ঢাকা থেকে সরেনি কুমিল্লা-সিলেটের বাস কাউন্টার

যেসব বাস কাউন্টার টার্মিনালের ভেতর চলে যাওয়ার কথা ছিল, সেগুলো এখনো ঢাকার সড়কগুলোয় কাউন্টার বসিয়ে যাত্রী ওঠানামা করছে
ছবির ক্যাপশান, যেসব বাস কাউন্টার টার্মিনালের ভেতর চলে যাওয়ার কথা ছিল, সেগুলো এখনো ঢাকার সড়কগুলোয় কাউন্টার বসিয়ে যাত্রী ওঠানামা করছে
    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

ঢাকার ভেতরে মে মাস থেকে কুমিল্লা এবং সিলেট গামী বাসের কাউন্টার থাকবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিল ঢাকার সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু অনেক বাসই এখনো রাস্তায় কাউন্টার বসিয়ে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে।

দোসরা মের পর থেকে এসব বাসের কাউন্টার শুধুমাত্র বাস টার্মিনালের ভেতরে থাকার কথা।

কিন্তু মঙ্গলবার ঢাকার বিভিন্ন বাস কাউন্টারগুলো ঘুরে সেই ঘোষণার কোন বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।

পরিবহন কোম্পানিগুলো এজন্য টার্মিনালে পর্যাপ্ত জায়গা নেই বলে দাবি করছেন। তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন মালিকদের এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকে।

বাস মালিক ও শ্রমিক সমিতির সঙ্গে পহেলা মার্চ একটি বৈঠকের পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ঘোষণা দিয়েছিলেন, দোসরা মে থেকে সায়েদাবাদ টার্মিনালের ভেতর থেকে কুমিল্লা ও সিলেটগামী বাস ছাড়তে হবে, ঢাকার ভেতর আর এসব বাসের কোন কাউন্টার থাকবে না।

কর্তৃপক্ষ বলছে, কেন দোসরা মের মধ্যে ওই ঘোষণা কার্যকর হলো না, শীঘ্রই একটি বৈঠকে সেটা পর্যালোচনার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

ঢাকার সড়কে যে চিত্র দেখা গেল

ঢাকার আরামবাগে কুমিল্লাগামী একটি পরিবহন লাল-সবুজের কাউন্টারে কথা হচ্ছিল ম্যানেজার শাকিল হোসেনের সঙ্গে।

মি. হোসেন বলছেন, ‘’পহেলা মের মধ্যে টার্মিনালে চলে যেতে হবে, এরকম একটা কথা শুনেছি। কিন্তু আমাদের কাছে এখনো কোন নির্দেশনা আসেনি। আমাদের কাউন্টারগুলো আগের জায়গাতেই আছে।‘’

কুমিল্লা ও সিলেটের বাসগুলোর কর্মীরা বলছেন, টার্মিনালের ভেতর যাওয়ার বিষয়ে কোন নির্দেশনা তারা পাননি
ছবির ক্যাপশান, কুমিল্লা ও সিলেটের বাসগুলোর কর্মীরা বলছেন, টার্মিনালের ভেতর যাওয়ার বিষয়ে কোন নির্দেশনা তারা পাননি
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

দুপুরে যখন তার সঙ্গে কথা বলছিলাম, সেই সময়েই একটি লাল-সবুজ পরিবহনের বাস এসে থামল কাউন্টারের সামনে। কাউন্টার থেকে বেরিয়ে কয়েকজন বেরিয়ে বাসে উঠে গেলেন।

একটু সামনে এগিয়ে কমলাপুরের মোড়ে দেখা গেল লাল-সবুজ, এশিয়া এয়ারকনের কয়েকটি বাস দাঁড়িয়ে আছে। তারা যাত্রীদের বাসে ওঠার জন্য ডাকছেন। ফুটপাতেই ছোট কাউন্টারে টিকিট বিক্রি হচ্ছে।

এশিয়া পরিবহনের একজন কর্মী পারভেজ জানালেন, তারা এভাবে ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রীদের তোলেন। তাদের কোন বাসই কোন টার্মিনালের ভেতর থেকে ছাড়ে না।

একই চিত্র দেখা গেল সিলেটগামী এনা, ইউনিট বাসের ক্ষেত্রেও। ঢাকার আরামবাগ, মহাখালী, সায়দাবাদের রাস্তার ওপর থেকেই টিকেট বিক্রি হচ্ছে, যাত্রীদের বাসে তোলা হচ্ছে বা নামিয়ে দেয়া হচ্ছে।

