আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
পাকিস্তানে ধর্মান্তরিত ভারতীয় নারীকে কেন ফেরত না পাঠানোর চিন্তা ইসলামাবাদে?
- Author, শুমায়েলা খান, এহতেশাম শামি
- Role, বিবিসি নিউজ উর্দু, ইসলামাবাদ
যে ভারতীয় নারী পাকিস্তানে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সেদেশের এক নাগরিককে বিয়ে করেছিলেন, সেই সরবজিৎ কউরকে আদৌ ভারতে ফেরত পাঠানো হবে কি না, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে ইসলামাবাদ।
ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পরে সরবজিৎ কউরের নতুন নাম হয়েছে নূর ফাতিমা।
ভারতে মুসলমানদের প্রতি বর্তমান সময়ে যে আচরণ করা হচ্ছে, সেই প্রেক্ষিতেই নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করছে পাকিস্তানের সরকার।
মিজ. কউরকে গত সপ্তাহেই ভারতে ফেরত পাঠানো হতে পারে বলে এর আগে পাকিস্তানের এক মন্ত্রী বিবিসিকে জানিয়েছিলেন।
কিন্তু এখন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী বলেছেন, সরবজিৎ কউরকে যাতে ভারতে না পাঠানো হয়, সেই আবেদন মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সরবজিৎ কউর একদল শিখ তীর্থযাত্রীর সঙ্গে চৌঠা নভেম্বর ভারত থেকে পাকিস্তানে যান এবং তার ভিসার মেয়াদ ১৩ই নভেম্বর শেষ হয়ে গিয়েছিল।
তবে তিনি ভারতে ফিরে যাননি। সেদেশেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পরে, পাঞ্জাবের বাসিন্দা নাসির হুসেনকে বিয়ে করে পাকিস্তানেই থেকে যান।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
কেন নতুন ভাবনা পাকিস্তানের?
বিবিসির উর্দু বিভাগকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী বলেছেন যে সরবজিৎ কউর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এবং যেহেতু ভারতে মুসলমানদের জীবন খুব কঠিন, তাই তাকে ফেরত পাঠানো উচিত নয়।
"এই সিদ্ধান্ত মানবিক দিক থেকে সহানুভূতির সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে সেদেশে (ভারতে) সংখ্যালঘুদের সঙ্গে যে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিষয়টিতে অগ্রগতি হচ্ছে এবং চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে তাকে ফেরত না পাঠাতে হয়," জানিয়েছেন মি. চৌধুরি।
লাহোর হাইকোর্টে সরবজিৎ কউরের দায়ের করা পিটিশনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, "আদালতও একই কথা বলেছে এবং এতে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মতামত প্রয়োজন। তারপরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে," জানিয়েছেন তালাল চৌধুরী।
সরবজিৎ কউর ভারতীয় গুপ্তচর কি না সেটা জানতে যে তদন্ত চলছে, সেই প্রসঙ্গে মন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, "আমাদের এজেন্সিগুলি এসব ব্যাপারে কাজ চালাতেই থাকে। এখন তার আবেদন বিচারাধীন অবস্থায় আছে, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে বিষয়টি যেন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয় এবং ভারতে সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণেরও উল্লেখ করেছেন তিনি।
"উনি এখন দার-উল আমনে থাকছেন। সব দিক থেকে বিচার বিবেচনা করেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে," বলেছেন, মি. চৌধুরি।
তার মতে, আপাতত মিজ. কউরের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে আর অন্যান্য কিছু সুবিধাও দেওয়া হতে পারে।
ধর্মীয় ভিসা নিয়ে বিতর্ক
'পাকিস্তান শিখ গুরদোয়ারা প্রবন্ধক কমিটি'র প্রাক্তন প্রধান এবং প্রাক্তন সংসদীয় সচিব সরদার মহেন্দ্রপাল সিং লাহোর হাইকোর্টে একটি পিটিশন দায়ের করেছিলেন, যাতে ভারতীয় নাগরিক সরবজিৎ কউরকে ভারতে প্রত্যর্পণ করা হয়।
মিজ. কউরকে ভারতে ফেরত পাঠানোর পরিবর্তে তার ভিসার মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে বলে এখন পাকিস্তানের মন্ত্রী যে নতুন তথ্য দিয়েছেন, তার প্রতিক্রিয়ায় সরদার মহেন্দ্রপাল সিং বিবিসিকে বলেন, "সরকার যদি সরবজিৎ কউরের ভিসার মেয়াদ বাড়ায়, তবে তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হবে, কারণ তিনি যদি পর্যটক ভিসায় আসতেন, তাতে আমার কোনও আপত্তি থাকত না। কিন্তু তিনি তো ধর্মীয় ভিসায় এসেছিলেন।"
তার প্রশ্ন, "যদি কোনো হিন্দু সৌদি আরবে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, তাহলে কি সৌদি আরব তাকে সেখানে থাকতে দেবে?
