চা নিলামকারী প্রথম নারী মায়িশা: যেভাবে নিলাম পরিচালনার সাথে যুক্ত হলেন

মায়িশা রহমান
    • Author, আফরোজা নীলা
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

‘সাহিত্য রসটা খুঁজে পাওয়া যায় না এক কাপ চা হাতে না নিলে’ হাসতে হাসতে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স পাশ করা মায়িশা রহমান। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে চায়ের নিলাম পরিচালনার আসনে বসেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ৫২টির মতো চায়ের নিলাম পরিচালনা করেছেন তিনি।

গত বছর মানে ২০২২ সালের ১৪ই মার্চ চট্টগ্রামে প্রথম চায়ের নিলাম ডাকেন মায়িশা। বাবার সঙ্গে বসেই প্রথম নিলামটি ডেকেছিলেন মায়িশা।

প্রথম নিলামের অভিজ্ঞতা

“লট নাম্বার...” হেমারিং করে অর্থাৎ নিলামে টেবিলে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে চায়ের নিলাম শুরু করেন মায়িশা। প্রথম নিলামের অভিজ্ঞতাকে ‘জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা’ বলে বর্ণনা করেছেন তিনি।

“যখন আব্বু আমাকে একদিন বললো চা বিক্রি করবি? আমি বললাম দেখি পারি কিনা। সেই থেকে শুরু, সেই দিনটা ছিল ১৪ই মার্চ। বাবার সাথে বসে নিলাম পরিচালনা করা অন্য রকম এক আনন্দ। এত পজিটিভ রেসপন্স পেয়েছি, আমার কাজ করার উদ্যোম আরও বেড়ে গেছে” – বলছিলেন মায়িশা।

চট্টগ্রামে প্রথম চায়ের নিলাম অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৯ সালের ১৬ই জুলাই। এরপর ৭৩ বছরের ইতিহাসে মায়িশাই প্রথম বাংলাদেশি নারী যিনি চায়ের নিলাম পরিচালনা করেছেন। চট্টগ্রামের পর শ্রীমঙ্গলেও প্রথম নারী হিসেবে চায়ের নিলাম পরিচালনা শুরু করেন তিনি।

তবে শিক্ষানবিশ হিসেবে প্রতিনিয়ত বাবা, চাচাসহ পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য যারা চা শিল্পের সাথেই যুক্ত তাদের কাছ থেকে শিখছেন বলে জানান তিনি।

চায়ের গল্প শুনতে শুনতে বড় হওয়া মায়িশা রহমান এখন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই নিলামে বিক্রি করছেন চট্টগ্রাম, সিলেট আর পঞ্চগড়ের চা।

চা নিলামের আগে কী কী কাজ করতে হয়?

চায়ের প্রথম নিলামকারী মায়িশা রহমান

ছবির উৎস, Maisha Rahman

ছবির ক্যাপশান, মায়িশা রহমান চট্টগ্রামে চায়ের নিলাম পরিচালনার কাজটি প্রথম করেন ২০২২ সালের ১৪ই মার্চ।

প্রতি সোমবার চট্টগ্রামে চায়ের নিলাম হয়। চায়ের গুণগত মান যাচাই করে সেটার মূল্য নির্ধারণ করে থাকে ব্রোকারস প্রতিষ্ঠানগুলো।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

মায়িশা রহমান বলেন, “যেসব বাগানের চা বিক্রি হবে সেই নমুনাগুলো প্রথমে বাগান থেকে পাঠান বাগান মালিকেরা, সেগুলো আমরা প্রথমে টেস্ট করি। চায়ের গুনগত মান যাচাই বাছাই করি, বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করা হয়। নাকে গন্ধ নিয়ে এবং সেই নমুনা দিয়ে তৈরি লিকারটা মুখে টেস্ট করে সেটার স্বাদ কেমন বা মান কেমন তা যাচাই বাছাই করে থাকি।”

