পাকিস্তান- আফগানিস্তান সংঘাত পরিস্থিতির সবশেষ কী তথ্য জানা যাচ্ছে

পড়ার সময়: ৬ মিনিট

শুক্রবার ভোররাতে আফগানিস্তানে হামলার শুরুর পর থেকে শনিবার পর্যন্ত ৩৩১ জন 'সন্ত্রাসী'কে হত্যার দাবি করেছে পাকিস্তান। আফগানিস্তানের ৩৭ স্থানে বিমান হামলা ও ১০৪টি চেকপোস্ট ধ্বংসেরও দাবি করেছে তারা।

দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এখনো চলছে। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন দেশ দুই পক্ষকেই আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং আলোচনার আহ্বান জানালেও পরিস্থিতি খুব একটা পাল্টায়নি।

বরং দুই দেশই নিজ নিজ অবস্থানে অটল আছে বলা চলে।

তবে পাকিস্তান তার অবস্থান আরেকটু স্পষ্ট করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ শুক্রবার বলেছিলেন, আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে তার দেশ "সরাসরি যুদ্ধের" পরিস্থিতিতে আছে।

এ বিষয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের মুখপাত্র মুশাররফ জাইদি বলেছেন, পাকিস্তানকে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে "যুদ্ধ ঘোষণা" করতে হবে না, তবে সীমান্তপাড়ের অভিযান চলবে যতক্ষণ না "আফগান তালেবান ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন হয়"।

এদিকে, পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি করেছেন, এই অভিযানের অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত আফগান তালেবানের ওপর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করা সম্ভব হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, ২৮ ফেব্রুয়ারির সকাল পর্যন্ত—৩৩১ জন যোদ্ধা নিহত, ৫০০ জনের বেশি আহত, ১০৪টি চেকপোস্ট ধ্বংস, ২২টি চেকপোস্ট দখল, ১৬৩টি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস এবং আফগানিস্তানের ৩৭টি স্থানে কার্যকর বিমান হামলা চালানো হয়েছে।

অভিযান এখনো চলছে বলেও উল্লেখ করেন আতাউল্লাহ তারার।

এদিকে, পাকিস্তানের নতুন করে বোমাবর্ষণ ও হামলায় ১৩ বেসামরিক নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে তালেবান সরকার।

তালেবান সরকারের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত বলেছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী কান্দাহার ফেরত আফগানদের একটি অস্থায়ী শিবিরে বোমা হামলা চালিয়েছে, যেখানে তিনজন শ্রমিক নিহত এবং আরও সাতজন আহত হয়েছে।

ওই শিবিরটি কান্দাহারে ডুরান্ড লাইনের কাছে অবস্থিত এবং অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ফিতরাত ফেসবুকে লিখেছেন, গত রাতে কুনার প্রদেশের আসাদাবাদ শহরের কেন্দ্রেও গোলাবর্ষণ করা হয়েছে, যাতে সাতজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।

অন্যদিকে তালেবান সূত্রগুলো বলছে, পাকতিকা প্রদেশে পাকিস্তানি মিলিশিয়াদের সাম্প্রতিক হামলায় তিনজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছে।

'এটা যুদ্ধ নয়, তবে অভিযান চলবে'

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেহবাজ শরিফের মুখপাত্র মুশাররফ জাইদিকে জিজ্ঞেস করা হয়, পাকিস্তান কি আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে?

এ বিষয়ে মুশাররফ জাইদি বলেন, "আমাদের যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে না। এটা যুদ্ধ নয়। যুদ্ধ হয় দু'টি দেশের মধ্যে"।

"পাকিস্তান তার প্রয়োজন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে যেন পাকিস্তানের মাটি ও জনগণকে... আফগান মাটি থেকে আসা সন্ত্রাসবাদ থেকে রক্ষা করা যায়," বলেন তিনি।

তিনি দাবি করেন, আফগানিস্তানে পাকিস্তানবিরোধী উগ্রপন্থাকে আফগান তালেবানের অন্তর্বর্তী সরকার সমর্থন দিচ্ছে।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে কীভাবে আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে—এমন প্রশ্নে জাইদি বলেন,

"আমরা আস্থা গড়ব না, বরং আমাদের ভূমি ও জনগণকে রক্ষায় 'আগুনের প্রাচীর' গড়ব"।

তিনি আরও বলেন, আফগান তালেবান এবং ভারতের উচিত আস্থা পুনপ্রতিষ্ঠা করা।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র বলেন, তালেবানকে দোহা চুক্তির শর্ত পূরণ করতে হবে, যার অধীনে তাদের ভূখণ্ড কোনো দেশের বিরুদ্ধে উগ্রপন্থিদের দ্বারা ব্যবহার হতে দেওয়া যাবে না।

আফগান তালেবান যদি তাদের মাটিতে উগ্রপন্থিদের ঘাঁটি ধ্বংস না করে, তবে পাকিস্তান তা করবে- উল্লেখ করে মুশাররফ জাইদি আরও বলেন, "আমরা এসব (কার্যক্রম) চালিয়ে যাব যতক্ষণ না আফগান তালেবান ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়"।

পাকিস্তান আমার ভালো বন্ধু: ট্রাম্প

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে কি না- সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

হোয়াইট হাউসের বাইরে একজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন, "পাকিস্তান আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। তারা কি আপনাকে হস্তক্ষেপ করার অনুরোধ করেছে?"

