‘রকেটের গতিতে সিনেমার মতো উড়ে গিয়ে পড়ে বাসটি’- শিবচরের দুর্ঘটনা যেভাবে ঘটে

বাসটি এক্সপ্রেসওয়ে থেকে ছিটকে প্রায় ৪০ ফুট নিচে এসে পড়ে

ছবির উৎস, সঞ্জয় কর্মকার অভিজিৎ

ছবির ক্যাপশান, বাসটি এক্সপ্রেসওয়ে থেকে ছিটকে প্রায় ৪০ ফুট নিচে এসে পড়ে
    • Author, ফয়সাল তিতুমীর
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

পদ্মাসেতুর এক্সপ্রেসওয়ে থেকে বাস খাদে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৯ জন মারা গেছেন।

নিহতদের মধ্যে ১৭ জনের লাশ শনাক্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। দু'জনের এখনো পরিচয় মেলেনি।

গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি আছেন বেশ ক'জন।

এছাড়া শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিৎসা নিয়ে দুজন বাড়ি ফিরে গেছেন বলে জানিয়েছেন মেডিকেল অফিসার ড. আসিফুর রহমান।

পদ্মাসেতু এক্সপ্রেসওয়ে থেকে বাসটি খাদে পড়ে যায়

ছবির উৎস, সঞ্জয় কর্মকার অভিজিৎ

ছবির ক্যাপশান, পদ্মাসেতু এক্সপ্রেসওয়ে থেকে বাসটি খাদে পড়ে যায়

কেন এই দুর্ঘটনা?

পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে, ইমাদ পরিবহণের বাসটি ভোর সাড়ে চারটায় খুলনা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এরপর পদ্মাসেতুর আগে শিবচরের কুতুবপুর এলাকায় এক্সপ্রেসওয়েতে নিয়ন্ত্রণ হারায় সেটি।

বাসটি এক্সপ্রেসওয়ের রেলিং ভেঙে নিচে খাদে পড়ে যায়। এতে এর সামনের অংশ একেবারে দুমড়ে মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই ১৪জন প্রাণ হারায়।

কিন্তু কীভাবে ঘটলো এই দুর্ঘটনা?

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, বেপরোয়া গতির কারণে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে থাকতে পারে।

''নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণেই বাসটি দুর্ঘটনায় পড়ে। তবে তদন্ত করার পরই কারণটা জানা যাবে," বলেন মাদারীপুর পুলিশ সুপার মাসুদ আলম।

এরইমধ্যে কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে এবং দুই কার্য দিবসের মধ্যে তাদের রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।

কিন্তু এরইমধ্যে দুর্ঘটনার নানা কারণ আলোচনায় উঠে এসেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ জানান, বাসটি খুলনা থেকেই কারিগরি ত্রুটি নিয়ে রওনা দেয়। পথে সে কারণেই ঘটেছে দুর্ঘটনা।

স্থানীয় সাংবাদিক সঞ্জয় অভিজিৎ কর্মকার ঘটনার শুরু থেকেই সেখানে থেকে সংবাদ সংগ্রহ করছিলেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান, বাসটির গতি ছিল তীব্র এবং সামনের বাম পাশের চাকা ফেটে দুর্ঘটনাটি ঘটে।

‘রকেটের গতিতে সিনেমার মতো উড়ে গিয়ে পড়ে বাসটি’

দুর্ঘটনাস্থল শিবচরের কুতুবপুরে এক্সপ্রেসওয়ের পাশেই একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করেন মোহাম্মদ সোহেল হোসেন। দুর্ঘটনাটি তার নজরে আসে একটা বিকট শব্দে।

''সকালে আমি রেস্টুরেন্টটা মাত্র চালু করে বসে আছি। ৭টা ১৫ থেকে ২০ এর দিকে ঠাস করে একটা টায়ার বার্স্টের শব্দ শুনি। দেখলাম আমার রেস্টুরেন্টের একটু সামনেই টায়ার বার্স্ট হল, এরপর আকাবাঁকা হয়ে কিছুদূর গিয়ে রকেটের গতিতে, মানে সিনেমায় যেভাবে দেখি উড়ে গিয়ে নিচে পড়ে যায় বাসটি," বর্ণনা করেন সোহেল হোসেন।

এরপর দ্রুত ছুটে গিয়ে স্থানীয় মানুষদের সাথে উদ্ধার কাজে লেগে পড়েন তিনি। তবে সোহেল জানালেন, এই রাস্তায় প্রায়ই এমন গাড়ির চাকা ফেটে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