লিকারের সাথে সাথে চায়ের রঙটা দেখতে কেমন – সেটাও বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করা হয় বলে জানান মিজ রহমান।

পরীক্ষা করার পরে ওই চায়ের গ্রেডিং এবং রেটিং করা হয়, একইসাথে চায়ের মূল্যও নির্ধারণ করা হয়।

এরপর সেই গ্রেড আর মূল্যের ওপর ভিত্তি করে একটা ক্যাটালগ তৈরি করা হয়, এরপর নিলামের আগেই ক্রেতাদের কাছে নমুনাগুলো পাঠিয়ে দেয়া হয়।

“ক্রেতারাও সেসব নমুনা পরীক্ষা করেন যাচাই বাছাই করে দেখেন। এরপর নিলামের দিন ক্যাটালগটি হাতে নিয়ে তারা বসেন। এরপর শুরু হয় দাম হাঁকানো। সেখানে আমরা হেমারিং করে চা বিক্রি করি। এটা বিশাল বড় একটা কাজ,” বলছিলেন মায়িশা।

“নিলামটা যখন শেষ হয় তখন আমরা ডেলিভারি ইস্যু করি। আমাদের অফিস থেকে ক্রেতারা সেটা সংগ্রহ করেন এবং চায়ের গুদাম থেকে তাদের ক্রয়কৃত চা তারা বুঝে নিয়ে নেন”।

চায়ের স্বাদ পরীক্ষা করে করে মানটা সঠিকভাবে নির্ণয় করাটা খুব চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করেন মায়িশা।

একজন শিক্ষানবিশ ‘টি টেস্টার’ হিসেবে নিজের পরিবারসহ সহকর্মী ও সিনিয়রদের যথেষ্ট সমর্থন ও সহযোগিতা পাচ্ছেন উল্লেখ করে মায়িশা বলেন ‘আমি আসলে লাকি যে এরকম সাপোর্ট পাচ্ছি, শিখতে পারছি’।

“আমার বাবা আমাকে হাতে-কলমে শেখাচ্ছেন। চায়ের ফিল্ড থেকে ফ্যাক্টরি পর্যন্ত আমার চাচা নানা বিষয়ে ধারণা দিচ্ছেন, শেখাচ্ছেন, যিনি এখন ন্যাশনাল টি কোম্পানিতে আছেন। চায়ের ম্যানুফাকচারিং ও মার্কেটিংয়ের বিষয় শিখছি বাবার কাছ থেকে”।

“যেমন চায়ের কোন লিকারটা কেমন হতে পারে, কোন লিকারটা ভালো – বা কোনও আছে কিনা ভালো কাপ না খারাপ কাপ – এটা নির্ণয় করাটা খুব কঠিন। এটা বেশি চ্যালেঞ্জিং এখনও আমার কাছে,” বলেন মায়িশা রহমান।

মায়িশা রহমান

ছবির উৎস, Maisha Rahman

ছবির ক্যাপশান, নিলামের আগে চায়ের গুণমান পরীক্ষা করছেন মায়িশা।

নারী হিসেবে নিলাম পরিচালনায় বেশি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নে মায়িশা বলেন “আমাদের দেশে মেয়েরা সবক্ষেত্রে নিরাপদ না। ভিন্ন পেশাতে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়। তবে আমি এক্ষেত্রে ভাগ্যবান কারণ পজিটিভ সবকিছু পেয়েছি”।

প্রথম নিলামের সময়ও সবাই তাকে সহজভাবে গ্রহণ করেছে বলে জানান মায়িশা।

“যখন আমি নিলামে ডাক দেই, আমাকে নেগেটিভভাবে কেউ নেয়নি। নিলামের একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে, চা বিক্রির নির্ধারিত সময় দেয়া থাকে। আর নির্ধারিত সময়েই নির্ধারিত চা বিক্রি করতে হয়। নির্ধারিত সময়ে বিক্রি করতে না পারলে তা পরের নিলামে তোলা হয়”।

