে শুরু হয়েছে। দুইটা উপজেলায় করেছি, ১৩টা উপজেলায় করা হবে। ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় এখনো সার্ভে হয়নি।"

ছবির উৎস, KAMRUZZAMAN MINTO
ইতিহাসবিদরা যা বলছেন
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ হিসেবে পরিচিত বাংলা পিডিয়ার রায়চৌধুরী, উপেন্দ্রকিশোর পর্বে লেখা হয়েছে, ১৮৬৩ সালের ১০ই মে ময়মনসিংহ জেলার মসুয়া গ্রামে উপেন্দ্রকিশোর জন্মগ্রহণ করেন। যেটি বর্তমানে কিশোরগঞ্জের অধীনে।
পাঁচ বছর বয়সে তার বাবা কালীনাথ রায় ওরফে শ্যামসুন্দর মুন্সীর কাছ থেকে নিকট আত্মীয় ময়মনসিংহের জমিদার হরিকিশোর চৌধুরী তাকে পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন।
তার নতুন নাম রাখেন উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী। জমিদার হরিকিশোরের পৃষ্ঠপোষকতায় তার শিক্ষা জীবন শুরু হয়।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর চার ছেলেমেয়ের একজন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক সুকুমার রায়।
বাংলা পিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, সুকুমার রায়ের জন্ম কলকাতায়। তবে তাদের আদি নিবাস ময়মনসিংহ জেলার মসুয়ায় ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবার সুকুমার রায়ের ছেলে চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ও কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেছেন।
একই সাথে পৈতৃক নিবাস বৃহত্তর ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ জেলার মসুয়া গ্রামে বলে বাংলা পিডিয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া ইতিহাসের অন্য কোন বইতে উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী বা তার পরিবার সম্পর্কে তেমন একটা লেখা পাওয়া যায়নি।
ইতিহাসবিদরা বলছেন, সারা পূর্ববঙ্গ জুড়ে এরকম বাড়ি ছিল। যাদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তাদের পূর্বপুরুষরা দেশ ভাগের অনেক আগেই চলে গিয়েছেন।
রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব ভবন বা বাড়ি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কিছু কিছু বাড়িঘর রক্ষা করা হয়েছে। যেমন জ্যোতি বসুর বাড়িটা সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন বলেন, "আমরাও চাই যেগুলো অক্ষত বাড়ি আছে সেগুলো সংরক্ষণ করে ব্যবহারযোগ্য করা। তবে যেগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেছে সেগুলোর ওপরে তো নতুন স্থাপনা হবেই। আমাদের পক্ষে তো এতো বাড়ি সংরক্ষণ করা সম্ভব না।"
এর কারণ হিসেবে মি. মামুন বলেন, "এ ধরনের নামী লোকের সংখ্যা কমপক্ষে ৫০ থেকে ৬০ জন তো হবেই, আরও বেশি। অনেকের বাড়িঘর হারিয়েও গেছে, সংরক্ষণ হয়নি। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও কিন্তু সংরক্ষণ করা হয়নি।"
বাংলাদেশে স্থানীয় ব্যক্তি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আগ্রহ থাকলে এবং যদি ভবন বাসযোগ্য অবস্থায় থাকে তাহলে স্থাপনা সংরক্ষণ করা যায় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সাবেক এই শিক্ষক।
মি. মামুন বলেন, "ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে আমি সবসময় চাইবো এ ধরনের স্মৃতিগুলো সংরক্ষিত হোক। কিন্তু এটা সম্ভব না। সার্কভুক্ত পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও এমন সব স্থাপনা সেভাবে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। আফগানিস্তানের বামিয়ান দুর্গতো আমরা রাখতে পারিনি, এতো বড় ঐতিহাসিক জিনিস।"
বাড়িটি কার?
