গণপরিবহন: ঢাকায় বাসের নিয়ন্ত্রণ আসলে কাদের হাতে, বিশৃঙ্খলার শেষ কোথায়

- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ঢাকার গণপরিবহন, বিশেষ করে বাস মিনিবাস চলাচল ও ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলার জন্য বিশ্লেষক ও যাত্রীরা মালিকদের দায়ী করলেও মালিকরা বলছেন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য তারা কর্তৃপক্ষের সাথে একযোগেই কাজ করছেন।
কিন্তু তারপরেও পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হয় না কেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে কয়েকজন মালিক জানিয়েছেন রাস্তাঘাটের নৈরাজ্য আর অসহনীয় যানজটসহ নানা কারণে সাধারণ বাস ব্যবসায়ীরা টিকতে পারছে না।
"পুরনো বাস ব্যবসায়ীরা এখন আর তেমন নেই। তারা ঝরে গেছেন। নতুন যারা নিয়ন্ত্রণ করছেন তাদের অনেকেই রাজনীতি সংশ্লিষ্ট। ব্যাংক লোন, রুট পারমিট পাওয়াসহ নানা কারণে বাস সেক্টরটাই রাজনীতির মধ্যে চলে গেছে যেটি এ খাতে নৈরাজ্যকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে," বলছিলেন একজন মালিক, যিনি গত পনের বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত।
তবে এ মতের সাথে একমত নন মিরপুর থেকে চলাচল কারী বিহঙ্গ পরিবহন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির উদ্দিন খোকন।
এ কোম্পানির চেয়ারম্যান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য।
যদিও নাসির উদ্দিন খোকন বলছেন ওই সংসদ সদস্য বাস বা কোম্পানি পরিচালনার ক্ষেত্রে কোন প্রভাব বিস্তার করেন না।
তবে বাস্তবতা হলো মালিকদের বেশিরভাগই হয় রাজনৈতিক দলের সাথে সংযুক্ত বা প্রভাবশালী নেতাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান অবশ্য বলছেন, মানুষকে জিম্মি করে ধর্মঘট দিয়ে দাবী আদায়ে সরকারকে বাধ্য করার চেষ্টা বাস ও লঞ্চ মালিকদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায়, কারণ এসব সমিতিগুলোতে রাজনৈতিক নেতাদেরই আধিপত্য।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির নেতৃত্বে আছেন আওয়ামী লীগের গত সরকারের প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির নেতা মসিউর রহমান রাঙ্গা ও আওয়ামী লীগের ঢাকা দক্ষিণ কমিটির সহ সভাপতি এনায়েত উল্ল্যাহ।
এনায়েত উল্ল্যাহ আবার ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতির নেতৃত্বে আছেন এবং তিনি এবং তার সমর্থক মালিকরাই মূলত এখন কর্তৃত্ব করছেন বলে মালিকরা বলছেন।
এনায়েত উল্ল্যাহ অবশ্য জোর দিয়ে বলেছেন তারা রাজনীতি আর পরিবহনকে একাকার করেননি।
"পরিবহন একটি ব্যবসা। এটি ঢাকায় আর লাভজনক কিছু না। বিশৃঙ্খলা আমরা করছি না বরং বিশৃঙ্খলা নিরসনে আমরা সহায়তা করি সবসময়। কিন্তু ঢাকার রাস্তাঘাট, যানজটসহ এমন কিছু সমস্যা আছে যার কারণে বাস চালিয়ে লাভ করা কঠিন হয়ে পড়েছে," বলছিলেন তিনি।
এর বাইরেও ঢাকায় বাস নিয়ন্ত্রণ করছেন এমন শীর্ষস্থানীয় যে তিন চার জনের নাম শোনা যায় তারা সবাই পরিবহন খাতের প্রভাবশালী সাবেক এক মন্ত্রীর লোক হিসেবেই পরিচিত।

