ইয়াবা, আইসের মতো মাদকের পাচার কেন ঠেকানো যাচ্ছে না?

ছবির উৎস, AFP
বাংলাদেশে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি মাদকের চালান আটক করেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। জব্দ করা মাদকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় রয়েছে ইয়াবা। বিভিন্ন সময়ে পাচারের সঙ্গে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কথাও অনেক সময় উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক চক্র একসময় বাংলাদেশকে মাদকের করিডোর হিসেবে ব্যবহার করলেও এই ব্যবসায় বাণিজ্যিক লাভের যে সুযোগ আছে তাতে অভ্যন্তরীণ বাজারও তৈরি হয়েছে। ফলে মাদকবিরোধী অভিযান চললেও থামছে না মাদক পাচারের ঘটনা।
অভিনব কৌশলে মাদক পাচার
চলতি মাসেই যে কয়েকটি মাদকের চালান আটকের ঘটনা ঘটেছে তার বেশ কয়েকটিতে পাচারকারীদের অভিনব কৌশল গ্রহণের সামনে এসেছে। দোকানদার সেজে, সবজি মাছ বা অন্য যে কোনও পণ্যের ভেতরে করে এমনকি পেটের ভেতরে করেও ইয়াবা পাচারের ঝুঁকি নেন ব্যবসায়ীরা।
“সামান্য বিনিয়োগে বিপুল পরিমাণ আর্থিক লাভ এই ব্যবসা থেকে আসে,মাদক ব্যবসায়ীরা তাই জীবন-মৃত্যুকে বাজি রেখে কাজটা করছেন” – বলে উল্লেখ করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক সঞ্জয় কুমার চৌধুরী।
শনিবার সকালে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১ হাজার ৬৭২ ইয়াবা বড়িসহ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), সেই ব্যক্তি পেটের ভেতরে ইয়াবা বড়িগুলো নিয়ে বিমানে করে কক্সবাজার থেকে ফিরেছিলেন।
এছাড়া গত শুক্রবার রাতে কক্সবাজারে ২০ হাজার ইয়াবাসহ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এর একজন এসআই ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করে মাদকদ্র্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
চলতি বছরেই বিভিন্ন সময় কক্সবাজার, টেকনাফসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ইয়াবা জব্দ করেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রকাশিত সবশেষ হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরের মার্চ মাসেই প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৫০৯পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে।
আর বাংলাদেশের ২০২২ সালের বার্ষিক ড্রাগ রিপোর্ট অনুযায়ী, সব সংস্থা মিলে গত ৫ বছরে প্রায় ২১ কোটি ৬৬ লাখেরও বেশি ইয়াবা জব্দ করেছে।
অন্যতম রুট টেকনাফ
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ইয়াবার চালান ঠেকাতে সরকারি নানা পদক্ষেপ সত্ত্বেও ঠেকানো যাচ্ছে না এই মাদকের বিস্তার। এখন ইয়াবার পাশাপাশি ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের মতো ভয়ঙ্কর মাদকও আসছে বাংলাদেশে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক চক্র একসময় বাংলাদেশকে মাদকের করিডোর হিসেবে ব্যবহার করলেও এই ব্যবসায় বাণিজ্যিক লাভের যে সুযোগ আছে তাতে অভ্যন্তরীণ বাজারও তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে ইয়াবা-আইসের মতো মাদক প্রবেশের অন্যতম রুট হলো কক্সবাজার ও মিয়ানমার সীমান্ত ঘেঁষা টেকনাফ রুট।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক গবেষক ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এম ইমদাদুল হক বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন – আশির দশকে ভারত থেকে অবৈধভাবে আসা ফেনসিডিলের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছিল মাদকসেবীদের কাছে। এরপর কিছু সময় হেরোইনে আসক্ত হয় মাদকসেবীরা। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই জায়গাটা দখল করে নিয়েছে মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা।
