আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনায় 'সমর্পণের' বদলে কেন সংঘাতের পথ বেছে নিতে পারে ইরান
- Author, আমির আজিমি
- Role, বিবিসি নিউজ পার্সিয়ান
- পড়ার সময়: ৭ মিনিট
মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি অব্যাহতভাবে বাড়ছে—এটি এখন আর শুধু সংকেত নয়, বরং প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরানি জলসীমার কাছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস এব্রাহাম লিংকন-এর স্ট্রাইক গ্রুপের উপস্থিত হওয়াকেই একটি গুরুতর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আরেকটি বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড—যাকে সর্বশেষ জিব্রাল্টার প্রণালীর কাছে দেখা গিয়েছিল—সম্ভাব্য অভিযানের সমর্থনে পূর্বমুখী হয়ে এগোচ্ছে।
অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ও জনবলও ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে, যার ফলে এই ধারণা আরো জোরালো হয় যে ওয়াশিংটন কয়েক স্তরের সামরিক বিকল্প সাজাচ্ছে।
এ ধরনের মোতায়েন কূটনীতিতে চাপ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অচলাবস্থায় পৌঁছেছে—যা উভয় পক্ষই অবস্থান না বদলালে সামরিক পদক্ষেপে রূপ নিতে পারে।
এতে একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে: বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক মিত্রের মুখোমুখি হয়েও ইরানি নেতৃত্ব অন্তত প্রকাশ্যে এত দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছে কেন?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে আলোচনার জন্য ওয়াশিংটনের উত্থাপিত শর্তগুলোতে।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
মার্কিন শর্তকে আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখা হচ্ছে
তেহরানের দৃষ্টিতে, এসব দাবি কোনো আলোচনার শর্ত নয়—বরং আত্মসমর্পণের সমতুল্য।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে–– ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, ব্যালিস্টিক বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা এমনভাবে কমানো যাতে সেগুলো আর ইসরায়েলের জন্য হুমকি না হয়, ওই অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভাষায়, নিজের নাগরিকদের প্রতি ইরানের আচরণ পরিবর্তন করা।
ইরানি নেতৃত্বের জন্য এসব বিষয় গৌণ নয়। এগুলো তাদের দৃষ্টিতে দেশের নিরাপত্তা স্থাপত্যের কেন্দ্রীয় উপাদান।
শক্তিশালী আন্তর্জাতিক মিত্র না থাকার কারণে তেহরান বহু বছর ধরে তাদের তথাকথিত "প্রতিরোধের অক্ষ" গড়ে তুলেছে।
এটি হলো মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর একটি নেটওয়ার্ক, যার উদ্দেশ্য ইরানের সীমানা থেকে সংঘাত দূরে রাখা এবং চাপকে ইসরায়েলের দিকে ঠেলে দেওয়া।
তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মূলত একটি বয়সী বিমানবাহিনী এবং উন্নত সামরিক প্রযুক্তিতে সীমিত প্রবেশাধিকারের বিকল্প হিসেবে কাজ করেছে।
আনুষ্ঠানিকভাবে শান্তিপূর্ণ বলে বর্ণিত হলেও, এর পারমাণবিক কর্মসূচিকে ব্যাপকভাবে প্রতিরোধমূলক মূল্যবোধের অধিকারী হিসেবে দেখা হয়।
অস্ত্রে রূপান্তরিত না হলেও, সমৃদ্ধকরণ চক্রের দক্ষতার ফলে- কৌশলবিদদের ভাষায় 'থ্রেশহোল্ড ক্যাপাবিলিটি' বা নতুন কিছু তৈরি হওয়ার সক্ষমতা তৈরি করে। অর্থাৎ এমন অবকাঠামো গড়ে ওঠে যা সামরিক ব্যবহারের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই যথেষ্ট। এই সুপ্ত সক্ষমতাই চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
এই উপাদানগুলো সরিয়ে ফেললে তেহরানের দৃষ্টিতে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতার ভিত্তিই ভেঙে পড়বে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জন্য ঝুঁকি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনির দৃষ্টিতে এমন সব শর্ত মেনে নেওয়া হয়তো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সীমিত যুদ্ধের ঝুঁকি নেওয়ার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক বলে মনে হতে পারে।