ছবির উৎস, Getty Images
অনেক অভিযোগ যাত্রীদের
মিরপুরের কাজীপাড়া থেকে নিয়মিত মতিঝিলে বাসে যাতায়াত করেন মাহমুদ রিতু। বিবিসিকে তিনি বলছেন কয়েকবছর আগেও বড় বাসে কিছুটা স্বস্তিতে চলাচল করতে পারলেও এখন সেই বাসই নেই।
"লক্করঝক্কর বাস। ঠাসাঠাসি করে বসে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে চলাচল করি। এ যে কী অভিজ্ঞতা বলে বোঝানো যাবে না," বলছিলেন তিনি।
মোহাম্মদপুর থেকে গুলশান এক নম্বরে আসেন ব্যাংক কর্মকর্তা তানজিনা ইসলাম।
"একেক সময় ভাড়া নিয়ে যে আচরণের শিকার হই তা অবিশ্বাস্য। হেলপার যে আচরণ করে যাত্রীদের সাথে এটা সভ্য দেশে হয় কিনা জানি না। কিন্তু কি করবো বলেন। মেনে নিয়েই চলতে হবে," বলছিলেন তিনি।
অন্যদিকে হাতিরপুলের নীপা বিশ্বাস বলছেন কারওয়ানবাজার থেকে মেয়েদের বাসে ওঠা সত্যিকার অর্থেই কঠিন এক কাজ।
"অনেক সময় নারীদের বাসে তুলতেই চায় না। দরজা বন্ধ করে রাখে। অনেকে ঝুঁকি নিয়েই ওঠেন"।
মালিকদের কয়েকজন বলছেন যে তারা এখন চালকদের সতর্ক করছেন প্রতিনিয়ত যাতে যাত্রীদের সাথে খারাপ আচরণ না করে।
নাসির উদ্দিন খোকন বলছেন তাদের কোম্পানির চালকদের সাথে এ নিয়ে কাজ করছেন তারা।
মালিক অনেকে কিন্তু নিয়ন্ত্রক কয়েকজন
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির হিসেবে দিনে ঢাকায় বাস চলাচল করে ৫-৬ হাজার। কয়েকটি কোম্পানির অধীনেই এরা চলাচল করে।
"আর এ কোম্পানি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের কাছে আমরা সাধারণ বাস মালিকরাও জিম্মি," বলছিলেন একজন মালিক যিনি তার নাম প্রকাশ করতে রাজী হননি।
মালিকরা বলছেন মূলত তিনজন ব্যক্তির হাতেই পুরো পরিবহন খাত বিশেষ করে রাজধানীর বাস চলাচল জিম্মি হয়ে পড়েছে এবং এ তিনজনই সরকারি দল বা সরকার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে উঠতে পারছে না সরকার।
"মূলত এ তিনজনের ঘনিষ্ঠ আরও কিছু রাজনৈতিক নেতাই ঢাকায় চলাচলকারী বাসগুলোকে কোম্পানিগুলোর প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য নিয়ন্ত্রক," বলছিলেন ওই মালিক।
জানা গেছে মূলত রুট অনুযায়ী কোম্পানিগুলোতে গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন মালিকের বাস থাকে। এসব মালিকরা কেউ সরাসরি কেউ বা পরোক্ষভাবে পরিবহন ব্যবসা করছেন।
কেউ বাস কিনে এসব কোম্পানিতে দিয়েছেন আবার কেউ প্রভাবশালী হওয়ায় এমনিতেও কর্তৃত্ব করছেন এমন দৃষ্টান্তও আছে ঢাকায়।

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN
চাঁদা দিতে হয় প্রতিদিন
একাধিক মালিক জানিয়েছেন তাদের দিনে অন্তত পাঁচশ টাকা শুধু চাঁদা দিতে হয়। এর মধ্যে ৪০০ টাকা দিতে হয় বাস যে কোম্পানিতে আছেন সেই কোম্পানিকে আর একশ টাকা দিতে হয় ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিকে।
কিন্তু মালিক হিসেবে তারা এর কোন সুবিধা পান না।
আবার আগে কোম্পানি থেকে বাসের সুপারভাইজারদের বেতন দেয়া হতো এখন সেটিও বন্ধ আছে।
এসব সুপারভাইজাররা নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর বাসের যাত্রী সংখ্যা গণনা করে একটি খাতায় লিপিবদ্ধ করে।
"এখন কোম্পানির কাছ থেকে টাকা না পেয়ে সুপারভাইজার একটি বাসের প্রতিটি চেকিং পয়েন্টে যাত্রী গণনার পর দশ টাকা করে নিয়ে নিচ্ছে। অর্থাৎ মিরপুর ১২ থেকে মতিঝিল যাওয়ার পর ৩/৪ টি জায়গাতেই একটি বাস থেকে ৩০/৪০ টাকা নিয়ে নিচ্ছে একজন সুপারভাইজার," বলছিলেন একজন মালিক।
আবার একটি কোম্পানিতে ৩৫টি গাড়ী রাখার কথা থাকলেও মূলত আরও অনেক বেশি গাড়ী চালাচ্ছে কোম্পানিগুলো যেগুলো নিয়ে কখনো কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।
ঢাকায় কত গাড়ি, কত রুট
ঢাকায় এখন ২৯১ টি রুট আছে এবং এসব রুটে ৫/৬ হাজার বাস-মিনিবাস চলে।
চলমান নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি কাটিতে উঠতে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ ৪২টি সমন্বিত রুটের খসড়া তৈরি করলেও এখন তাতে মালিকদের পূর্ণ সমর্থন মেলেনি।
নতুন পরিকল্পনায় আড়াই হাজার বাস মালিক থাকবেন ২২টি কোম্পানির অধীনে এবং প্রস্তাবিত ৪২ রুটে থাকবে ছয়টি রঙের বাস।
বাস মালিকদের একজন নাসির উদ্দিন খোকন বলছেন, তারা এখনো এটি পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি বলেই সব মালিক এখনো তাতে যুক্ত হয়নি।
"যেটি ভালো হবে, সড়কে শৃঙ্খলা আসবে যা করলে সেটিই আমরা করবো," বলছিলেন তিনি।
তবে নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলছেন, "একটি সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি ঢাকার বাস চলাচল"।
"এ চক্র ভাঙ্গতে না পারলে সড়কে শৃঙ্খলা আনা কঠিন হবে। ঢাকার দুই মেয়র চেষ্টা করছেন কিছুটা। তারা সফল হলে বোঝা যাবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে কিনা," বলছিলেন তিনি।