প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে ময়মনসিংহের একজন গবেষক স্বপন ধরের দাবি, যে ভবন ভাঙা নিয়ে এতো আলোচনা সেটি সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষের বাড়ি নয়। বরং দানবীর রনদাপ্রসাদ সাহার একটি অস্থায়ী বাসভবন।
এই গবেষক আরও দাবি করেন, ওই এলাকায়ই সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষদের একটি বাড়ি ছিল কিন্তু বছর দশেক আগে তা ভেঙে ফেলা হয়।
২০১০ সালে বাংলাদেশের সরকার এবং জার্মানির অর্থায়নে করা একটি গবেষণা ও জরিপে এ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। ময়মনসিংহ পৌরসভায় ওই ফান্ডের অর্থ দেওয়া হয়েছিল।
ময়মনসিংহে জার্মান প্রযুক্তি গথিক আর্ট ব্যবহার করে যেসব স্থাপনা নির্মিত হয়েছিল সেটার দেখার জন্য ওই গবেষণা পরিচালিত হয়েছিল। শশীলজ, আনন্দমোহন কলেজ এসব স্থাপনা গথিক প্রযুক্তিতে নির্মিত।
২০০৯ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এক বছর মাঠ পর্যায়ে পর্যালোচনা করা হয়।
ফ্রান্সের আরবান করজারভেশন স্পেশালিস্ট রোমেইন লার্চারের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই গবেষণায় ময়মনসিংহের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ৩২০টি বাড়ি চিহ্নিত করা হয়। তবে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার সময় ২৮০টি পাওয়া গিয়েছিল। বাকিগুলো কয়েক বছর আগেই ভেঙে ফেলা হয়েছিল।
মি. ধরের মতে, "এই ২৮০টি বাড়িকে রোমেইন লার্চার তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছিলেন। আমি তার সাথে ছিলাম। এর মধ্যে প্রথম ক্যাটাগরিতে চিহ্নিত করা ছয়টি বাড়ির মধ্যে শশীলজ, আলেক্সান্ডার ক্যাসেল, ঐতিহ্যবাহী কাঠের বাড়ি ছিল।"
"৫৪টি বাড়ি ছিল দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে। যেগুলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পুরাকীর্তির মধ্যে পড়লেও ভাঙা যায় না। এই ৫৪টি বাড়ির মধ্যে একটি ছিল তার বাড়িটি," বলেন মি. ধর।
শশীকান্ত মহারাজ ও সূর্যকান্তের পরিবার রনদাপ্রসাদ সাহাকে ওই জায়গাটা দান করে বলে দাবি করেন মি. ধর।
"এখানে কয়লার ব্যবসা করতেন রনদাপ্রসাদ সাহা। তাকে থাকার জন্য ওই জায়গা দেয় তারা। তখন এই বাড়িটা করেন। বাড়ির যে ভাঙা ইটগুলা আছে সেগুলোর মধ্যে একটা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আছে। এসকে লেখা অর্থাৎ সূর্যকান্ত। এসকে হসপিটাল যে করেছে, সেটা একই সময়ে করছে বলে একই ইট দিয়েই ওই বাড়িটা করেছে," বলেন মি. ধর।
ওই গবেষণা চলাকালীন সেসময় দানবীর রনদাপ্রসাদ সাহার বংশের দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় আরতী প্রসাদ সাহার সাক্ষাৎকারও সেসময় তিনি নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
মি. ধর জানান, আজ স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তিনি এই স্থাপনা রনদাপ্রসাদ সাহার নামে পরিচিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
মি. ধর বলেন, "এটা যে আরপি সাহার বাড়ি ছিল সেটা যেন স্থাপনার কোনো জায়গায় রেখে দেয় সে কথা বলছি। অলরেডি বহির্বিশ্বে এটা নিয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।"
"এটা বলতেছে সত্যজিৎ রায়ের বাড়ি, এটা তার বাড়ি না। সত্যজিৎ রায়ের আত্মীয় ছিল হরিকিশোর, রাস্তাটা সে নির্মাণ করেছিলো বলে তার নামে রোডের নামকরণ। সত্যজিৎ রায়ের বাড়িটা একেবারে শেষ মাথায়। এটা রোমেইন লার্চারের গবেষণায় রয়েছে, ডকুমেন্ট রয়েছে।"
২০১০ সালে ওই গবেষণা একটি সংবাদপত্রেও প্রকাশিত হয় বলে দাবি করেন এই গবেষক।
কেদারনাথ মজুমদারের লেখা "ময়মনসিংহের ইতিহাস ও বিবরণ", ব্রিটিশ লেখক ও সিভিল কালেক্টর রবার্ট দিউর লেখা "ব্রিফ হিস্ট্রি অব ময়মনসিংহ" এবং দরজি আবদুল ওয়াহাবের লেখা "ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শন" বইয়ের বিভিন্ন লেখায় এ বিষয়টি পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করেন এই গবেষক।

ছবির উৎস, Mamata Banerjee/X
ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়া
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের সরকারকে এই স্থাপনা ভাঙার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ই জুলাই) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, "আমরা গভীর দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি বাংলাদেশের ময়মনসিংহে অবস্থিত প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষদের বাড়িটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। বাড়িটি তার দাদা ও বিখ্যাত সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ছিল।"
