ভোলার স্কুলে 'অজানা রোগে' আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের আসলে কী হয়েছে?

বিদ্যালয়

ছবির উৎস, অচিন্ত্য মজুমদার

ছবির ক্যাপশান, ভোলার পশ্চিম ইলিশা ইউনিয়নের পশ্চিম চরপাতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়

বাংলাদেশের বৃহত্তম দ্বীপ জেলা ভোলার একটি স্কুলে ক্লাস চলাকালীন সময়ে সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের গণহারে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। তারা মাথা ব্যথা হচ্ছে বলে জানান ও কেউ কেউ অজ্ঞানও হয়ে পড়েন, যার পর ৩৬ জন শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন অভিভাবকরা।

চিকিৎসক ও মনস্তাত্ত্বিকরা বলছেন, আতঙ্কিত হয়ে শিক্ষার্থীরা ‘মাস সাইকোলজিকেল ইলনেস’ বা ‘গণ-মনস্তাত্ত্বিক রোগে’ আক্রান্ত হয়েছে।

একজনের দেখাদেখি আরেকজনের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এ ধরনের অসুস্থতার ঘটনা ঘটে। এটি এক ধরণের লঘু মানসিক রোগ।

কিন্তু এই মাস সাইকোলজিকেল ইলনেস কী? এর চিকিৎসাই বা কী?

স্কুল

ছবির উৎস, অচিন্ত্য মজুমদার

ছবির ক্যাপশান, পশ্চিম চরপাতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়

কী ঘটেছিল ভোলার স্কুলটিতে

সদর উপজেলার পশ্চিম ইলিশা ইউনিয়নের পশ্চিম চরপাতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মঙ্গলবার সকালে ক্লাশ চলাকালীন সময়ে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটে।

ঘটনার সূত্রপাত যখন জিহাদ নামে অষ্টম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী হাতে কলমের পিন ঢুকে রক্ত বের হওয়ার পর মাথা ব্যথা করছে বলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে।

এ সময় একই ক্লাসের আরো কয়েকজন শিক্ষার্থী মাথা ঘুরছে বলে আতঙ্কিত বোধ করতে থাকে ও অসুস্থ হয়ে পড়ে।

পরে শ্রেণি শিক্ষক আবু সাইদ বিষয়টি প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলামকে অবহিত করেন।

শ্রেণি শিক্ষক আবু সাঈদ জানান, “শিক্ষার্থী জিহাদ কলমের নিব থেকে আঙ্গুলে ব্যথা পেয়ে রক্ত যাতে না পড়ে সেজন্য আঙ্গুল চেপে ধরে। পরে দেখি সে মাথা ঝাঁকিয়ে টেবিল থেকে নিচে পড়ে যায়। এরপরই আরো কয়েকজনের একই রকম অবস্থা হয়”

পশ্চিম চরপাতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, “সকাল এগারটায় অষ্টম শ্রেণীর দ্বিতীয় পিরিয়ডে অঙ্কের ক্লাস চলাকালীন সময়ে জিহাদ নামে এক শিক্ষার্থীর অসুস্থতার খবর পেয়ে ক্লাসে যাই।"

"ওই শিক্ষার্থী অজ্ঞান হওয়ায় শ্রেণী শিক্ষক তাৎক্ষণিক-ভাবে তার মাথায় পানি দেয়। পরে সেখানে আরো ছয়জন অসুস্থ হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা প্রত্যেকেই মাথা ব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করছে বলে জানায়।”

হাসপাতাল

ছবির উৎস, অচিন্ত্য মজুমদার

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

“জিহাদ অসুস্থ হওয়ার পর তার দেখাদেখি এই ক্লাসেরই আরো কয়েকজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে সাথে সাথে ওই ক্লাস থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে দেই। ক্লাসে কোনও সমস্যা হলো কি না তা দেখার জন্য। এ সময় আমি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করি। ওই সময় পুরো স্কুল ছুটি দিয়ে দেই”, জানান মি. ইসলাম।

