নির্বাচন ছাড়া সংসদের মেয়াদ বৃদ্ধি - ঢাবি অধ্যাপকের বক্তব্যে তোলপাড়

সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মানব বন্ধনে বক্তব্য দিচ্ছেন সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের আ ক ম জামাল উদ্দিন।
ছবির ক্যাপশান, সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মানব বন্ধনে বক্তব্য দিচ্ছেন সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের আ ক ম জামাল উদ্দিন।

নির্বাচন ছাড়াই বর্তমান সংসদের মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটি বেশ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন সোমবার বলেছেন, বর্তমান সংসদ ও সরকারের মেয়াদ আরো পাঁচ বছর বাড়ানো প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মানব বন্ধনে তিনি এই মন্তব্য করেছেন।

অধ্যাপক জামাল উদ্দিন এমন এক সময়ে এই বক্তব্য দিয়েছেন, যখন বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন 'অবাধ ও সুষ্ঠু' করার জন্য আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের 'চাপ' বাড়ছে। একই সাথে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তাদের সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মহলে অধ্যাপক জামাল উদ্দিন আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। প্রশ্ন হচ্ছে, এখন কেন এরকম একটি দাবি তুললেন শিক্ষক জামাল উদ্দিন?

‘’একটা সংসদ বা সরকার গঠিত হয় পাঁচ বছরের জন্য। যেহেতু করোনা মহামারিতে আমাদের একটা বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট হয়েছে, দুই বছর আমরা কাজ করতে পারিনি। অর্থনৈতিক সংকট কিন্তু আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি, দুই বছর পার্লামেন্টে কোন আলোচনা হয়নি,‘’ বিবিসি বাংলাকে বলেন অধ্যাপক জামাল উদ্দিন।

‘’সেই বিবেচনায় আমি বলেছি, যদি বিরোধী দলগুলোর সাথে ঐক্যমত্য হয়, এটাকে একটা দুর্যোগ পরিস্থিতি বিবেচনা করে যদি সংসদের মেয়াদ বাড়িয়ে নেয়া যায় কিনা। সেখানে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা কী হবে, সেটা আলোচনা করে ঠিক করা হবে।’’

নির্বাচনের সাথে মানুষের ভোটাধিকারের বিষয়টি জড়িত। নির্বাচন না হলে জনগণের ভোটের অধিকার কীভাবে রক্ষা হবে?

বিবিসি বাংলার এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন, ‘’জনগণের ভোটের অধিকারের বিষয়টা তো আমরা অস্বীকার করছি না। অধিকার থাকবে। কিন্তু পার্লামেন্টের সদস্যরা সবাই তো জনগণের প্রতিনিধিত্বই তো করে। তাহলে তারা যদি চায়, সেটা তো জনগণের কথাই হবে।‘’

ভোটের পরিবর্তে সংসদ সদস্যদের ভোটে সংসদ এবং সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়িয়ে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন একজন শিক্ষক, যদিও তার সাথে একমত নয় দল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভোটের পরিবর্তে সংসদ সদস্যদের ভোটে সংসদ এবং সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়িয়ে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন একজন শিক্ষক, যদিও তার সাথে একমত নয় দল

এই বক্তব্যের গুরুত্ব আছে?

অধ্যাপক জামাল উদ্দিনের এই বক্তব্যের পরেই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে এ নিয়ে হাস্যরস করতে শুরু করেছেন, আবার অনেকে এই বক্তব্যকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড ফেলো অধ্যাপক আলী রীয়াজ একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, এই বক্তব্যকে হেলাফেলা মনে করার কোন কারণ নেই এবং তিনি কতটা পরিচিতি ব্যক্তি সেটাও বিবেচ্য বিষয় নয়।

অধ্যাপক রীয়াজের মতে, দুটি কারণে এই বক্তব্য আমাদের মনোযোগ দাবি করে। প্রথমত ঐতিহাসিক, দ্বিতীয়ত হচ্ছে এর উদ্দেশ্য।‘

"১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি তৎকালীন জাতীয় সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশাল ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে তৎকালীন সংসদের মেয়াদ আরও পাঁচ বছরের জন্য বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল," লিখেছেন অধ্যাপক রীয়াজ।

