ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে হুমকি তৈরি করার মতো কিছু আছে?

    • Author, লুইস বারুচো
    • Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
  • পড়ার সময়: ৭ মিনিট

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে।

যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে বিমান ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে। যাতে মনে হচ্ছে, তেহরান তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে কোনো চুক্তিতে রাজি না হলে আমেরিকা হামলার জন্য প্রস্তুত।

১৯শে ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, 'অর্থবহ চুক্তি' না হলে 'খারাপ কিছু' ঘটবে।

তিনি আবারও বলেন, "তারা পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না, বিষয়টি খুবই সহজ... তাদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যাবে না"।

ইরান সবসময়েই পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টার কথা অস্বীকার করে আসছে। কিন্তু অনেক দেশ, একই সাথে বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ এই দাবির ওপর পুরোপুরি আস্থা পোষণ করে না।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কী অবস্থায় রয়েছে?

গত জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ইরানের কর্মসূচির অবস্থা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

যুক্তরাষ্ট্রও স্বল্প সময়ের জন্য যুদ্ধে যোগ দিয়ে তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এর মধ্যে ছিল ইসফাহানে ইরানের বৃহত্তম পারমাণবিক গবেষণা কমপ্লেক্স এবং নাতাঞ্জ ও ফোর্দোতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র। সেসব স্থানে নির্দিষ্ট আইসোটোপের অনুপাত বাড়িয়ে পারমাণবিক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়।

হামলার পর ট্রাম্প বলেন, স্থাপনাগুলো 'সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস' করা হয়েছে।

এক সপ্তাহ পর আইএইএর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেন, হামলায় গুরুতর ক্ষতি হয়েছে, তবে 'সম্পূর্ণ নয়'। এ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে কয়েক মাসের মধ্যে আবারও সমৃদ্ধকরণ শুরু হতে পারে।

আইএইএর ধারনা অনুযায়ী, ১৩ই জুন যখন ইসরায়েল বিমান হামলা শুরু করে, তখন ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বিশুদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়ামের মজুত ছিল। এর অর্থ ৯০ শতাংশ অস্ত্রমানের পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রযুক্তিগতভাবে খুব কাছাকাছি।

অক্টোবরে গ্রোসি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছিন, এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম যদি আরও সমৃদ্ধ করা হয় তাহলে তা দশটি পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট।

নভেম্বরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ 'এখন বন্ধ হয়ে গেছে'। গত মাসে তিনি ফক্স নিউজকে বলেছিলেন "হ্যাঁ, আপনারা স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি ধ্বংস করেছেন... কিন্তু প্রযুক্তিকে বোমা মেরে ধ্বংস করা যায় না, দৃঢ়তাও বোমা মেরে শেষ করা যায় না।"

জানুয়ারিতে গ্রোসি রয়টার্সকে জানান, আইএইএ ইরানের ১৩টি পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শন করতে সক্ষম হয়েছে যেগুলোতে হামলা করা হয়নি। তবে যে তিনটি মূল স্থাপনায় হয়েছে, সেখানে তারা পরিদর্শন করতে পারেনি।

তিনি বলেন, আইএইএ ইরানের অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ যাচাই করার পর সাত মাস পার হয়ে গেছে।

মজুত ইউরেনিয়ামের অবস্থান ও অবস্থা, এবং সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোর কার্যক্ষমতা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

এ পর্যায়ে কীভাবে এলো?

ইরান সরকার জোর দিয়ে দাবি করে, তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম কেবল বেসামরিক উদ্দেশ্যে।

১৯৬৮ সালে ইরান নিউক্লিয়ার নন-প্রলিফারেশন চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি অনুযায়ী চিকিৎসা, কৃষি ও জ্বালানির মতো বেসামরিক কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়, কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ।

তবে এক দশক ধরে করা আইএইএর তদন্তে দেখা গেছে, ১৯৮০র দশকের শেষ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ইরান "পারমাণবিক বিস্ফোরক ডিভাইস তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রম" চালিয়েছে।

'প্রজেক্ট আমাদ' নামে পরিচিত ওই কর্মসূচি পরে বন্ধ করা বলে জানায় আইএইএ। তবে ২০০৯ সালে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ফোর্দো স্থাপনাটি শনাক্ত করে।

২০১৫ সালে আইএইএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, "২০০৯ সালের পর পারমাণবিক বিস্ফোরক ডিভাইস তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত কার্যক্রমের বিশ্বাসযোগ্য কোনো ইঙ্গিত তাদের কাছে নেই"।

একই বছর ইরান ছয়টি বিশ্বশক্তির সঙ্গে একটি চুক্তি সই করে। এতে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে পারমাণবিক কার্যক্রমে কঠোর সীমা নির্ধারণের বিষয়ে মানতে রাজি হয়।

চুক্তিতে জ্বালানি হিসেবে সমৃদ্ধকরণ ৩.৬৭ শতাংশের মধ্যে সীমিত করা হয় এবং ফোর্দোতে সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রেখে নজরদারি চালু করা হয়।

কিন্তু ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে বের হয়ে আসে। তার যুক্তি ছিল, এই চুক্তি ইরানের বোমা তৈরির পথ বন্ধ করতে পারেনি। এরপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করা হয়।

ইরান এর জবাবে চুক্তির সীমা অতিক্রম করে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে, উন্নত সেন্ট্রিফিউজ ব্যবহার শুরু করে এবং ফোর্দোতে পুনরায় সমৃদ্ধকরণ শুরু করে।

২০২৫ সালের ১২ই জুন আইএইএর গভর্নর বোর্ড দুই দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে ইরান পারমাণবিক সমৃদ্ধ করার বিষয়ে চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এর পরদিনই ইসরায়েল বিমান হামলা শুরু করে।

ইরান কি এখন স্থাপনা তৈরির কাজ করছে?