মি. ইসলাম বলেন “অ্যাম্বুলেন্স আনার জন্য ৯৯৯-এ ফোন করি। অ্যাম্বুলেন্স আসার পর মোট ১৬ জন শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। তাদেরকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় অন্য শিক্ষার্থীরাও বিষয়টি দেখেছিল।"

"ফলে আতঙ্কিত হয়ে বাড়িতে গিয়ে অন্যান্য ক্লাসের আরো প্রায় ২০ জন অসুস্থ হলে রাত দশটা নাগাদ তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। মোট ৩৬ জন শিক্ষার্থীকে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।”

সপ্তম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আফসানা বেগম বলেন, “আমার মেয়ে স্কুল থেকে ফিরে এসে মাথা চেপে ধরে অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে বলছিল আম্মা মাথা ফেটে যাচ্ছে। তার চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছিল এ সময়।"

"পরে দুপুরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। ওই হাসপাতালে স্কুলের আরো অনেক শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা হয়েছিল”, জানান তিনি।

আরেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মনির হোসেন বলেন, “স্যারের ফোন পেয়ে স্কুলে যাই। গিয়ে দেখি বেশ কয়েকজন বাচ্চা মাথায় থাপ্পড় দিয়ে কাঁদতেছে। আমার ছেলে বলে খুব মাথা ব্যথা করছে। পরে তাকে সহ অন্যান্যদের অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।”

ভোলা সদরের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে বুধবার সকাল পর্যন্ত ৩৬ জন শিক্ষার্থী এমন অসুস্থ হয়ে ভর্তি রয়েছে।

প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম জানান, “বুধবার স্কুল খোলা থাকলেও শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে একেবারে আসেনি বললেই চলে।”

মানসিক রোগ

ছবির উৎস, Getty Images

যা বলছেন চিকিৎসকরা

ভোলার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মনিরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানান, “আতঙ্কিত হয়ে শিক্ষার্থীদের এমন অসুস্থতার ঘটনা ঘটেছে। এটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘মাস সাইকোলজিক্যাল ইলনেস’ বা 'গণ-মনস্তাত্ত্বিক অসুস্থতা' বলে।”

“এটা আসলে কোনও ছোঁয়াচে রোগ না। একজনের দেখাদেখি আরেকজনের হয়েছে। এটা মূলত মানসিক রোগ।"

"সাধারণত মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের এ ধরনের রোগ হয়। কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সাধারণত এটা হয় না”, জানান তিনি।

এই ঘটনায় আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই জানিয়ে মি. ইসলাম বলেন, “এ ঘটনায় অভিভাবকরা যেটা বলেছেন একজনকে ধরার ফলে আরেকজনের হয়েছে, বিষয়টা এমন নয়। এটা ছোঁয়াচে কোনও রোগ নয়। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।”

“চিকিৎসা হিসেবে এতে তেমন সুনির্দিষ্ট কোনও ওষুধ দেওয়া হয় না। সাইকোথেরাপি, কাউন্সেলিং করে শিক্ষার্থীদের ভীতি দূর করা হয়। এই শিক্ষার্থীদেরও কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে।”

“ডাক্তার, শিক্ষকরা তাদের কাউন্সেলিং করেছে। তাদের বোঝানো হয়েছে এটা কোনও রোগ নয়, ভীতি থেকে মানসিক রোগ। প্রয়োজনভেদে কাউকে স্বল্পমেয়াদী চিকিৎসা দেওয়া হয়”, বলেন মি. ইসলাম।

বাংলাদেশে এর আগেও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অসুস্থতার ঘটনা ঘটেছে বলে জানান ওই চিকিৎসক। তখন গণমাধ্যমে ব্যাপক হারে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়েছিল।

শিক্ষার্থীদের অনেককেই হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তত্ত্বাবধায়ক ডা. মনিরুল ইসলাম।