দ্বিতীয় কারণ হিসাবে মি. রীয়াজ লিখেছেন, রসিকতা করে হলেও অনেকেই লিখছেন এই প্রস্তাবটা খারাপ নয়, এতে করে অনেক টাকা বেঁচে যাবে সেহেতু নির্বাচন করার আর দরকার নেই। তাঁদের অনেকেই যে এই মন্তব্য করছেন গত দুই নির্বাচনে নির্বাচনের নামে যে প্রহসন হয়েছে সেটা বিবেচনা করে।"

"এটি ক্ষোভের এক ধরণের বহিঃপ্রকাশও বটে। এই ধরণের কথাবার্তা নির্বাচনকে ছেলেখেলায় পরিণত করার চেষ্টাকেই সাহায্য করে। এগুলো হচ্ছে বিরাজনীতিকরণের অংশ।‘’

লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘’বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তো এখন সরাসরি রাজনীতি করে, তার বক্তব্য পুরোপুরি রাজনৈতিক। এর মাধ্যমে তিনি তার আকাঙ্ক্ষাই ব্যক্ত করেছেন। তিনি হয়তো ধরে নিয়েছেন, তারাই তো ক্ষমতায় থাকবে, তাহলে শুধু শুধু নির্বাচন করে লাভ কী?’’

তবে তিনি বলছেন, এই ধরনের বক্তব্য বা আলোচনা একেবারে নতুন নয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেও আওয়ামী লীগের নেতারা বলেছেন, দেশের উন্নয়নের জন্য আওয়ামী লীগকে আরও দুই দফা থাকতে হবে।

‘’এখন বিদেশিদের নড়াচড়ায় ক্ষমতাসীনরা অস্বস্তি বোধ করে। তাদের অনুগতরা জানে, এই সরকার না থাকলে তারাও বিপদে পড়ে যাবে। ফলে তাদেরও গোষ্ঠীগত স্বার্থ আছে। তিনি আসলে তার মনের কথাটা বেফাঁস বলে ফেলেছেন,’’ বলছেন বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ।

কিন্তু শুধু তার এই বক্তব্যে নির্বাচন নিয়ে কোন প্রভাব তৈরি করবে না বলেই তিনি মনে করেন।

শিক্ষক সমিতি ও আওয়ামী লীগের বক্তব্য

অধ্যাপক জামাল উদ্দিন যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির অনুষ্ঠানে এই বক্তব্য দিয়েছেন, সেজন্য তার এই বক্তব্যের সাথে শিক্ষক সমিতি একমত কি না?

জানতে চাওয়া হলে সভাপতি মোঃ নিজামুল হক ভূঁইয়া বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘’ড. জামাল উদ্দিন যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা তার ব্যক্তিগত মতামত। শিক্ষক সমিতি তার সাথে একমত নয়।"

শিক্ষক সমিতির নেতারা বলেছেন, এরকম বক্তব্যের বিষয়ে সমিতির নেতাদের সঙ্গে আগে কোন আলোচনা করেননি ড. জামাল উদ্দিন।

আর আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়াম কমিটির সদস্য সাজাহান খান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এই বক্তব্যের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোন সম্পর্ক নেই।

‘’এ ধরনের কথা বলার অধিকার কারও নেই, এটা আমরা মনেও করি না। আওয়ামী লীগ সংবিধানের বাইরে কোন কিছু চিন্তা করে না, করবেও না,’’ তিনি বলছেন।

ব্যাপক সমালোচনা হলেও অধ্যাপক জামাল উদ্দিন তার বক্তব্যে অনড় আছেন। এজন্য তিনি নানা 'যুক্তি ও ব্যাখ্যা' তুলে ধরছেন।

তিনি মনে করেন, নির্বাচন আয়োজন করা হলে সরকার দেড় হাজার কোটি টাকা খরচ করবে। প্রার্থীরাও হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করবে। নির্বাচনে সহিংসতা হলে প্রাণহানি হবে,মামলা মোকদ্দমায় লোকজন জেলে থাকবে, সেটাও অর্থনীতির ক্ষতি।

"তাই আমি বলেছি, নির্বাচন আয়োজনের বদলে সংসদের মাধ্যমেই সংসদ আর সরকারের মেয়াদ আরও অন্তত পাঁচ বছর বাড়িয়ে নেয়া ভালো,‘’ বিবিসি বাংলাকে বলেন অধ্যাপক জামাল উদ্দিন।