এর জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি লড়াইয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারেন।

তবে তিনি আরও বলেন, "আপনাদের জানা উচিত, পাকিস্তানের সঙ্গে আমার ভালো বন্ধুত্ব রয়েছে। তাদের প্রধানমন্ত্রী দারুণ, তাদের একজন দারুণ জেনারেল আছে, তাদের একজন দারুণ নেতা রয়েছে। তারা দু'জন এমন ব্যক্তি যাদের আমি সত্যিই অনেক সম্মান করি।"

তিনি বলেন, পাকিস্তান ভালো কাজ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরো পরিষ্কার করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনৈতিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালিসন হুকার বলেছেন, "যুক্তরাষ্ট্র তালেবানের হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার বিষয়ে পাকিস্তানের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানায়"।

এক্স–এ দেওয়া এক বার্তায় হুকার জানান, তিনি শুক্রবার রাতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব আমিনা বালুচের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং এ সময় তিনি পাকিস্তান ও আফগান তালেবানের সাম্প্রতিক সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনায় সমবেদনা জানান।

তিনি আরও বলেন, "আমরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি এবং তালেবানের হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকারে পাকিস্তানকে সমর্থন করছি"।

মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে ও সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হুমকির প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের প্রধান প্রধান শহরে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, সামরিক স্থাপনা এবং বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো সন্ত্রাসী সংগঠনের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই অবস্থায় পাকিস্তানে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের মিশন তার নাগরিকদের পরামর্শ দিয়েছে এসব এলাকায়, বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে, অতিমাত্রায় সতর্কতা অবলম্বন করতে।

পাকিস্তানে থানা ও চেকপোস্টে হামলা

বিবিসি উর্দুর একটি খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার রাতে পেশোয়ারসহ প্রদেশের বিভিন্ন থানায় ও চেকপোস্টে 'সন্ত্রাসীরা' হামলা চালায়। এসব হামলায় একজন হেড কনস্টেবল এবং একজন সাধারণ নাগরিক আহত হয়েছেন।

এক বিবৃতিতে পুলিশ মুখপাত্র বলেন, খাইবার ও মাটনির বিভিন্ন এলাকায় জঙ্গিরা "হ্যান্ড গ্রেনেড ও ছোট আগ্নেয়াস্ত্র" ব্যবহার করে পুলিশের স্থাপনায় হামলা চালায়।

এছাড়া, স্থানীয় একটি সেতুতে "স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করে বিভিন্ন দিক থেকে" হামলা চালানো হয়।

একটি আউটপোস্টে হামলা হলে পুলিশ "প্রতিউত্তরে পাল্টা গুলি চালায়" এবং এ গোলাগুলি "১৫ মিনিট ধরে চলে" বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়।

খাইবার পাখতুনখাওয়া পুলিশ বলছে, এসব সবগুলো হামলাই প্রতিহত করা হয়েছে এবং জঙ্গিদের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

খাইবার পাখতুনখাওয়া পুলিশের মহাপরিদর্শক জুলফিকার হামিদ বলেন,

"এই দুষ্কৃতকারীরা শুধু ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে হামলা করতে জানে, সামনে এসে লড়াই করার সাহস তাদের নেই। পুলিশের শক্ত জবাব পেলেই তারা কাপুরুষের মতো ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যায়"।

বিবিসি উর্দু আরেকটি খবরে জানায়, পাকিস্তানে নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রপন্থি গোষ্ঠী—টিটিপি, জামাতুল আহরার এবং ইত্তেহাদুল মুজাহিদিন—দেশটিতে হামলা জোরদারের হুমকি দিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব গোষ্ঠীর নামে প্রচারিত বার্তায় পাকিস্তান–আফগানিস্তানের চলমান সংঘর্ষের উল্লেখ করে তাদের যোদ্ধাদের পাকিস্তানে হামলা তীব্র করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নিজেদের বিবৃতিতে এসব গোষ্ঠী আফগানিস্তানের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান—এ দুই দেশই এখনো এসব বিবৃতি বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

এদিকে, ডুরান্ড লাইনের কাছে তালেবানের হামলার পর পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার প্রাদেশিক সরকার সেখানে ড্রোন ওড়ানোর উপর ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দাবি তালেবানের

তালেবান সরকারের বর্ডার পুলিশের একজন মুখপাত্র বলেছেন, পাকিস্তানের "প্রতিশোধমূলক হামলার" জবাবে তালেবান বাহিনী তোরখামে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে "ভারি ক্ষয়ক্ষতি" ঘটিয়েছে।

এক বিবৃতিতে আবিদুল্লাহ ফারুকি বলেন, তাদের বাহিনী "উচ্চ মনোবল নিয়ে দেশের প্রতিরক্ষায় প্রস্তুত"।

তিনি আরও জানান, পাকিস্তানি ওই স্থাপনায় হামলার পর তোরখামের আফগান বাহিনী একটি সামরিক টাওয়ার, যার মধ্যে একটি ঘাঁটিও রয়েছে, ধ্বংস করেছে।

পাকিস্তান এখনো তালেবান সরকারের এসব বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানায়নি।