সরদার মহেন্দ্রপাল সিংয়ের মতে, "সরবজিৎ কউর শিখদের প্রথম ধর্মগুরু বাবা গুরু নানক দেবজির জন্মদিন উদ্যাপন করতে ভারত থেকে পাকিস্তানে এসেছিলেন, কিন্তু এই ঘটনা একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে বিতর্কিত করে তুলেছে।
"তার ইসলাম গ্রহণে আমাদের কোনো আপত্তি নেই, বিশ্বের অনেক মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। আমার আপত্তি হলো, ধর্মীয় তীর্থযাত্রার ভিসা ব্যবস্থাকেই বিতর্কিত করে দেওয়া হয়েছে। একটা পবিত্র অনুষ্ঠানকে ঘিরে বিতর্ক হচ্ছে," বলছিলেন মি. সিং।
তিনি আরও বলেন, "ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও যদি কোনও ব্যক্তি থেকে যান, তবে তা বেআইনি কাজ এবং আইন অনুসারে তাকে এর পরিণতি ভোগ করতে হবে।"
যেভাবে আটক সরবজিৎ কউর ও তার স্বামী
সরবজিৎ কউর চৌঠা নভেম্বর একদল শিখ তীর্থযাত্রীর সঙ্গে পাকিস্তানে যান এবং তার ভিসার মেয়াদ ছিল ১৩ই নভেম্বর পর্যন্ত। তবে তিনি ভারতে ফেরেননি।
পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী রমেশ সিং অরোরা বিবিসি উর্দুকে বলেছিলেন যে চৌঠা জানুয়ারি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা খবর পান যে, নানকানা সাহিবের কাছে একটি গ্রামে সরবজিৎ কউর এবং নাসির হুসেন রয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গেই প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়।
পাকিস্তানের নানকানা সাহিব শিখ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অতি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। ভারতীয় শিখদের ওই তীর্থক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য পাকিস্তান বিশেষ ধর্মীয় ভিসা দিয়ে থাকে।
তিনি জানিয়েছিলেন যে, ওই অভিযানে সরবজিৎ কউর ও তার পাকিস্তানি স্বামীকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তাদের নানকানা সাহিব পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
পুলিশ এবং ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর কর্মকর্তারা যৌথভাবে বিষয়টির তদন্ত করছেন বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
গত বৃহস্পতিবার, আটই জানুয়ারি তাকে আটারি-ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে ভারতে ফেরত পাঠানো হতে পারে জানিয়েছিলেন মি. অরোরা।
তিনি বিবিসিকে আরও বলেছিলেন যে এর আগে বেশ কয়েকবার তিনি ভিসার জন্য আবেদনও করেছিলেন। তবে আইনগত বাধার কারণে তাকে ভিসা দেওয়া হয়নি।
"তিনি ধর্মীয় ভিসায় এসেছিলেন এবং ভিসার শর্ত মেনেই দেশে থাকার কথা ছিল তার। প্রথম থেকেই এ ব্যাপারে আমার অবস্থান স্পষ্ট ছিল," বলেছিলেন মি. আরোরা।
দম্পতিকে হয়রানি না করার নির্দেশ আদালতের
রমেশ সিং আরোরার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর চৌঠা নভেম্বর নাসির নানকানা সাহিবে যান। সেখান থেকে তিনি সরবজিৎ কউরকে নিয়ে তার পৈতৃক ভিটা ফারুকাবাদের শেখুপুরায় পৌঁছন।
সরবজিৎ কউরের আবেদন মেনে নিয়ে গত নভেম্বর মাসে লাহোর হাইকোর্ট পুলিশকে নির্দেশ দেয় যে তাকে যে হয়রানি না করা হয়।