বাংলাদেশের সরকারের মালিকানাধীন বাড়িটি বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে এতে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, "ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং ভবনটি যে বাংলার সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের প্রতীক এই দিকটি বিবেচনা করে তা ধ্বংস করার পরিবর্তে সংস্কার ও পুনর্গঠনের সম্ভাবনা বিবেচনা করাই শ্রেয়। ভবনটিকে একটি সাহিত্য জাদুঘর এবং ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।"
একই সাথে জাদুঘর করতে ভারত সরকার সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীও গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স – এ এক পোস্টে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভবন ভাঙার খবরের কথা তুলে ধরে তা দুঃখের বলে উল্লেখ করেছেন।
এই সংবাদ অত্যন্ত দুঃখের উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, "রায় পরিবার বাংলার সংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক। উপেন্দ্রকিশোর বাংলার নবজাগরণের একজন স্তম্ভ। তাই আমি মনে করি, এই বাড়ি বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।"
বাংলাদেশের সরকারকে এই বাড়িটি রক্ষার আবেদন জানান তিনি।
"আমি বাংলাদেশ সরকার ও ওই দেশের সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছে আবেদন করব, এই ঐতিহ্যশালী বাড়িটিকে রক্ষা করার জন্য। ভারত সরকার বিষয়টিতে নজর দিন। "

ছবির উৎস, KAMRUZZAMAN MINTO
যা বলছে প্রশাসন
চার-পাঁচ দিন আগে এই ভবনটি ভাঙার কাজ শুরু হয়। তবে গতকাল বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি সবার নজরে আসে।
পরে ওই সংবাদের সূত্র দিয়েই গতকাল মঙ্গলবার মমতা ব্যানার্জী ও ভারত সরকার প্রতিক্রিয়া জানায়। রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, আজ বুধবার প্রশাসনের নির্দেশে ভবন ভাঙার কাজ স্থগিত রয়েছে।
ময়মনসিংহের জেলা শিশু কর্মকর্তা মেহেদী জামান, এর আগে গতকাল গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন- ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় ২০১০ সাল থেকে ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। ভাড়া বাসায় একাডেমির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সে কারণেই আর্থিক ক্ষতির বিষয় বিবেচনায় ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
এদিকে বিকেলে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে সব অংশীজনদের নিয়ে এই ভবন সংক্রান্ত এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ওই বৈঠক শেষ জেলা প্রশাসক মুফিদুল আলম জানান এই ভবনটি সত্যজিৎ রায়ের ভবন নয়।
এক সংবাদ সম্মেলনে মি. আলম জানান সকল রেকর্ডপত্রে বাংলাদেশ সরকারের নামে এই জমি নথিবদ্ধ রয়েছে।
"এই জমিটি বা বাড়িটা যেটা সত্যজিৎ রায়ের বা তার পূর্ব প্রপিতামহরা আছেন তাদের বলে দাবি করা হচ্ছে। আমাদের সামনে যেসব খতিয়ান, রেকর্ডপত্র, সিএস, এসএ এবং আর এস সব খতিয়ান যাচাই-বাছাই করেছি। এখানে সকল খতিয়ানে কোনোভাবেই এটা সত্যজিৎ রায় বা তার পূর্বপুরুষদের নাম নেই। এটা আর এস রেকর্ডে বাংলাদেশ সরকারের নামে লিপিবদ্ধ," বলেন মি. আলম।
২০০৮ সালে এই জমি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির নামে জমির বন্দোবস্ত করা হয়েছে। এই দলিল ও খতিয়ানও শিশু একাডেমির নামে রয়েছে বলে জানান মি. আলম।
মি. আলম বলেন, "তারা যথাযথ প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে এই ভবন ভাঙার কার্যক্রম শুরু করে তারা। সেক্ষেত্রে কোনো নিয়ম বা প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় ঘটায়নি তারা। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তারা ভবন নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করেছে।"
এই ভবন সত্যজিৎ রায়ের বাড়ি ছিল কি না এ বিষয়ে স্থানীয় গণ্যমান্য বয়স্ক ব্যক্তি এবং গবেষকদের সাথে প্রশাসন কথা বলেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মি. আলম বলেন, "এই এলাকার যাদের বয়স আশির ওপরে এবং যারা এটা নিয়ে গবেষণা করেন তারা সকলেই একবাক্যে বলছেন যে এটা কখনোই সত্যজিৎ রায় বা তার পূর্বপুরুষদের বাড়ি ছিল না। এটা একটা মিথ্যা তথ্য দিয়ে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য এই তথ্যগুলা ছড়ানো হচ্ছে।"








