আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ইরানে হাজারো মৃত্যুর কথা 'স্বীকার' করে ট্রাম্পকে 'অপরাধী' বললেন খামেনি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সময় তার দেশে হওয়া "হতাহতের ঘটনা, ক্ষয়ক্ষতি ও অপপ্রচারের" জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়ী করেছেন।
শনিবার এক ভাষণে খামেনি স্বীকার করেন যে সাম্প্রতিক অস্থিরতায় হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে। তিনি বলেন, এর মধ্যে "কিছু মানুষ অমানবিক ও নৃশংসভাবে" মারা গেছে। তবে এসব মৃত্যুর জন্য তিনি 'রাষ্ট্রদ্রোহী'দের দায়ী করেছেন।
খামেনি আরও বলেন, ইরান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একজন 'অপরাধী' বলে মনে করে এবং সাম্প্রতিক অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে "জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে"।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের "বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার" আহ্বান জানান এবং নিরাপত্তা বাহিনী যদি তাদের হত্যা করলে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইরানি মানবাধিকার সংগঠন ইরানিয়ান হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি বা এইচআরএএনএ জানায়, ইরানে বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত তিন হাজার ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দেশকে যুদ্ধে ঠেলে দেবো না, তবে অপরাধীদেরও রেহাই দেবো না
খামেনি তার এক দল সমর্থকের সঙ্গে দেখা করার সময় বলেছেন, "আমরা দেশকে যুদ্ধে ঠেলে দেবো না, কিন্তু দেশের ভেতরের অপরাধীদের রেহাই দেব না; আন্তর্জাতিক অপরাধীরাও ছাড় পাবে না।"
তিনি বলেন, "আমি দৃঢ়ভাবে বলছি, সাম্প্রতিক এই ফিতনার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানকে গ্রাস করা।" আর "ইসলামী বিপ্লবের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র সেই ক্ষমতা ফিরিয়ে নিতে চায়, যা তারা জনগণের মাধ্যমে ও ইমামের নেতৃত্বে হারিয়েছিল।"
খামেনি বলেন, "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সকল নীতি হচ্ছে ইরানের মতো একটি স্বাধীন দেশকে সহ্য না করা।"
"পশ্চিমা গণমাধ্যমকর্মীরা অতীতে রাষ্ট্রদ্রোহের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করেছিল, কিন্তু এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেই রাষ্ট্রদ্রোহীদের উৎসাহিত করেছেন," উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, "এই সাম্প্রতিক ফিতনায় যারা আগুন দিয়েছে, পুড়িয়ে দিয়েছে, দাঙ্গা সৃষ্টি করেছে এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তাদের ইরানি জনগণের প্রতিনিধি বলা হয়েছে। এটি ইরানি জাতির বিরুদ্ধে একটি বড় অপবাদ। এগুলো অপরাধ।"
তিনি জোর দিয়ে বলেন, "আমেরিকা ও জায়নবাদী শাসন, দুই পক্ষই অপরাধী।"
"এই আমেরিকান ও জায়নবাদী রাষ্ট্রদ্রোহের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সত্যিকার অর্থে তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং শত্রুর বিপুল ব্যয়ে তৈরি করা এই ষড়যন্ত্র পুরোপুরি দমন করেছেন। কর্মকর্তারাও সহযোগিতা করেছেন এবং ইরানি জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিষয়টির সমাপ্তি ঘটিয়েছে।"
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
উত্তেজনা থামেনি
এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নেতাদের "৮০০ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড বাতিল করার জন্য ধন্যবাদ" জানিয়েছিলেন। সেই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তেহরানের প্রসিকিউটর আলী সালেহি বলেছেন, "ট্রাম্প সবসময় আজেবাজে এবং অকারণে অনেক কথা বলে, এটা একেবারেই ভুল।"
আলী সালেহি আরও বলেন, "আমাদের পদক্ষেপ হবে কঠোর, প্রতিরোধমূলক এবং দ্রুত।"
"এই মুহূর্তে আমাদের অনেক মামলাই অভিযোগপত্র জারি করে আদালতে পাঠানো হয়েছে" তিনি যোগ করেন।
আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তরের ফারসি ভাষার অ্যাকাউন্ট ইরানের পক্ষ থেকে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার সম্ভাবনা নিয়ে একটি বার্তা প্রকাশ করেছে।
বার্তায় বলা হয়েছে, "ইসলামী প্রজাতন্ত্র যদি যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের ওপর হামলা চালায়, তাহলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেমন বলেছেন, সব বিকল্প টেবিলে আছে এবং তারা অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হবে।"
বার্তার আরেক অংশে সতর্ক করা হয়, "আগেও বলেছি, আবারও বলছি; প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে খেলবেন না।"
এবার খামেনির সবশেষ বক্তব্যের বিষয়ে এখনো প্রতিক্রিয়া জানাননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ নিয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিবিসি।
বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তাকে জানানো হয়েছে যে "ইরানে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে"। তবে তিনি যোগ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা তিনি পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
