'হতবাক': ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া

ছবির উৎস, Reuters
- Author, ক্লেয়ার কিনান
- Role, বিবিসি সাংবাদিক
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের আটক করার ঘটনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন— কেউ জানিয়েছে নিন্দা, কেউবা সমর্থন।
শনিবার ভেনেজুয়েলায় বড় ধরনের সামরিক হামলার পর নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে আটক করে দেশটি থেকে সরিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী। তাদের বিরুদ্ধে নিউইয়র্কে মাদক সংশ্লিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, মাদুরোর শাসনের সমাপ্তিতে তার সরকার 'কোনো অনুতাপ প্রকাশ করবে না'।
লাতিন আমেরিকার পার্শ্ববর্তী দেশগুলো এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে, তেমনি নিন্দা জানিয়েছে ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের মিত্র দেশ রাশিয়া ও চীন।
চীন বলেছে, সার্বভৌম একটি দেশ ও তার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তির প্রয়োগে বেইজিং 'হতবাক ও কড়া নিন্দা' জ্ঞাপন করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে 'সশস্ত্র আগ্রাসন' চালানোর অভিযোগ এনেছে রাশিয়া।
ইরান এই হামলাকে 'দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন' হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় 'যতক্ষণ না আমরা নিরাপদ, যথাযথ ও বিচক্ষণভাবে ক্ষমতার স্থানান্তর নিশ্চিত করতে পারি' ততক্ষণ দেশটি 'পরিচালনা' করবে যুক্তরাষ্ট্র।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
লাতিন আমেরিকার অনেক নেতা যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এক্সে লিখেছেন, এই পদক্ষেপ 'অগ্রহণযোগ্য সীমা পার করেছে'। তিনি আরো যোগ করেন যে 'আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে অন্য দেশগুলোতে আক্রমণ করা সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতার পথে প্রথম পদক্ষেপ'।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এই হামলাকে লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আর চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বোরিক 'উদ্বেগ ও নিন্দা' জ্ঞাপন করে 'দেশটির গভীর সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে'র জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াছ-কানে যুক্তরাষ্ট্রকে 'ফৌজদারি হামলা'য় অভিযুক্ত করেছেন। সরকারি এক বিবৃতিতে উরুগুয়ে বলেছে, 'মনোযোগ ও গভীর উদ্বেগের সঙ্গে' তারা ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করছে এবং 'সব সময় যেমন করে এসেছে, তেমন এবারও সামরিক হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করছে'।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে কিউবা এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত নীতি-অভিযানের অংশ হতে পারে। তিনি দেশটিকে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, মাদুরোর প্রশাসনকে সমর্থনকারী অযোগ্য নেতাদের দিয়ে পরিচালিত বিপর্যস্ত এক দেশ কিউবা। কাজেই হাভানার সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
সংবাদ সংস্থা রয়টার্স-এর খবর অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেইয়ো নাগরিকদের শান্ত থাকার এবং দেশের নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর ওপর বিশ্বাস রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্বকে এই হামলার বিষয়ে আওয়াজ তুলতে হবে হবে মন্তব্য করেছেন তিনি।
তবে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জাভিয়ার মিলেই—যাকে ট্রাম্প তার 'প্রিয় প্রেসিডেন্ট' হিসেবে বর্ণনা করেছেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, 'স্বাধীনতা এগোচ্ছে' এবং 'জয় হোক স্বাধীনতার'।

ছবির উৎস, Getty Images
এদিকে, ভেনেজুয়েলায় সামরিক পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে চান না বলে জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার।
শনিবার সকালে বিবিসি-র সানডে উইথ লরা কুয়েন্সবার্গ নামের প্রোগ্রামে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা করেননি।
তিনি বলেন, সব তথ্য নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় আছেন, তবে বিষয়টি এড়িয়ে যাবেন না। তিনি নিজেকে 'আন্তর্জাতিক আইনের আজীবন সমর্থক' বলেও উল্লেখ করেন।
যুক্তরাজ্য হামলায় সরাসরি যুক্ত ছিল না এবং কিয়ার বলেছেন, তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে এই অভিযান নিয়ে কথা বলেননি।
পরে শনিবারই তিনি এক্সে পোস্ট করেছেন, যুক্তরাজ্য 'মাদুরোকে অবৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে গণ্য করে এবং তার শাসনের ইতির জন্য আমরা কোনো অনুতাপ প্রকাশ করি না'।
তিনি আরও বলেন, সামনের দিনে যুক্তরাজ্য সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবে, যাতে ভেনেজুয়েলার জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত হয়—এমন একটি বৈধ সরকারের কাছে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করা যায়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাস জোটের অবস্থান আবারও তুলে ধরে বলেছেন, মাদুরোর বৈধতা নেই, সেখানে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পালাবদল হওয়া উচিত এবং আন্তর্জাতিক আইনের মূলনীতির প্রতি সম্মান রাখতে হবে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এক্সে পোস্ট করে বলেন, ক্ষমতার পালাবদল 'শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধাশীল' হতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী গনজালেস এই পালাবদল নিশ্চিত করতে পারবেন।

ছবির উৎস, Getty Images
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান বৈধ কি না—তা জটিল বিষয়, তবে সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক আইন মানতে হবে।
তিনি সতর্ক করেছেন, 'ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে দেওয়া যাবে না'।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বরাতে তার মুখপাত্র বলেন, 'আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মাবলী মানা হয়নি বলে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন' তিনি।
হামলাটি নিয়ে 'গভীরভাবে উদ্বিগ্ন' জাতিসংঘ মহাসচিব এবং বলেছেন, এটি একটি 'বিপজ্জনক নজির' তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে, সিনেটের মাইনোরিটি লিডার চাক শুমার (ডেমোক্র্যাট) বলেছেন, 'সুস্পষ্টভাবে বলি, মাদুরো অবৈধ স্বৈরশাসক, কিন্তু কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এবং পরবর্তী পরিকল্পনা ছাড়া সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া বেপরোয়া।'
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু 'স্বাধীনতা ও ন্যায়ের পক্ষে সাহসী ও ঐতিহাসিক নেতৃত্বের' জন্য ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিতা আনন্দ বলেন, 'কানাডা সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মানতে আহ্বান জানাচ্ছে। আমরা ভেনেজুয়েলার জনগণের পাশে আছি, যারা শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক সমাজে বসবাস করতে চায়।'
তিনি আরও বলেন, কানাডা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ এইডে বলেছেন, 'আন্তর্জাতিক আইন সার্বজনীন এবং সব রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।'