"এখানে ২/৩ দিন পরপরই টায়ার বার্স্ট হয়, গত ২২/২৩ দিনে ৫/৭ টা টায়ার বার্স্ট হতে আমি নিজে দেখছি। দু'দিনে আগে একটা ট্রাকের টায়ার এরকম ফেটে যায়, পরে ওর ব্রেক ভালো ছিল জন্য কন্ট্রোল করতে পারছে।"

বাসে প্রায় ৪৫ জন যাত্রী ছিলেন

ছবির উৎস, সঞ্জয় কর্মকার অভিজিৎ

ছবির ক্যাপশান, বাসে প্রায় ৪৫ জন যাত্রী ছিলেন

‘সামনের দিকে যারা ছিল তারাই মারা গেছে’

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

‘’ফায়ার সার্ভিস এই দুর্ঘটনার খবর পায় সকাল ৭.৪৫ মিনিটে, শিবচরের ফায়ার স্টেশন টিম ৭.৫৮ মিনিটে প্রথম দুর্ঘটনাস্থলে পৌছায়, তারা গিয়ে দেখে রাস্তা থেকে ব্রিজের মতো রেলিং ভেঙে নিচে বাসটি পড়ে আছে," বলছিলেন ফরিদপুর ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক শিপলু আহমেদ।

পদ্মাসেতু এক্সপ্রেসওয়ে যেটাকে সরকার বঙ্গবন্ধু সেতু নামকরণ করেছে সেখানে প্রায়ই এমন দুর্ঘটনার খবর শোনা যায়। কিন্তু এই দুর্ঘটনায় এত প্রাণহানি ঘটলো কেন?

মি. শিপলু বলেন, "বাসের গতি নিশ্চয় বেশি ছিল, সেকারণে আঘাতটা সজোরে লাগে। সামনের অংশ একদম দুমড়ে মুচড়ে গেছে। সামনের দিকে যারা ছিল তারাই মারা গেছে।"

সাংবাদিক সঞ্জয় কর্মকার বলছিলেন, এক্সপ্রেসওয়েটা অনেক উঁচুতে। আর এর নিচ দিয়েই ছিল স্থানীয় মানুষ ও পরিবহণ পারাপারের একটা আন্ডারপাস। বাসটি প্রায় ৪০ ফুট উঁচু থেকে এসে সরাসরি ঐ আন্ডারপাসের ঢালাই করা দেয়ালে ধাক্কা মারে। আর একারণেই এত প্রাণহানি বলে বলছেন তিনি।

তবে এরকম দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তদন্ত প্রক্রিয়া সঠিকভাবে করার উপর জোর দেন বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার।

"যারা তদন্ত করবে তারা কোনভাবেই এই সিস্টেমের সাথে জড়িত থাকবে না। তাকে থার্ড পার্টি হতে হবে। বিদেশে ইন্সুরেন্স কোম্পানি গুলো এটি করে। গাড়ি ঠিক আছে কি-না, রাস্তা ঠিক আছে কি-না, ড্রাইভার ঠিক আছে কি-না, তারা সেগুলো দেখে।

"কিন্তু আমাদের এখানে তো এগুলা নাই। কেউ জবাবদিহিতার মধ্যে নাই। এটার জন্য মনে করেন মালিক দায়ী আছে, বিআরটিএ দায়ী, জেলা প্রশাসক কোন না কোনভাবে দায়ী, তারাই তো আবার তদন্ত কমিটিতে থাকছে।‘’

দুর্ঘটনার পুরো তদন্ত বিজ্ঞানভিত্তিক করার কথা বলেন তিনি। একইসাথে এখানে মানসিক দিকটাও উপেক্ষিত থাকে বলে মনে করেন ড. তালুকদার।

"এখানে সাইকোলজিক্যাল প্রেশার থাকতে পারে, ড্রাইভারের মানসিক ভাবে কোন কিছু ছিল কি-না।"

মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের করা শিবচরের এই দুর্ঘটনার তদন্ত কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে রয়েছেন একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, বুয়েটের এক অধ্যাপক এবং বিআরটিএর একজন কর্মকর্তা।

পদ্মা সেতু চালু হবার পর এক্সপ্রেসওয়েতে এটিই সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা বলছেন স্থানীয় মানুষ। নিহত ১৯জনের সৎকারের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে।

Skip YouTube post
Google YouTube কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: বিবিসির নয় এমন ওয়েবসাইটের কনটেন্টের জন্য বিবিসি দায়ী না YouTube কনটেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of YouTube post