স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নাতাঞ্জ ও ইসফাহান উভয় স্থাপনায় কাজ চলছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি (আইএসআইএস) স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে দেখেছে, ইসফাহানের টানেল কমপ্লেক্সের সব প্রবেশপথ এখন মাটি দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে এবং নতুন ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে নাতাঞ্জ সাইটে একটি নতুন ছাদও তৈরি করা হয়েছে।

আইএসআইএসের বিশ্লেষণ করা সাম্প্রতিক ছবিতে আরও দেখা যায়, ইরান মাউন্ট কুলাঙ্গ গাজ লা নামের একটি ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্সকে আরও সুরক্ষিত করছে। 'পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন' নামেও পরিচিত এই স্থানটিতে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের হামলা হয়নি।

এটি নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দক্ষিণে।

ইরান কত দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে?

অস্ত্র পর্যায়ের মানসম্পন্ন ইউরেনিয়াম উৎপাদন করা আর ব্যবহারযোগ্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা এক বিষয় নয় এবং অস্ত্র বানাতে আরও প্রযুক্তিগত ধাপ পার হতে হয়।

গত বছরের মে মাসে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আগে মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ) এক মূল্যায়নে জানায়, ইরান "সম্ভবত এক সপ্তাহেরও কম সময়ে" প্রথম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য যথেষ্ট অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম উৎপাদন করতে পারত।

তবে ইরান সত্যিই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে অস্ত্রে রূপ দেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তুলছে কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন মূল্যায়নের পার্থক্য রয়েছে।

"ইরান প্রায় নিশ্চিতভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন কার্যক্রম চালিয়েছে তাতে ইরান যদি চায় তাহলে অস্ত্র তৈরির অবস্থানে তাদেরকে আরও এগিয়ে দেবে" বলেছে ডিআইএ ।

অন্যদিকে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জুনে জানায়, তাদের কাছে এমন গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যা দেখায়, "পারমাণবিক বোমার উপযোগী অস্ত্রের অংশ তৈরির জন্য ইরানের সরকারের প্রচেষ্টায় 'জোরালো অগ্রগতি' হয়েছে"।

স্বাধীন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ ড. প্যাট্রিসিয়া লুইস বলেন, "২০০৩ সাল পর্যন্ত ইরান ওয়ারহেডের নকশা বিষয়ে কিছু সক্ষমতা অর্জন করেছিল, এরপর কর্মসূচি বন্ধ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়"।

তবে "২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি ভেঙে পড়া এবং নতুন চুক্তির বারবার আলোচনার ব্যর্থতার পর "এও সম্ভব যে ইরান আবার ওয়ারহেড তৈরির সক্ষমতা উন্নয়ন শুরু করেছে" যুক্ত করেন তিনি।

১৮ ফেব্রুয়ারি আইএইএ কি সক্রিয় অস্ত্র উন্নয়নের কোনো লক্ষণ দেখেছে কি না জানতে চাইলে গ্রোসি ফরাসি 'না' বলে উত্তর দেন সম্প্রচারমাধ্যম টিএফওয়ানকে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষের মধ্যেই "একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ইচ্ছা" তিনি দেখছেন।

পশ্চিমাদের উদ্বেগ ইরান, মধ্যপ্রাচ্যের উদ্বেগ ইসরায়েল

পশ্চিমা নেতারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের অনুমতি দেওয়া উচিত না।

২০২৫ সালের মে মাসে ট্রাম্প বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র পেলে "পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে"। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে তিনি বলেন, এতে "সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বিশ্ব তৈরি হবে, পুরোপুরি ভিন্ন দর কষাকষির বিষয় হবে" এবং ইসরায়েলের অস্তিত্ব "নেই হয়ে যাবে"।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরান "এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি" হবে।

"এটি আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াবে এবং সংকট মোকাবিলা আরও জটিল করে তুলবে, বিশেষ করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য," বলেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক থিংক ট্যাংক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট (রুসি)-এর মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ড. এইচ এ হেলিয়ার।

কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, পারমাণবিক অস্ত্র পেলে ইরান মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে পারে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সম্ভাব্য অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেতে পারে।

ইসরায়েলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে বলে জানা যায়, যদিও তারা তা স্বীকার বা অস্বীকার, কোনোটাই করে না।

হেলিয়ার যুক্তি দেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র পেলে "তাৎক্ষণিক উত্তেজনা বৃদ্ধির" কারণ না হয়ে বরং "পারস্পরিক প্রতিরোধের" পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

তার মতে, আঞ্চলিক বেশিরভাগ পক্ষের দৃষ্টিতে "ইসরায়েলের শক্তিই এখন বেশি তাৎক্ষণিক ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করার মতো নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়, কোনো কাল্পনিক ইরানি বোমা নয়"।

তবে তিনি সতর্ক করেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরানের বড় ঝুঁকি হবে "সংঘাতের পরিস্থিতিতে ভুল হিসেবনিকেশ"।