ইউনিক পরিবহনের একজন ম্যানেজার মোঃ সাইফুল ইসলাম জানালেন, তাদের সবগুলো কাউন্টারই টার্মিনালের বাইরে। ফকিরাপুল, মুগদা, কদমতলী, যাত্রাবাড়ী ইত্যাদিতে কাউন্টার আছে। এসব জায়গা থেকেও যাত্রীরা ওঠানামা করতে পারেন।

পহেলা মে'র মধ্যে কাউন্টারগুলো টার্মিনালের ভেতর নিয়ে যেতে হবে, সেখান থেকেই বাস ছাড়তে হবে, এমন কিছু তার জানা নেই বলে তিনি জানালেন।

আরও পড়তে পারেন:
আন্তঃজেলা বাসগুলো ঢাকার যানজটের অন্যতম কারণ বলে গবেষণায় দেখা গেছে
ছবির ক্যাপশান, আন্তঃজেলা বাসগুলো ঢাকার যানজটের অন্যতম কারণ বলে গবেষণায় দেখা গেছে

সেখানে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল আল-আমিন নামের একজন যাত্রীর সঙ্গে। তিনি কুমিল্লা যাওয়ার জন্য ব্যাগ, মালামাল নিয়ে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

‘’এখান থেকে বাসগুলো যাত্রী তোলে, তাই এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। টার্মিনালের ভেতরে তাদের কাউন্টার থাকলে সেখানেই যেতাম। বরং এভাবে রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়ে ওঠার চেয়ে ভেতরে ওঠাই তো ভালো,’’ তিনি বলছেন।

এরকম কাউন্টার রয়েছে মহাখালী, ফকিরাপুল, মালিবাগ, রামপুরা, পান্থপথেও।

কি বলছেন পরিবহন মালিকরা?

'বাস রুট র‍্যাশনালাইজেশনের' আওতায় গত পহেলা মার্চ মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ, দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বৈঠক হয়।

সেখানেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, দোসরা মের মধ্যে প্রথমে কুমিল্লা এবং সিলেটের বাসগুলোর কাউন্টার সায়দাবাদ বা মহাখালী টার্মিনালের ভেতর নিয়ে যাওয়া হবে। সামনের বছর কাঁচপুরের আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল তৈরি হয়ে যাওয়ার পর চট্টগ্রাম, সিলেট ও কুমিল্লার সব বাস সেখানে চলে যেতে হবে। ঢাকার ভেতরে এসব এলাকার বাস কাউন্টার থাকবে না।

বাস মালিক ও কর্মীদের দাবি, তাদের টার্মিনালের ভেতর যেতে আপত্তি না থাকলেও সেখানে জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে তারা যেতে পারছেন না।

মহাখালী বাস টার্মিনালে বসে কথা বলছিলাম সায়দাবাদ আন্তঃজেলা ও নগর বাস টার্মিনাল মালিক সমিতির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মুশফিকুর মান্নানের সঙ্গে।

‘’আমাদের এই টার্মিনালে এখন ৮০০ বাস থাকে। টার্মিনালে সংস্কারের যেসব কাজ করা হচ্ছে, তাতে হয়তো আর দুইশো-আড়াইশো বাসের জায়গা হতে হবে। কিন্তু কুমিল্লা আর সিলেট রুটে সব মিলিয়ে বাস চলে সাতশোর বেশি। এতো বাসের তো এই টার্মিনালে জায়গা নেই,’’ বলছেন মি. রহমান।

সায়েদাবাস টার্মিনালে জায়গার অপ্রতুলতা রয়েছে বলে বাস মালিকরা দাবি করছেন
ছবির ক্যাপশান, সায়েদাবাস টার্মিনালে জায়গার অপ্রতুলতা রয়েছে বলে বাস মালিকরা দাবি করছেন

তিনি বলছেন, টার্মিনাল আধুনিকায়নের যেসব কাজের কথা বলা হয়েছে, এখনো সেসব কাজ শেষ হয়নি। ফলে দোসরা মে’র মধ্যে যেসব পরিবহনের আসার কথা বলা হয়েছিল, তাদের পক্ষে আসা সম্ভব হয়নি।

বাস মালিকদের দাবি, ঢাকার বাইরে যেসব টার্মিনাল তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেগুলো হয়ে গেলে অনেক বাস হয়তো সেখানে চলে যাবে। তখন জায়গা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু যে সময়ের মধ্যে বাস কাউন্টারগুলো টার্মিনালের ভেতর নিয়ে আসার ঘোষণা দেয়া হচ্ছে, সেই সময়ের মধ্যে সেটির বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না বলেই তার সন্দেহ।