ব্যয়বহুল হলেও সামরিক সংঘাতকে হয়তো তারা টিকে থাকার মতো মনে করেন—কিন্তু সম্পূর্ণ কৌশলগত পশ্চাদপসরণকে নয়।
তবে এই হিসাব-নিকাশের মধ্যে নিহিত ঝুঁকিগুলো গভীর—এবং শুধু ইরানের জন্যই নয়।
যেকোনো মার্কিন অভিযান শুরুর প্রথম ধাপেই শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। খামেনি নিহত হলে শুধু তিন দশকেরও বেশি সময়ের শাসনের অবসানই হবে না, বরং সংবেদনশীল সময়ে নেতৃত্বের উত্তরাধিকারকেও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং অন্যান্য নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে হামলা সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম মারাত্মক দমন-পীড়নের পর পুনর্গঠিত রাষ্ট্রীয় যন্ত্রকেও দুর্বল করে দিতে পারে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাস্তায় নেমে আসা বিক্ষোভকারীরা—যারা অভূতপূর্ব শক্তি প্রদর্শনের মুখে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন—এখনো গভীরভাবে ক্ষুব্ধ। রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রে হঠাৎ কোনো বড় ধাক্কা সৃষ্টি হলে দেশের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য অনিশ্চিতভাবে বদলে যেতে পারে।
তেহরান হয়তো মনে করতে পারে যে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য শুধু ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু যুদ্ধ সাধারণত প্রাথমিক অনুমানের ভিত্তিতে এগোয় না। লক্ষ্য, সময়সীমা বা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভুল হিসাব দ্রুতই সংঘাত বিস্তৃত করতে পারে।
অর্থনৈতিক চাপ এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রাস্ফীতি এবং ক্রয়ক্ষমতার পতনে ইতোমধ্যেই সংকটে থাকা ইরানের অর্থনীতি নতুন ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাবে।
তেলের রপ্তানিতে বাধা বা অবকাঠামোতে ক্ষতি জনঅসন্তোষকে আরও তীব্র করবে—যা দমন করা হয়েছে, সমাধান নয়।
এই প্রেক্ষাপটে দৃঢ় অবস্থান তেহরানের জন্য বহু উদ্দেশ্য সাধন করে। এটি বাইরের দিকে সংকল্প প্রদর্শন করে এবং ভেতরের দিকে শক্তির উপস্থিতি দেখায়। তবে এর ফলে সমঝোতার সুযোগও সংকুচিত হয়।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:
যুক্তরাষ্ট্রের ঝুঁকি
ওয়াশিংটনের ঝুঁকিও আসলে কম নয়।
তাত্ত্বিকভাবে বললে, উত্তেজনা বাড়লে সশস্ত্র বাহিনী প্রেসিডেন্টের লক্ষ্য পূরণের মতো সক্ষমতা রাখে। কিন্তু যুদ্ধ কাগজে হয় না—এগুলো ভুল হিসাব, উত্তেজনার বিস্তার এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির মাধ্যমে গঠিত হয়।
ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক ১২ দিনের যুদ্ধ ইরানের কমান্ড বা নেতৃত্বের কাঠামো এবং সামরিক অবকাঠামোর দুর্বলতা উন্মোচিত করেছে। একইসঙ্গে চাপের মুখে আঘাত সহ্য করা, পুনর্গঠন এবং প্রতিক্রিয়া জানানোর বিষয়ে শিক্ষাও দিয়েছে।
বৃহত্তর সংঘাত উভয় পক্ষের অপ্রত্যাশিত ফল বয়ে আনতে পারে।
তেহরানে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ দুর্বল হয়ে গেলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থিতিশীলতা বা পশ্চিমা স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য বয়ে আনবে না। ক্ষমতার শূন্যতা নতুন, খণ্ডিত বা আরও কট্টর প্রভাবকেন্দ্র তৈরি করতে পারে—যা ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের জন্য অনাকাঙিক্ষত।
আয়াতোল্লাহ খামেনি এখন খুব কম অনুকূল বিকল্পের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। ওয়াশিংটনের শর্ত মেনে নিলে ইরানের প্রতিরোধমূলক কৌশল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি আছে। আবার প্রত্যাখ্যান করলে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সময়ে সংঘাতের আশঙ্কা বেড়ে যায়।
তিনি যেটিকে 'সবচেয়ে খারাপ' বা কৌশলগত আত্মসমর্পণ বলে মনে করবেন এবং 'সবচেয়ে খারাপের মধ্যে সেরা' বা সীমিত কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য যুদ্ধ—এর মধ্যে তেহরান অন্তত প্রকাশ্যে পরের বিকল্পটির দিকেই ঝুঁকছে বলে মনে হচ্ছে।