মিজ. কউরের আইনজীবী আহমেদ হাসান পাশা বিবিসিকে জানিয়েছিলেন যে পাঞ্জাব পুলিশ তার মক্কেলদের সন্ধানে আটই নভেম্বর নাসির হুসেনের বাড়িতে তল্লাশি অভিযান চালায় এবং তাদের ওপরে বিয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য চাপ দেওয়া হয়।
আহমদ হাসান পাশার কথায়, তারা সরবজিৎ কউর ও নাসির হুসেনের দাম্পত্য জীবনে হস্তক্ষেপ না করার জন্য আদালতকে আবেদন করেছিলেন।
লাহোর হাইকোর্টের বিচারপতি ফারুক হায়দার মিজ. কউরকে হয়রানি না করার নির্দেশ দেন পুলিশকে।
তবে শেখুপুরা পুলিশের মুখপাত্র রানা ইউনুস বিবিসি উর্দুকে আগে বলেছিলেন, "পুলিশ কোনো ভারতীয় নারী বা তার পাকিস্তানি স্বামীকে হয়রানি করেনি। এ নিয়ে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা বাস্তব ঘটনার বিপরীত। এর সঙ্গে পুলিশের কোনো সম্পর্ক নেই।"
তিনি আরও বলেন, "বিষয়টি স্পর্শকাতর, অনেকগুলো তদন্ত সংস্থা এটি খতিয়ে দেখছে। যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হবে তা পাকিস্তানের আইন অনুযায়ী হবে।"
সরবজিৎ কউরের আইনজীবী বলেছিলেন যে তিনি ১৫ই নভেম্বর তাদের দুজনকে নিজের চেম্বারে ডেকেছিলেন যাতে তারা কর্তৃপক্ষের সামনে নিজেদের বক্তব্য রেকর্ড করতে পারেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ওই দম্পতি আসেনি এবং তখন থেকেই নাসির হুসেনের মোবাইল ফোনও বন্ধ হয়ে যায়।
ভারতের পাঞ্জাব থেকে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে
সরবজিৎ কউর ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের কাপুরথালা জেলার বাসিন্দা। কাপুরথালা পুলিশ জানিয়েছে, এই মামলার তদন্ত চলছে।
সরবজিৎ কউর প্রায় দুই হাজার শিখ তীর্থযাত্রীর একটি দলের অংশ ছিলেন।
দলটি ১০ দিনের সফর শেষ করে ১৩ই নভেম্বর ভারতে ফিরে আসে, কিন্তু সরবজিৎ কউর তাদের সঙ্গে ফেরেননি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, সরবজিৎ কউরের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গেছে এবং তার আগের বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে দুটি ছেলে রয়েছে। সংবাদমাধ্যম থেকেই জানা যায় যে সরবজিৎ কউরের স্বামী প্রায় তিন দশক ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন।
ওদিকে নাসির হুসেন একজন ভূমি মালিক।
তার সঙ্গে নয় বছর আগে আলাপ হয়েছিল বলে মিজ. কউর একটি ভিডিওতে দাবি করেছিলেন। সামাজিক মাধ্যমেই দুজনের মধ্যে যোগাযোগ ছিল।
গত বছর সাতই নভেম্বর শেখুপুরার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দায়ের করা বয়ান অনুযায়ী মিজ. কউর জানিয়েছিলেন যে পাকিস্তানে আসার পরে তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নাসির হুসেন নামে একজন পাকিস্তানি নাগরিককে বিয়ে করেন।
আদালতে জমা দেওয়া 'নিকাহনামা' অনুযায়ী নাসির হুসেনের বয়স ৪৩ বছর, আর মিজ. কউরের বয়স ৪৮ বলে লেখা হয়েছে। ওই নথিতেই উল্লেখ রয়েছে যে নাসির হুসেন বিবাহিত এবং দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য তার কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই।
সরবজিৎ কউরের আইনজীবী বলছেন এদের দুজনের বিয়ের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন কাউন্সিলে নিবন্ধিত হয়েছে।