‘’আমাদের টার্মিনালের ভেতর যেতে আপত্তি নেই, কিন্তু আমাদের বাসগুলো থাকার জায়গা করে দেয়া হোক। শহরের বাইরে যেসব টার্মিনাল করার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে কি মানুষের যাতায়াতের সুব্যবস্থা আছে। সেটা না করলে কি মানুষ সেখান যাবে?’’ তিনি বলছেন।

কেন বাস কাউন্টারগুলো টার্মিনালে আসছে না

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টার্মিনালে যেমন জায়গার সংকট আছে, তেমনি বাস মালিকদেরও পুরোপুরি টার্মিনালের ভেতর চলে যাওয়ার অনীহা রয়েছে। কারণ তাদের আশঙ্কা, এর ফলে তাদের যাত্রী কমে যেতে পারে।

আবার এই মালিক-শ্রমিকরা রাজনীতির সঙ্গে নানাভাবে জড়িত থাকায় সরকারও তাদের বাধ্য করতে পারছে না।

বুয়েটের অধ্যাপক ও এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক মোঃ. হাদিউজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, বাসগুলোকে টার্মিনালে নিয়ে আসতে না পারার পেছনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবই প্রধান কারণ।

‘’মূল চ্যালেঞ্জ হলো, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। এটা কিন্তু নানা গবেষণায় পরীক্ষিত, ঢাকার যানজট কমানোর জন্য শহরের ভেতর থেকে আন্তঃজেলা বাসগুলোকে টার্মিনালের ভেতরে নিতে হবে। কিন্তু টার্মিনালের সক্ষমতার তুলনায় বাসের সংখ্যা বেড়ে গেছে। ফলে তারা রাস্তার ওপর রেখে দেয়, রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলে, তাই যানজট হয়, জনগণের ভোগান্তি বাড়ে।‘’

‘’নানা ফিজিবিলিটি স্টাডিতে দেখতে পেয়েছি, এই সমস্যার সমাধানে ঢাকার বাইরে টার্মিনালগুলো সরিয়ে নিতে হবে। সেজন্য কিন্তু অনেক ব্যয়ও করা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে সেটা কার্যকর হচ্ছে না, প্রকল্পগুলো ঝুলে রয়েছে,’’ তিনি বলছেন।

আরও পড়তে পারেন:
এখনো সড়কের ওপর থেকেই যাত্রী ওঠানামা করছে দূরপাল্লার বেশিরভাগ পরিবহন
ছবির ক্যাপশান, এখনো সড়কের ওপর থেকেই যাত্রী ওঠানামা করছে দূরপাল্লার বেশিরভাগ পরিবহন

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালিক এবং শ্রমিকদের নানা সংগঠনের শীর্ষ পদে রয়েছেন রাজনৈতিক নেতারা। ফলে তাদের স্বার্থ বিরোধী হলেই যে বাধা আসে, সেটা ডিঙিয়ে অনেক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলছেন, ‘’ঢাকার ভেতরে যতক্ষণ টার্মিনালগুলো থাকবে, সক্ষমতা না থাকায় ততক্ষণ বাসগুলো এদিকওদিক রাখবে, রাস্তার ওপর দাঁড়াবে। আসল সমস্যার আসলে সমাধান হবে না। এই টার্মিনালগুলোকেই আসলে ঢাকার বাইরে নিয়ে যেতে হবে।‘’

তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন, বড় বড় প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনাও এমনভাবে করতে হবে, যাতে যাত্রীরা সহজেই শহরের বাইরের এসব টার্মিনালে যাতায়াত করতে পারেন।

কি বলছে কর্তৃপক্ষ?

পূর্বের ঘোষণার বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে মালিক-শ্রমিকদের সদিচ্ছার অভাব মূল কারণ বলে মনে করছেন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক সাবিহা পারভিন।

তিনি বলছেন, ‘’আমরা তো শহরের যানজট কমানোর জন্যই, সবার নিরাপদ যাতায়াতের জন্যই নানা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাস কাউন্টারগুলো বন্ধ করে টার্মিনালে নিয়ে যেতে চাইছি। তাদের সম্মতিতেই কিন্তু এই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন কেন তারা যাননি, কেন সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন হলো না, সেটা আমরা পর্যালোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবো।।‘’

এই মাসের নয় তারিখে এই সংস্থার একটি ফলোআপ বৈঠক রয়েছে। সেখানে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে বলে তিনি জানান।

‘’শহরের ভেতরে কোন বাসের কাউন্টার থাকবে না, তাদের টার্মিনালের ভেতরে যেতেই হবে। কিন্তু যে বিশৃঙ্খলা দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়েছে, একদিনেই তো আর সেটার সমাধান হবে না। কিন্তু আমরা কাজ করে যাবো। প্রয়োজনে আমরা এনফোর্সমেন্টের দিকে যাব,’’ তিনি বলছেন।