বিবিসিকে তিনি বলেন-“ স্বাধীনতার আগে থেকে টেকনাফ অঞ্চল মাদক চোরাচালানের অন্যতম রুট। আশির দশকে হেরোইন চোরাচালানের রুট হিসেবে এটা বেশ ব্যবহার করতো চোরাকারবারিরা। আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর জন্য বাংলাদেশকে একটা করিডোর হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে দৃশ্যপট পাল্টে গেছে”।
“মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে এখন ইয়াবা পাচারের অন্যতম রুট টেকনাফের রুট”- বলেন অধ্যাপক ইমদাদুল হক।
২০০৬ সাল থেকে বাংলাদেশে যেভাবে মাদক কারবার বেড়েছে তাতে দেশের ভেতরে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন “মাদকসেবীদের প্রথম পছন্দই এখন ইয়াবা”।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে গত পাঁচ বছরে শুধুমাত্র কক্সবাজার জেলা থেকেই আট কোটির বেশি ইয়ারা উদ্ধার করা হয়েছে। আর গত দুই বছরে এই জেলা থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার আইস উদ্ধার করা হয়েছে।
এই টেকনাফ রুট দিয়ে এলএসডি এবং আইসের মতো মাদক আসছে। যেটা বেশ ‘অ্যালার্মিং’ বলে উল্লেখ করছেন মি. হক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থায় গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের কাছাকাছি হওয়ায় সহজেই এই পথ বেছে নিতে পারছেন মাদক ব্যবসায়ীরা। তারা রাতের আঁধারে বা ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে বিভিন্ন সময় এই রুট বেছে নিচ্ছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা
টেকনাফের সীমান্ত ঘেঁষা মিয়ানমারে তৈরি বেশ কিছু ইয়াবা কারখানা থেকে ইয়াবার চালানগুলো যে বাংলাদেশে এসে ঢুকছে এ কথা বারবার মনে করিয়ে দেন বিশেষজ্ঞরা।
"মিয়ানমার এবং বাংলাদেশি সংঘবদ্ধ মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন উপায়ে ইয়াবার চালান মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসছে এবং এখান থেকে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার মতো দেশে সেগুলো পাচার করা হচ্ছে। অনেক জায়গায় রাতের আঁধারে হয়তো তারা সীমান্ত অতিক্রম করছে, তখন হয়তো তাদের আটকানো যাচ্ছে না"- বলছিলেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক সঞ্জয় কুমার চৌধুরী।
সম্প্রতি জাতিসংঘ জানিয়েছে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে আফিমের উৎপাদন নয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে যে অনেক মাদক প্রবেশ করে বলে এরকম অভিযোগ কর্মকর্তারা বরাবরই করে থাকেন।
মাদক পাচারের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জড়িত থাকার খবরও বিভিন্ন সময় উঠে আসছে।
কক্সবাজারের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এর অধিনায়ক মো: আমির জাফর বলছিলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো থাকার কারণে এখন মাদক পাচারের পরিধিও বেড়েছে কক্সবাজার অঞ্চলে।
“মিয়ানমারের যেখান থেকে মূলত ইয়াবার চালান এসে ঢুকে রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল সেই একই জায়গায়। পথঘাট চেনা। সেটা তাদের আনার জন্য সহজ। যেহেতু সংখ্যায় প্রায় দশ লাখের বেশি মানুষ বাস করছে”।