জেলা সিভিল সার্জন কে এম শফিকুজ্জামান ঘটনার পরই শিক্ষার্থীদের দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, “এক শিক্ষার্থীকে দেখে আতঙ্কিত হয়ে অন্যরা ভয় পেয়ে কান্না করেছে, অসুস্থতার ঘটনা ঘটেছে। এটি মাস সাইকোলজিকেল ইলনেস বা গণমনস্তাত্ত্বিক রোগ।"

"প্রাথমিকভাবে কয়েকজনকে স্যালাইন দেয়া হয়েছে। দুই একজনকে অক্সিজেন দেওয়া হয়েছিলো। এখন তারা ভালো আছে। প্যানিক থেকে এমনটি হয়েছে শিক্ষার্থীদের”, বলেন তিনি।

মানসিক রোগ

ছবির উৎস, Getty Images

এই রোগ নিয়ে যা বলছেন মনস্তত্ববিদরা

মনস্তাত্ত্বিকরা বলছেন, এটি আগে 'মাস হিস্টিরিয়া' নামে অভিহিত ছিল। এখন এটিকে 'মাস সাইকোলজিকেল ইলনেস' বা গণ-মনস্তাত্ত্বিক রোগ বলা হয়।

মনস্তত্ত্ববিদ মোহিত কামাল বিবিসি বাংলাকে নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “এটি আগেও হয়েছে। প্রায় এক যুগের বেশি সময় আগে নরসিংদীতে এ ধরনের ঘটনার খবর পেয়ে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলাম। সেখানে সবাই অজ্ঞান হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল।”

মনস্তাত্ত্বিকরা জানান, মানসিক রোগ আসলে দুই ধরনের। প্রথম প্রকার গুরুতর ধরনের অসুস্থতা, আরেকটি লঘু অসুস্থতা। এই রোগটি লঘু অসুস্থতার পর্যায়ে পড়ে।

মি. কামাল বলেন, “এটাকে কনভারসন ডিজঅর্ডার বলে। মানুষের মনের ভেতরের দ্বন্দ্ব, চাপ, আতঙ্ক, সংশয় সব কিছুই শারীরিক আকারে রূপ নেয়। মাথাব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করা, অজ্ঞান হওয়া ... আবার অনেকের সাময়িকভাবে স্মৃতিশক্তি চলে যায়। এটা মাইনর মেন্টাল ইলনেসের গোত্রভুক্ত।”

সাধারণত একজনের দেখাদেখি আরেকজন এ রোগে আক্রান্ত হয় বলে জানান মি. কামাল।

এর চিকিৎসা সম্পর্কে মি. কামাল বলেন, “রোগীর মনে যে অহেতুক ভীতি তৈরি হয় তা দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে। পরামর্শ দিয়ে নয় বরং তার মনের ভেতরে যে ভয় রয়েছে - সে যাতে নিজে বুঝতে পারে এটি শুধুই একটি ভীতি এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে।”

“এই পদ্ধতিকে সাপোর্টিভ সাইকোথেরাপি বলে। এতে রোগীকে নিজের অবস্থান নিজেই যাতে সে বুঝতে পারে সে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।”

"আবার আরেকটি পদ্ধতি 'এক্সপ্লোরেটিভ সাইকোথেরাপি'র মাধ্যমে রোগী কী কারণে ভয় পাচ্ছে তা বের করা হয়। প্রাথমিকভাবে উদ্বেগ বা ভয় দূর করতে কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। 'এটি কিছু নয়' এমন বিষয় ডাক্তার বললে হবে না, এটি রোগী নিজে অনুভব করতে হবে এই পদ্ধতিতে”, জানান মনস্তত্ত্ববিদ মোহিত কামাল।

অর্থাৎ রোগী নিজে আবিষ্কার করবে কীসে তার ভয়, কেন তা হচ্ছে - এরপর তাকে সেই অনুযায়ী কাউন্সেলিং করা হবে।

এই মাস সাইকোলজিকেল ইলনেস বা গণ-মনস্তাত্ত্বিক রোগে আতঙ্কিত হওয়ার তেমন কিছু নেই বলে জানান মনস্তাত্ত্বিকরা।