কিন্তু প্রথম নিলামে ক্রেতারা তাড়াহুড়া না করে মায়িশাকে সময় দিয়ে সহযোগিতা করেছে যাতে কাজটি তিনি ধীরেসুস্থে করতে পারেন।

"আমি নিলাম ডাকলে সিনিয়ররাও খুশি হোন। আমাকে ভালোভাবে কাজ করার জন্য নানা ধরনের পরামর্শ দিয়ে থাকে অন্য ব্রোকার্সের সিনিয়ররাও," বলছিলেন মায়িশা।

Skip YouTube post
Google YouTube কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: বিবিসির নয় এমন ওয়েবসাইটের কনটেন্টের জন্য বিবিসি দায়ী না YouTube কনটেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of YouTube post

কেন যুক্ত হলেন এই পেশায়?

দাদা-বাবা-চাচাদের পথ ধরে চা শিল্পের সাথে যুক্ত হয়েছেন মায়িশা রহমান। বলা যায় চা-পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সদস্য মায়িশা।

যদিও চায়ের নিলামকারী হবার কোনও স্বপ্ন ছিল না মায়িশার, তবে এক ধরনের ভালোবাসা ছিল এই চা আর চা-বাগানের প্রতি।

বিবিসি বাংলার সাথে আলাপকালে হাসতেই হাসতেই বলছিলেন “ছোটবেলায় একেক সময় একেক স্বপ্নের কথা বলতাম। কিন্তু এখন শখের বশে চায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজটাকে ভালোবেসে ফেলেছি।”

এখন এখানেই ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখছেন মায়িশা রহমান।

“ছোটবেলা থেকেতো দেখেই আসছি। আব্বু চা টেস্ট করতো নিলাম করতো, নিলামের আগে টেনশান দেখতাম। আব্বু মার্কেট রিপোর্ট রেডি করছে, চা টেস্ট করছে। নিলামের আগে আব্বু আর অন্যান্য ব্রোকার্স প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কাজ করতো তা দেখতাম। ওটা মনে হয় মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল”।

“আমি চা পরিবারের মেয়ে। ছোট বেলা থেকে দাদা, বাবা চাচাকে দেখে আসছি। আমার দাদা প্রয়াত মোখলেসুর রহমান ১৯৫৬ সালে শ্রীমঙ্গলে নন্দরানী চা–বাগানে ম্যানেজার ছিলেন। উনি পাকিস্তান আমলে বাঙ্গালি ম্যানেজারদের মধ্যে অন্যতম একজন। আমার বাবা এবং ছোট চাচাও চায়ের সঙ্গে যুক্ত”।

“ওইযে বলে না মাটির টান, নাড়ির টান আমারও ওরকম একটা টান হয়ে গেছে” চায়ের প্রতি যুক্ত হওয়া নিয়ে এভাবেই নিজের অনুভূতির কথা জানাচ্ছিলেন মাইশা রহমান।

মায়িশার অনুপ্রেরণা তার পরিবার

শ্রীমঙ্গলে জন্ম নেয়া মায়িশা-ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এসএসসি এইচএসসি পাশ করেন। এরপর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করেন তিনি।

গত বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের মার্চ মাসেই প্রডিউস ব্রোকারস লিমিটেডে শিক্ষানবিশ ‘টি টেস্টার’ হিসেবে মায়িশা কাজ করা শুরু করেন।

“বিদেশে পড়ালেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। ক্যারিয়ার অন্যভাবে তৈরি করার সুযোগও এসেছিল। কিন্তু দেশে আসার পর মনে হলো চা নিয়ে কাজ করি। শখের বসে শুরু করে এখন মনে হচ্ছে এখানে ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব" বলছিলেন মায়িশা।

পরিবার সবসময় কাজে উৎসাহ যোগালেও নিজের নানু কাজের ক্ষেত্রে আরও বেশি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে বলে জানাচ্ছিলেন মায়িশা।