যেসব চালেঞ্জ তারা মোকাবেলা করছেন তার মধ্যে অন্যতম হলো ইয়াবা, আইসের মতো মাদক পাচার ঠেকানো।
জনবহুল বাংলাদেশে মাদকের যে বাজার আগেই তৈরি হয়েছিল তাতে রোহিঙ্গা গোষ্ঠী জড়িত হওয়ায় 'জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে ঘি ঢালার মতো পরিস্থিতি' তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার চৌধুরী।
‘কম পরিশ্রমে বেশি লাভ’
ইয়াবার মতো মাদক ব্যবসায় বাণিজ্যিক লাভের যে সুযোগ রয়েছে সেই কারণে এর নিয়ন্ত্রণ সহজে সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
অধ্যাপক ইমদাদুল হক বলছেন, “ইয়াবা, আইসের মতো মাদক পাচার ঠেকাতে না পারার অন্যতম কারণ হলো বড় ধরনের বাণিজ্যিক লাভের যে সুযোগ এই লোভটা সংবরণ করতে পারছে না ব্যবসায়ীরা। স্থানীয়ভাবে ব্যবসায়ী, চোরাকারবারী, বিনিয়োগকারীর সংখ্যা যে বাড়ছে এর কারণ আন্তর্জাতিক চক্রও এখানে কাজ করছে”।
তার মতে, আর্থিক লাভের কথা ভেবেই বেপরোয়াভবে এই ব্যবসার কাজটি পরিচালনা করে যাচ্ছে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চক্র।
অনেকটা একই ধরনের মত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক সঞ্জয় কুমার চৌধুরীর। তার ভাষ্য অনুযায়ী “যারা ইয়াবার ব্যবসা করেন তারা অতি কম পরিশ্রমে অনেক টাকা লাভ করতে পারেন। প্রতি পিস ইয়াবার দাম ২০০ টাকা যদি হয় তাহলে এর বাজারটা কত বড় সেটা নিশ্চয়ই আঁচ করা যায়। এজন্য মানুষ ঝুঁকি নিয়ে কাজটা করে”।
এছাড়া সীমান্ত এলাকায় যারা মাদকের পাচার রোধে কাজ করে তারাও লোভে পড়েই এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে যায় বলে মনে করেন মি. চৌধুরী।
তবে অধ্যাপক ইমদাদুল হকের মনে করেন, ২০১৮ সালের মে মাসে বাংলাদেশের সরকার যে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেছিল সেই সময়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততাও বেড়ে যায়।
“মাদকবিরোধী যে অভিযান চলেছিল ফিলিপিন্সের অনুকরণে- যাদের দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা হবে ভাবা হয়েছিল তাদেরই একটা অংশ বেনেফিশিয়ারিতেপরিণত হয়। অর্থাৎ এই ব্যবসায় যে লাভ সেই সুবিধাটা তারা গ্রহণ করে। ফলশ্রুতিতে ওসি প্রদীপের মতো মানুষের সম্পৃক্ততাও তখন বেড়ে গিয়েছে। বাহিনীর অনেককে ব্যবসার প্রমোটারে পরিণত হতে দেখেছি” বলেন মি. হক।
এছাড়া মাদক পাচারের অভিযোগে বড় কোনও শাস্তিও হতে দেখেনি ব্যবসায়ীরা এটাও পাচার না ঠেকাতে পারার অন্যতম একটি কারণ বলে মনে করেন ইমদাদুল হক।
তার মতে, আটককৃতরা বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্নভাবে পার পেয়ে যাওয়ায় তারা উৎসাহী হয় এই ব্যবসা চালিয়ে যেতে।
“আন্তর্জাতিক চক্র তাদের নেটওয়ার্ক চেইন, বিভিন্ন পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে পরিবেশটা তৈরি করেছে, দেশে একটা চাহিদা তৈরি করেছে- এখন এই ব্যবসার সুযোগটা তারা নিচ্ছে”।
সার্বিকভাবে জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে এই মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করেন মি. হক।
অন্যদিকে সঞ্জয় কুমার চৌধুরীর মতে – মাদক পাচার ঠেকাতে প্রত্যেকটা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, আলাদাভাবে কাজ করলে মাদকের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।
‘সীমান্তে কীভাবে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় তা নিয়ে যুগপৎভাবে কাজ করতে হবে বাহিনীগুলোকে’ বলেন মি, চৌধুরী।