এই মন্তব্য আসে এমন এক সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য দু'দেশই কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি থেকে তাদের কর্মীদের সংখ্যা কমিয়েছে।
বিবিসির যুক্তরাষ্ট্র অংশীদার সিবিএসকে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই আংশিক মার্কিন প্রত্যাহার ছিল একটি 'সতর্কতামূলক ব্যবস্থা'।
এছাড়া ইরানের বিপ্লবী গার্ডকে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সভাপতি রবার্টা মেটসোলা।
ইরানের জনগণের সপক্ষে বার্তা হিসেবে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, "এই পদক্ষেপ বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দায়মুক্তি ও জবাবদিহিতাবিহীন কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করবে, তাদের আর্থিক প্রবাহ ব্যাহত করবে, তাদের কার্যক্রম পরিচালনার কৌশল ও পদ্ধতিকে ভেঙে দেবে। আর এটি জোর দিয়ে জানিয়ে দেবে যে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর জন্য আর কোনো নিরাপদ আশ্রয় থাকবে না।"
বিক্ষোভ ঘিরে সবশেষ
ইরান-ইরাক সীমান্ত খোলা রয়েছে এবং ইরানের অনেকে সে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করছেন।
সেখানকার বেশ কয়েকজন বিবিসি পার্সিয়ান সার্ভিসকে জানিয়েছেন যে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে, অন্তত এই সপ্তাহ পর্যন্ত। তারা জানিয়েছে গত শুক্রবার তার শহরে নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভ দমন করেছে, কিন্তু অন্যত্রও বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।
ইরান সরকার বিক্ষোভকে তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছে। বিক্ষোভের উপর দমন-পীড়নের ফলে ফল পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, এখন বিক্ষোভকারীরা গুলিবিদ্ধ বা গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে ঘরের ভেতরেই অবস্থান করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের গিলান প্রদেশে পুলিশের অভিযানে ১,৫০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারদের মধ্যে ৫০ জনকে বিক্ষোভের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বর্তমান বিক্ষোভে, ইরানের সরকারি কর্মকর্তারা বিক্ষোভকারী এবং 'দাঙ্গাবাজ' এর মধ্যে পার্থক্য করার প্রয়োজনীয়তার উপর আগের চেয়েও বেশি জোর দিয়েছেন, যদিও 'দাঙ্গাবাজ' শব্দটি এমন একটি শব্দ যা ইরান সরকার অতীতের দেশব্যাপী বিক্ষোভে নির্বিচারে বারবার বিক্ষোভকারীদের জন্য প্রয়োগ করেছে।
অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ইরানের বিক্ষোভকারিদের পক্ষে প্রতিবাদ কর্মসূচি দেখা গেছে। আবার অনেক জায়গায় ইরান সরকারের পক্ষে ও যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষেও প্রতিবাদ দেখা গেছে।
লন্ডনে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দূতাবাসের সামনে ইরানিদের একটি সমাবেশ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
লন্ডন পুলিশ জানিয়েছে, দূতাবাসের সামনে ইরানিদের ওই সমাবেশে একজন বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং একাধিক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
১৬ই জানুয়ারি সন্ধ্যায় ব্রিটেনে বসবাসকারী একদল ইরানি ইরানে চলমান দেশজুড়ে বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানাতে লন্ডনে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দূতাবাসের সামনে জড়ো হন। লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ তাদের বিবৃতিতে জানায়, এক বিক্ষোভকারী "অবৈধভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন এলাকায় প্রবেশ করে, কয়েকটি বারান্দা পার হয়ে দূতাবাস ভবনের ছাদে ওঠে এবং সেখান থেকে পতাকা নামিয়ে ফেলে"।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিসহ ১৪ জনকে সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, কূটনৈতিক স্থাপনায় অননুমোদিত প্রবেশ এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় পুলিশ সদস্যদের দিকে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করা হয়, এতে একাধিক পুলিশ আহত হন।
এদিকে, বিমান সংস্থাগুলিকে ইরানের আকাশসীমা ব্যবহার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বেসামরিক বিমান চলাচলের ঝুঁকি বিবেচনায় ইরানের আকাশসীমায় সব উচ্চতায় বিমান চলাচল না করতে সতর্ক করা হয়েছে।
ইরানের এই অস্থিরতা শুরু হয় গত ২৮ ডিসেম্বর, অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে।
এর পর থেকে এসব বিক্ষোভ ধীরে ধীরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার শাসনের অবসানের দাবিতে রূপ নেয়।
ইরান সরকার এসব বিক্ষোভকে ইরানের শত্রুদের সমর্থিত 'দাঙ্গা' বলে অভিহিত করেছে।
বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ করা হয়েছে এবং ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অস্থিরতার খবর কম এসেছে, কিন্তু ইন্টারনেট অ্যাক্সেস এখনও সীমিত থাকায় পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র এখনো অস্পষ্ট।