ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণের পেছনে থাকা 'আয়রন জেনারেল' ভ্যালেরি জালুশনি

    • Author, ওকসানা তোরপ, ভিয়েতোস্লাভ খোমেনকো এবং কাতেরিনা খিনকুলোভা
    • Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস

গত ১৮ মাস ধরে রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের পূর্ব এবং দক্ষিণের অঞ্চলগুলির নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ইউক্রেনের দীর্ঘ-প্রতীক্ষিত প্রচেষ্টা এখন পুরোদমে চলছে।

এই সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের পেছনে যিনি প্রধান ভূমিকা পালন করছেন তিনি হলেন জেনারেল ভ্যালেরি জালুশনি, ইউক্রেনের ৪৯-বছর বয়সী কমান্ডার-ইন-চিফ। তার সম্পর্কে এতদিন খুব কম লোকেই জানতো, কিন্তু এখন তার জনপ্রিয়তা প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সমান।

জেনারেল জালুশনি, যাকে বন্ধু-বান্ধব কিংবা পুরোনো সহপাঠীরা "আমাদের ভ্যালেরা" বলে ডাকতে পছন্দ করেন, তিনি ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ নিযুক্ত হন ২০২১ সালের জুলাই মাসে।

যারা তাকে ভালোভাবে চেনেন তারা বলছেন, প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ব্যক্তিগতভাবে বেশ জোর করেই তাকে নিয়োগ করেছেন। আর এই নিয়োগটি জেনারেল জালুশনি এবং অন্যান্য অনেকের কাছে ছিল বিস্ময়কর। কারণ, কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে তাকে এই পদোন্নতি দেয়া হয়।

উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও আধুনিক কমান্ডার

মি. জালুশনি এমনিতেই একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং আধুনিক কমান্ডার হিসাবে পরিচিত ছিলেন। একজন নিপাট নিরহংকারী মানুষ, অধস্তনদের সাথে তিনি রসিকতা করতে পছন্দ করেন, এবং নিজে বেশ প্রচারবিমুখ।

সাত মাসের মধ্যে রাশিয়ার পুরো মাত্রার আক্রমণের বিরুদ্ধে তিনি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

গত বছর ২৬শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে রুশ সৈন্যরা "তিন দিনের মধ্যে কিয়েভ দখল" করতে ব্যর্থ হয়েছে, আগ্রাসনের শুরুর দিকে যাকে একটি সম্ভাব্য পরিণতি বলেই মনে করা হচ্ছিল।

কিন্তু লড়াইয়ের বাস্তবতা ছিল ভয়াবহ, এবং ইউক্রেনের সরকার এনিয়ে জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। রুশ সৈন্যরা ইউক্রেনের উত্তর, পূর্ব এবং দক্ষিণ দিকে থেকে অগ্রসর হচ্ছিল এবং এটা রাজধানীর জন্য যথেষ্ট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ইউক্রেনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি পরিকল্পনা ছিল যে কিয়েভের কাছে বিশাল নিপ্রো নদীর ওপর সেতুগুলো বিস্ফোরণ দিয়ে উড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। এতে করে নদীর বাম তীর থেকে পশ্চিমের ডান তীরে রুশ সৈন্যদের পারাপার করা রোধ করা যাবে। নিপ্রোর ডান পারে বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনার মধ্যে ছিল গুরুত্বপূর্ণ নানা সরকারি অফিস।

তারা মতামতের জন্য জেনারেল জালুশনিকে ফোন করার পর তার জবাব ছিল, "কোন অবস্থাতেই আমরা এটা করবো না।" ঐ মুর্হূতে সিগারেটের ধোঁয়ায় পরিপূর্ণ একটি বাঙ্কারে বসে তিনি ইউক্রেনীয় বাহিনীর অন্যান্য শীর্ষ অধিনায়কদের সাথে বৈঠক করছিলেন।

"এটা করা হলে পূর্ব তীরে থাকা বেসামরিক ও সামরিক দু’ধরনের মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে," যুক্তি দিয়েছিলেন তিনি।

ঐ ঘটনার সাথে জড়িত দুটি সূত্র থেকে পাওয়া খবর বিবিসি মিলিয়ে দেখেছে, যার মধ্য দিয়ে বোঝা গেছে ঘটনা কী ঘটেছিল।

এরপর আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছেন। এবং ২০২২ সালের এপ্রিলের প্রথম দিকে ইউক্রেনীয় সৈন্যরা রুশ সেনাবাহিনীকে কিয়েভের উত্তর এবং পূর্ব দিকে ঠেলে দেয়।

সোভিয়েত সেনা পরিবারে জন্মগ্রহণকারী ভ্যালেরি জালুশনি একবার বলেছিলেন, তিনি সব সময়ই সোভিয়েত সেনাবাহিনীতে পদমর্যাদার বাড়াবাড়ি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছেন।

