মণিপুরের সহিংসতা নিয়ে যেসব বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শ্রুতি মেনন
- Role, বিবিসি ভেরিফাই, দিল্লি
ভারতের উত্তরপূর্বের মণিপুর রাজ্যে যেসব সহিংস ঘটনা ঘটছে - তা নিয়ে নানারকম ভুয়া তথ্য ব্যাপকভাবে শেয়ার করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেটের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে এটা থামাতে চেষ্টা করলেও তা ঘটছে।
রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই জনগোষ্ঠী এবং সংখ্যালঘু কুকি উপজাতির লোকদের মধ্যেকার এই সংঘাত সম্প্রতি বিশ্বব্যাপি সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছে।
বিশেষ করে দু'জন মহিলাকে নগ্ন করে একদল লোক আক্রমণ চালাচ্ছে - এমন এক ভিডিও ভাইরাল হলে ভারতে এবং ভারতের বাইরেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
সতর্কবাণী: এই নিবন্ধে এমন কিছু বর্ণনা আছে যা কোন কোন পাঠককে বিচলিত করতে পারে।
যৌন সহিংসতা সম্পর্কে ভুয়া দাবি
মে মাসের প্রথম দিকে যখন মণিপুর রাজ্যে সহিংসতা বাড়ছিল তখন থেকেই নারীদের ওপর আক্রমণ ছিল মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর দাবির একটি অন্যতম উৎস।
গত ৩রা মে সংঘাত শুরু হবার পরপরই কর্তৃপক্ষ মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। এর কারণ ছিল "বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মে ভুয়া তথ্য ও মিথ্যা দাবির" বিস্তার থামানো।
একদিন পর এ বিধিনিষেধ রাজ্যটির সকল ইন্টারনেট সেবায় সম্প্রসারিত করা হয়।
End of বিবিসি বাংলায় সম্পর্কিত খবর:

কিন্তু তার মধ্যেই প্লাস্টিক ব্যাগে জড়ানো এক নারীর মৃতদেহের এক বীভৎস ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এটিকে ভুলভাবে একজন মেইতেই নার্সের মৃতদেহ এবং তাকে কুকি পুরুষরা ধর্ষণ ও হত্যা করেছে বলে উল্লেখ করা হয় ।
এ ছবিটি যে শুধু সামাজিক মাধ্যমেই প্রচার পেয়েছে তা নয় - আমরা এমন প্রমাণও পেয়েছি যে চূড়াচাঁদপুর জেলাতেও এটি হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার হয়েছে - যেখানে গত ৩রা মে সংঘর্ষ হয়েছিল।
এই ছবিটিকে ঘিরে যেসব দাবি করা হচ্ছে তা মিথ্যা, কারণ এটি আদৌ মণিপুরে তোলা হয় নি। এ ছবিটি হচ্ছে ২১-বছর বয়স্ক আয়ুশি চৌধুরির - যাকে গত বছর দিল্লিতে হত্যা করা হয়।
একইভাবে গত ৫ই মে সামাজিক মাধ্যমে একটি মিথ্যা দাবি করা হয় যে সাত বছর বয়সী একটি মেইতেই শিশু এবং ৩৭ জন মেইতেই নারীর মৃতদেহ মণিপুর রাজ্যের রাজধানী ইম্ফলের শিজা হাসপাতালে পোস্ট মর্টেমের অপেক্ষায় আছে - যে নারীদের ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়।
টুইটারে আরো বেশ কিছু পোস্টে এই দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয় - প্রায় একই শব্দ ব্যবহার করে। এই পোস্টগুলো শেয়ার করা হয় নতুন কিছু অ্যাকাইন্ট থেকে।
বিবিসি আরো দেখেছে যে একই শব্দ ব্যবহার করে স্থানীয় মণিপুরী ভাষাতেও টেক্সট বার্তা পাঠানো হচ্ছে। নিচের ছবিতে এর একটা উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। মণিপুরে কর্মরত সাংবাদিকরা আমাদের বলেছেন যে মোবাইল সেবা বন্ধ করে দিলেও টেক্সট বার্তার মাধ্যমে এখনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে।