"আমরা নারী আমরা সব পারি নানুকে দেখে এটা আমি বুঝতে শিখেছি। আমার নানু মৌলভিবাজার জেলার প্রথম আইনজীবী ছিলেন। নানু সবসময় লক্ষ্যে স্থির থাকতেন, তাকে কখনও আমি হেরে যেতে দেখিনি"।

বাবা মায়ের সঙ্গে শিশু মায়িশা

ছবির উৎস, Maisha Rahman

ছবির ক্যাপশান, বাবা মায়ের সঙ্গে শিশু মায়িশা

ছেলেবেলার স্মৃতিচারণে মায়িশার মনে বড় জায়গা করে আছে তার দাদুভাই। আলাপকালে জানালেন ছোটবেলার একটি দিনের কথা -

"আমার দাদাতো সেই সময়ের চা ম্যানেজার, তিনি খুব কড়া মেজাজের মানুষ ছিলেন। উনি যখন বাগান থেকে আসতেন তখন আমি দেখতাম উনি শার্ট, সানগ্লাস, কেপ, শর্টস পরা- ওই ড্রেসে গাড়ি থেকে নেমে আসছেন"।

"পেছনে বন্দুক নিয়ে পাইক পেয়াদারা আসছেন। তারা দৌড়ে এসে উনার স্যান্ডেল এগিয়ে দিচ্ছে। উনি যখন আসতেন তখন পুরো বাসা কেমন যেন থমথম হয়ে যেত। আমি তখন ছোট ছিলাম। দাদুভাই যখন আসতো, বাসার ভেতরে আমি ভয়ে দরজার পেছনে লুকায়ে থাকতাম। মনে হতো দাদুভাই কেন এখন আসল, কখন আবার বের হবে - এমন ভাবতাম..."

"কিন্তু বিকালে দাদুভাইয়ের চেহারা পাল্টে জেত, উনি তখন ভিন্নধর্মী মানুষ। সেই রাগী দাদুভাই হারিয়ে যেত দুপুরের পড় থেকেই। ওই সময়টা অনেক মিস করি"।

"দাদুভাই এখন বেঁচে নেই, বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই খুশি হতেন আমি এই কাজে যুক্ত হয়েছি দেখে..." নিজের দাদুভাইকে নিয়ে এভাবেই স্মৃতিচারণ করছিলেন মায়িশা।

চা বাগান ও চা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত দাদা আর বাবার গল্পগুলো মায়িশার পথচলার অন্যতম এক অনুপ্রেরণা।

"দাদুভাই যখন শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে যান আমি একটু বড় , তখন আমার আব্বুর গল্পগুলো তিনি বলতেন, নিজের গল্প বলতেন। কীভাবে আব্বু ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, কীভাবে শিক্ষানবিশ থেকে বাংলাদেশের একজন সিনিয়র টি টেস্টার আর বড় নিলামকারীদের একজন হয়ে উঠলেন ।- এই গল্পগুলো শুনতাম, খুব মায়াভরা গল্প করতেন দাদুভাই।"

পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে চা শিল্পের সঙ্গেই নিজেকে যুক্ত রাখার ইচ্ছা মায়িশার। ভিন্ন এই পেশায় আরও অনেক নারী যুক্ত হবেন এমন আশাবাদ প্রকাশ করেন তিনি।

বাবাকে নিয়ে চায়ের নিলাম পরিচালনায়

ছবির উৎস, Maisha Rahman

ছবির ক্যাপশান, বাবাকে নিয়ে চায়ের নিলাম পরিচালনায়
বাবাকে নিয়ে চায়ের নিলাম পরিচালনায়

ছবির উৎস, Maisha Rahman

ছবির ক্যাপশান, এ পর্যন্ত প্রায় ৫২টির মতো চায়ের নিলাম পরিচালনা করেছেন মায়িশা রহমান।