উনিশশো নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি যখন সামরিক একাডেমিতে যান ইউক্রেন তখন ইতোমধ্যেই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র।

যুদ্ধের হাতেখড়ি

যদিও সামরিক কলেজে সে সময় তার পাঠ্যপুস্তকগুলি ছিল সোভিয়েত যুগের, কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতা সম্পর্কে তার প্রথম হাতেখড়ি হয় ২০১৪ সালে। সে সময় পূর্ব ইউক্রেনের একটি এলাকায় তিনি একজন ডেপুটি কমান্ডার হিসেবে নিযুক্তি পান, যেখানে রুশ সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ইউক্রেনীয় বাহিনীর সাথে লড়াই করছিল।

জেনারেল জালুশনির যেসব সহকর্মীর সাথে আমরা কথা বলেছি তারা জানিয়েছেন, কেরিয়ারের শুরু থেকেই তিনি অধীনস্থদের সাথে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে ছিলেন খুবই আগ্রহী এবং তিনি কমান্ডের দায়িত্ব ভাগ করে দিতে পছন্দ করতেন।

জেনারেলের একজন প্রাক্তন সহকারি যিনি রুশ আক্রমণের গোড়ার দিনগুলিতে তাঁর পাশে ছিলেন, লুদমিলা ডলহোনভস্কা বিবিসিকে বলেছেন, জেনারেল জালুশনি ঘুমাতেন খুব কম এবং সবসময় রণাঙ্গনের সামরিক অধিনায়কদের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখতেন।

"তিনি ফোনে তার জেনারেলদের সাথে অনেক কথা বলতেন, কিন্তু সেসব কথাবার্তা সব সময় ছিল প্রাসঙ্গিক এবং ধীরস্থির," বলছিলেন তিনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এককভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রশ্নে ইউক্রেনীয় বাহিনীর জুনিয়র অফিসারদের স্বাধীনতা যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের অনেক সুবিধে এনে দিয়েছিল, যেটা রুশ সেনাবাহিনীর মাথা-ভারী কমান্ড কাঠামোতে ছিল না।

ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর কিছু সূত্র এমনকি একথাও বলেন যে লড়াইয়ের ময়দানে এসব কমান্ডাররাই সম্মিলিতভাবে ইউক্রেনের জন্য সাফল্য এনে দিয়েছেন। সেখানে জেনারেল জালুশনির কৃতিত্ব হচ্ছে তিনি এসব অফিসারকে তাদের মতো করে লড়াই করার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।

যুদ্ধ যখন চলছে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি তখন প্রতিরাতে ভাষণ দিয়ে ইউক্রেনের জনসাধারণের মনোবল চাঙ্গা রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

আর্থিক ও সামরিক সহায়তার জন্য বিদেশি বন্ধুদের চাপ দেয়ার সময় তিনি ইউক্রেন সরকারের সুশাসনের ছবি তুলে ধরেছেন।

অন্যদিকে জেনারেল জালুশনির লক্ষ্য ছিল সঠিক সামরিক কৌশল তৈরি করা।

গ্রীষ্ম মৌসুমের শেষে এবং শরতের শুরুতে সফল অভিযানের মাধ্যমে ইউক্রেনীয় সৈন্যরা দেশের পূর্ব ও দক্ষিণে বিশাল ভূখণ্ড রুশ বাহিনীর হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়।

সে সময় ইউক্রেনীয় বাহিনীর এই কমান্ডার-ইন-চিফ একজন জাতীয় বীর হয়ে ওঠেন, যদিও তাকে জনসমক্ষে দেখা যেতো খুব কমই এবং সংবাদমাধ্যমের সাথে কথা বলতেন তার চেয়েও কম।

জালুশনিকে নিয়ে বীরত্বের গল্প

সাহসিকতা এবং সংকল্পের সাথে তার নাম সমার্থক হয়ে ওঠে এবং তার খ্যাতি নানা ধরনের গল্প ও প্রবাদের জন্ম দেয়।

“জালুশনি যখন কোন অন্ধকার ঘরে ঢোকেন, তখন সেখানে তিনি আলো জ্বালান না, তিনি শুধু অন্ধকারকে সুইচ অফ করে দেন," তার সম্পর্কে এরকম একটি কথা প্রচলিত আছে।

তার জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছিল যে সেটি প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সমান হয়ে যায়, এবং তাদের সম্পর্কের মধ্যে সম্ভাব্য ফাটল নিয়ে ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকরা নানা ধরনের গুজব ছড়াতে শুরু করে।

এমনও কথা ছড়ানো হয়েছিল যে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সামরিক প্রধানের পদ থেকে জেনারেল জালুশনিকে সরিয়ে দিচ্ছেন, কিংবা জেনারেল জালুশনি প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছেন।

কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত তার কোনটিই ঘটেনি।

প্রেসিডেন্টের অফিসের একটি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, "এধরনের ঈর্ষা করার জন্য কোন সময় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির হাতে নেই। কারণ, বিদেশি অংশীদারদের কাছ থেকে ইউক্রেনের জন্য সামরিক সমর্থন পাওয়ার বিষয় নিয়ে তিনি এখন ১০২% ব্যস্ত।"

একে অপরকে নির্বিঘ্নে তাদের দায়িত্ব পালন করতে দিতে দু’জনেই এখন বেশ খুশি বলে মনে হচ্ছে।

গত জুনে মার্কিন সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিনকে জেনারেল জালুশনি বলেছিলেন, সামরিক কৌশলের সমস্ত খুঁটিনাটি ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি মি. জেলেনস্কিকে বিরক্ত করেন না।

“ওষুধ তৈরি করা কিংবা সেতু নির্মাণ করা সম্পর্কে তার যতটুকু জ্ঞান থাকা প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি তার সামরিক বিষয়গুলো বোঝার দরকার নেই।“

রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সমাজবিজ্ঞানীরা বিবিসিকে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে ইউক্রেনীয়দের মনোবল ধরে রাখার প্রয়োজন সেজন্যেই জেনারেল জালুশনির জনপ্রিয়তা থাকাও স্বাভাবিক। তার মানবিক গুণাবলীর দিকটিও তারা উল্লেখ করেন।

একবার তিনি এক সৈনিকের বিয়েতে গিয়ে হাজির হন, কারণ বাখমুত ফ্রন্টে পাঠানোর জন্য ঐ সৈনিকের বিয়ের অনুষ্ঠান পিছিয়ে গিয়েছিল। পরে বাগদত্তাকে বিয়ে করার জন্য ঐ সৈনিককে অল্প সময়ের ছুটি দেয়া হয়।

জালুশনির মৃত্যু গুজব

ইউক্রেনের তরফ থেকে আসন্ন পাল্টা আক্রমণ নিয়ে আলোচনা যখন বাড়ছিল, তখন রুশ সামরিক ব্লগাররা মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে গুজব ছড়াতে শুরু করে যে জেনারেল জালুশনি গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন, এমনকি তিনি মারাও গেছেন।

রাশিয়ান আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান সের্গেই নারিশকিন বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: "এটা স্বাভাবিক যে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডারের স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কে সমস্ত তথ্য আমাদের হাতে রয়েছে। তবে সেটা আমরা প্রকাশ করব না।"

কর্নেল আনাতোলি স্তেফান, যিনি জেনারেল জালুশনির ঘনিষ্ঠ, তিনি জানান, ইউক্রেনের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা এই গুজবকে "রুশ প্রোপাগাণ্ডার উন্মত্ত প্রচার” বলে বর্ণনা করেন এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করেন। কিন্তু এটাও স্পষ্ট যে বিষয়টিতে ইউক্রেনীয়রাও উদ্বিগ্ন বোধ করতে শুরু করেছিলেন।

জুন মাসের শুরুতে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বেশ কয়েকটি ছবি প্রকাশ করে যাতে দেখা যায় জেনারেল জালুশনি কিয়েভে একটি সামরিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত রয়েছেন।

আপাতত ইউক্রেনীয়দের কাছে ভ্যালেরি জালুশনির বীরের মর্যাদা সুরক্ষিত রয়েছে। তবে কমান্ডার-ইন-চীফের ওপর মানুষ এতটাই ভরসা করে আছেন যে ভবিষ্যতে সেটি একটি জটিল রূপ নিতে পারে।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা যদি শেষ পর্যন্ত সফলও হয়, তাহলেও দেশটি ভবিষ্যতে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হবে, হুঁশিয়ার করছেন সমাজবিজ্ঞানী ওলেক্সি অ্যান্টিপোভিচ। তখন মি. জালুশনিকে রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার পথ বেছে নিতে হতে পারে, বলছেন তিনি।

"যদি সম্পূর্নভাবে ধসে নাও পরে, এটা খুবই সম্ভব যে যুদ্ধের পরে ইউক্রেন মারাত্নক অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হবে। তখন সেটি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক খেলা।"

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিকোলা ডেভিডিউক বিশ্বাস করেন, জেনারেল জালুশনি যদি রাজনীতিতে নামেন তাহলে তিনি সফল হতেও পারেন।

"যদিও প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এমন একজন নেতা যিনি কখনই ইউক্রেনীয়দের ত্যাগ করেননি, কিন্তু [জেনারেল] জালুশনিই প্রকৃতপক্ষে তাদের রক্ষা করেছিলেন। এই কথাটি তার ক্ষেত্রে খুবই খাঁটি, এবং আমাদের সমাজে এরও চাহিদা রয়েছে।"