এ দাবিটি মিথ্যা।
শিজা হাসপাতাল বিবিসিকে বলেছে যে এ ঘটনা আদৌ ঘটেনি। তাছাড়া একটি প্রাইভেট মেডিক্যাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের পোস্ট মর্টেম করার কোন ক্ষমতা নেই বলেও তারা জানিয়েছে।
মিয়ানমার, মণিপুর নয়
মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের আরো উদাহরণ আছে। এর মধ্যে আছে একটি অত্যন্ত রগরগে ভিডিও - যাতে একটি রাস্তার ওপর একজন মহিলাকে আক্রমণ ও হত্যা করার দৃশ্য দেখা যায়। বলা হচ্ছে এই রাস্তাটি মণিপুরে।
জুন মাসের শেষ দিকে এই ভিডিওটি মণিপুর হ্যাশট্যাগ দিয়ে শেয়ার করা শুরু হয়।
এটি হাজার হাজার বার দেখা হয়েছে এবং কিছু লোক দাবি করেন যে এতে সশস্ত্র লোকেদের হাতে একজন কুকি নারীকে হত্যার ঘটনা দেখা যাচ্ছে। আক্রমণকারীরা মেইতেই জনগোষ্ঠীর বলে পূর্বেই অনুমান করে নেয়া হয়।
এক সপ্তাহ আগে এ ভিডিওটি আবার দৃশ্যমান হয়। সাথে একই দাবি এবং এই ঘোষণা যে এটি ঘটেছে মণিপুরে।

ছবির উৎস, Getty Images
End of বিবিসি বাংলায় আজকের আরো খবর:
আবার বলতে হচ্ছে যে এ দাবিও মিথ্যা।
এই ভিডিওটি মণিপুরের নয়, এবং আক্রমণের শিকার নারীটি একজন কুকি মহিলা নন।
এ ভিডিওটি প্রতিবেশী মিয়ানমারের, এবং এ ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২২ সালের জুন মাসে - মণিপুরের সহিংসতা শুরুর অনেক আগে। ভারতীয় একটি ফ্যাক্ট-চেকিং ওয়েবসাইট এটির কোন সত্যতা নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে।
এ ভিডিওটি কত ব্যাপকভাবে শেয়ার করা হয়েছে তার ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত নই। কিন্তু এটি যে মণিপুরের ভেতরেই প্রচার হচ্ছিল তা নিশ্চিত কারণ রাজ্য পুলিশ প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে কেউ এ ভিডিওটি শেয়ার করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গ্রেফতারের ব্যাপারে ভুল তথ্য
গত ১৯শে জুলাই একটি ভিডিও বের হয় যাতে দু'জন কুকি মহিলার ওপর একদল লোকের আক্রমণের ভিডিও বের হয়। এ ঘটনাটি মে মাসের প্রথম দিকের। এর পর মণিপুরে সহিংসতার খবর সংবাদ শিরোনাম হয়। তবে তার পরেও ভুল তথ্য প্রচার অব্যাহত রয়েছে।
পর দিন একটা দাবি ছড়িয়ে পড়ে যে ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে একজন মুসলিম লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে।
যারা এটি শেয়ার করেছেন তাদের মধ্যে আছেন তেজিন্দর পাল সিং বাগ্গা - যিনি ক্ষমতাসীন দল বিজেপির একজন রাজনীতিবিদ।

মি. বাগ্গার টুইট বার্তাটি ১০ লাখেরও বেশি বার দেখা হয়েছে, হাজার হাজার বাইর রিটুইট করা হয়েছে।
এতে লোকটিকে "মণিপুর মামলার প্রধান অভিযুক্ত" বলে বর্ণনা করা হয়। আর মণিপুর কেস বলতে বোঝানো হয় দুই মহিলার ওপর আক্রমণের ঘটনাটিকে।
কিন্তু এটা ছিল বিভ্রান্তিকর। কারণ মণিপুরের পুলিশ সেদিন একজন মুসলিমকে গ্রেফতার করেছিল ঠিকই - কিন্তু তার কারণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
পুলিশ এটা স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে এসব গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছিল ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়। তারা সেই মহিলার ওপর আক্রমণের ঘটনার সাথে মুসলিম লোকটিকে সম্পর্কিত করেনি।
এএনআই বার্তা সংস্থা - যারা ভুলভাবে রিপোর্ট করেছিল যে এই লোকটির গ্রেফতারের সাথে নারীর ওপর আক্রমণের ঘটনাকে সম্পর্কিত - তা তারা পরে সংশোধন করেছিল। তারা বলেছিল, পুলিশের টুইট পড়তে ভুল হওয়ার কারণে সেই ভুলটি হয়েছে।
তবে বিজেপির নেতা মি. বাগ্গা এখন পর্যন্ত তার সেই টুইটটি সংশোথন করেননি বা এর কোন ব্যাখ্যা দেননি।
এ ব্যাপারে বিবিসির প্রশ্নেরও তিনি কোন জবাব দেননি।








