রোহিঙ্গা শিবিরে গোলাগুলিতে ৫ জন 'আরসা সদস্য' নিহত

বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে দুটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলিতে অন্তত ৫ জন নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আরো কেউ আহত হয়েছে কিনা তা জানা যায়নি।

উখিয়া শিবিরের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন- এপিবিএন এর সহকারী পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ বিবিসি বাংলাকে এ খবর নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, নিহতরা সবাই সশস্ত্র সংগঠন আরসার সদস্য।

পুলিশ জানায়, আজ ভোর পাঁচটার দিকে উখিয়ার এইট ইস্ট ক্যাম্প এলাকায় গোলাগুলির এ ঘটনা ঘটে।

মি. আহমেদ বলেন, আরসার বিভিন্ন সদস্যরা বিভিন্ন শিবির থেকে সংঘবদ্ধ হয়ে ক্যাম্প এইট ইস্ট-এ আক্রমণ করে। তখন আরসার বিরোধী সংগঠন আরএসও-এর সদস্যদের সাথে গোলাগুলি হয়।

গোলাগুলিতে ঘটনাস্থলেই তিন জন নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে আহত অবস্থায় দুই জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায় এপিবিএন পুলিশ। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই দুই জনও মারা যায়।

নিহতদের মধ্যে সবাই ক্যাম্প এইট-ইস্টের বাসিন্দা বলে জানা গেছে। মরদেহগুলো উখিয়া থানায় পাঠানো হয়েছে। সেখানে সুরতহাল রিপোর্টের পর এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানানো হয়।

এ ঘটনায় একটি বন্দুক ও তিনটি চাকু উদ্ধার করা হয়।

মি. আহমেদ জানান, গোলাগুলির পর শিবিরের অবস্থা স্বাভাবিক রাখার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে টহল। একই সাথে শিবিরে প্রবেশের মুখে চেকপোস্টে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গোয়েন্দা তৎপরতাও আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। ক্যাম্পের অবস্থা বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

সহকারী পুলিশ সুপার ফারুক হোসেন বলেন, গোলাগুলির এই ঘটনাটি দুটি সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে কেউই পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে না।

পুলিশ বলছে, শরণার্থী শিবিরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এই গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।

“ক্যাম্পটাকে তারা নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তারা অবৈধভাবে বিভিন্ন অর্থ উপার্জন করতে চায়। এর মধ্যে রয়েছে মাদক ব্যবসা, বিভিন্ন দোকানপাট থেকে চাঁদা,” বলেন মি. আহমেদ।

এঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতারে কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ।

এরআগে গতকালও এইট ডাব্লিউ ক্যাম্প এলাকায় এবাদুল্লাহ মাঝি নামে এক জন রোহিঙ্গা আরসার আক্রমণের কারণে মারাত্মক আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

রোহিঙ্গা শিবিরে থাকা সাইফুল আরাকানি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ভোর রাতে এ ঘটনার পর থেকে ক্যাম্প বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরে এই দুই গ্রুপের তৎপরতার কারণে সাধারণ রোহিঙ্গারা মোটামুটি সব সময়েই আতঙ্কের মধ্যে থাকে।

আরসা কারা?

২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে প্রথম এই সংগঠনটিরই নাম শোনা গিয়েছিল।

আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি আগে ইংরেজীতে 'ফেইথ মুভমেন্ট' নামে তাদের তৎপরতা চালাতো। স্থানীয়ভাবে এটি পরিচিত ছিল 'হারাকাহ আল ইয়াকিন' নামে।

মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা-কে একটি সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী বলে ঘোষণা করেছে।

বিবিসির জোনাথন হেডের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের অগাস্টে চালানো হামলা ছিল মূলত বিশ্ববাসীর নজর কাড়ার চেষ্টা।

এই সংগঠনটি বলছে, তারা রোহিঙ্গা মুসলমানদের অধিকার আদায়ে কাজ করে, এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের গেরিলা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

মিয়ানমার বলছে, এই গ্রুপটির নেতৃত্বে রয়েছে রোহিঙ্গা জিহাদীরা, যারা বিদেশে প্রশিক্ষণ পেয়েছে। তবে সংগঠনটি কত বড়, এদের নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত, তার কোন পরিস্কার ধারণা তাদের কাছেও নেই।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার অভিযোগ শোনা যায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময় অভিযোগ করেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আরসাসহ বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং চরমপন্থি সশস্ত্র গ্রুপ ক্রিয়াশীল রয়েছে, যারা মূলত অপহরণসহ নানা ধরণের অপরাধ তৎপরতায় যুক্ত।

বলা হয়ে থাকে রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তায় এখন বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয় আরসাকে।

আরাকানে যারা এই সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত, তাদের আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ আছে বলে মনে করা হয়। স্থানীয় রোহিঙ্গাদের মধ্যে এই সংগঠনটির প্রতি সমর্থন এবং সহানুভূতি আছে।

তবে এই আরসার বিরুদ্ধেও নানারকম সহিংসতা চালানোর অভিযোগ আছে। ২০১৮ সালে আরসার বিরুদ্ধে মিয়ানমারে হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগ তোলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে বলা হয়, আরসা রাখাইনে একটি অথবা দু'টি গণহত্যা চালিয়ে শিশুসহ ৯৯জন হিন্দুকে হত্যা করেছে।

তবে আরসা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

আরএসও কারা?

রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন বা আরএসও একটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী যা ১৯৮২ সালে মিয়ানমার আরাকানে সরকারের বড় ধরণের অভিযানের পর গঠিত হয়েছিল। এই সংগঠনটি নিজেদেরকে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবেও দাবি করে।

মোহাম্মদ আইয়ুব খান নামে এক ব্যক্তি এই সংগঠনের প্রধান বলে জানা যায়।

পুলিশ বলছে, আরএসও মূলত সন্ত্রাসী সংগঠন। অন্য সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর মতোই তারা রোহিঙ্গা শিবিরের আধিপত্য দখল নিতে কাজ করে।

এপিবিএন-৮ এর সহকারী পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ বলেন, “এসব গোষ্ঠী বলে যে তারা রোহিঙ্গাদের অধিকার বাস্তবায়ন নিয়ে কাজ করে। কিন্তু তারা কেউই এধরণের কোন কাজ করে না। তারা সবাই সন্ত্রাসী সংগঠন।”

তিনি বলেন, “এখানে কয়েকটি সন্ত্রাসী সংঠন রয়েছে। আরসা, আরএসও, নবীহোসেন গ্রুপ, মুন্না গ্রুপ, আর কিছু আছে ডাকাত সংগঠন আছে। এরা সবাই অবৈধ। যারা একে অপরের উপর প্রভাব বিস্তার করার জন্য বিভিন্ন সময় এরকম কাজ গুলো করে।”

পুলিশ জানায়, বাংলাদেশে আসার আগে থেকেই এই সংগঠনগুলো গঠিত হয়েছে।