বিদেশি পণ্যে 'বাজার সয়লাব', তাই ওষুধ, ট্রাক ও কিচেন ক্যাবিনেটে নতুন শুল্ক বসালেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে আরও কিছু শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন বৃহস্পতিবার।

নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা না গড়ে তুললে, ওই কোম্পানির ওষুধ আমদানিতে শতভাগ শুল্ক আরোপিত হবে।

এছাড়া, সব ধরনের ভারী ট্রাকে ২৫ শতাংশ এবং রান্নাঘর ও বাথরুমের ক্যাবিনেটে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণাও দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

নতুন শুল্কের এই ঘোষণা মি. ট্রাম্প দিয়েছেন তার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে।

তার দাবি, বাইরের দেশ থেকে বিপুল পরিমাণে এসব পণ্য এসে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে, যা আমেরিকার উৎপাদকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

"বৈদেশিক আমদানি থেকে স্থানীয় উৎপাদকদের রক্ষায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে," লিখেছেন মি. ট্রাম্প।

নতুন করে আর শুল্ক আরোপ না করতে হোয়াইট হাউজের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের অনুরোধ সত্ত্বেও পিছপা হয়নি প্রশাসন।

বরং যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পকে রক্ষায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলছে তারা।

বিবিসি বাংলার আরো খবর:

ভারী ট্রাকের ওপর শুল্ক আরোপের উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাতাদের "অন্যায্য বিদেশি প্রতিযোগিতা" থেকে রক্ষা করা, এমন দাবি ট্রাম্পের।

তিনি উল্লেখ করেন, পিটারবিল্ট ও ম্যাক ট্রাকস্-এর মতো কোম্পানিগুলো এই শুল্কের ফলে উপকৃত হবে।

"এই কোম্পানিগুলো বাইরের চাপ থেকে সুরক্ষিত থাকবে," যোগ করেন মি. ট্রাম্প।

রান্নাঘর ও বাথরুমের ক্যাবিনেটসহ কিছু আসবাবপত্রে নতুন শুল্কের কারণ হিসেবেও একই ধরনের বক্তব্য প্রেসিডেন্টের।

এক্ষেত্রেও, "ব্যাপক পরিমাণে আমদানি এবং এর ফলে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের ক্ষতির" কথাই বলছেন তিনি।

আগামী সপ্তাহ থেকে সোফা ও অন্যান্য গদিযুক্ত আসবাবপত্রে ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।

নতুন ঘোষিত এসব শুল্ক ট্রাম্পের শুল্ক নীতির আরও সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত অগাস্টে ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতি কার্যকর করা শুরু হয়। উদ্দেশ্য, যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি ও উৎপাদন বৃদ্ধি। এছাড়া, এর অন্যান্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে।

৯০টিরও বেশি দেশের ওপর প্রভাব ফেলেছে এই নীতি।

ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের চেম্বার অব কমার্স হোয়াইট হাউসকে নতুন শুল্ক আরোপ না করার আহ্বান জানিয়েছিল।

তাদের যুক্তি ছিল, ট্রাক উৎপাদনে ব্যবহৃত অনেক যন্ত্রাংশ প্রধানত মেক্সিকো, কানাডা, জার্মানি, ফিনল্যান্ড এবং জাপান থেকে আসে এবং এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র বা ঘনিষ্ঠ অংশীদার এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি নয়।

চেম্বার অব কমার্স আরও জানায়, মাঝারি ও ভারী ট্রাকের যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী সবচেয়ে বড় দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে মেক্সিকো ও কানাডা। গত বছর এই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির অর্ধেকেরও বেশি এই দুই দেশ থেকেই এসেছে।

"এই যন্ত্রাংশগুলো দেশীয়ভাবে উৎপাদন করা বাস্তবসম্মত নয়," উল্লেখ করে ব্যবসায়ীদের সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে যে তাতে শিল্পখাতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে।

বিদেশি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে গত এপ্রিল মাসে গোটা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। এই ঘোষণাকে ঘিরে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক শঙ্কা তৈরি হলে সেই সিদ্ধান্ত স্থগিতও করেছিলেন তিনি।

এর চার মাস পর, বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে হওয়া কয়েকটা গুটিকয়েক চুক্তি প্রকাশ্যে এনে তাকে 'ধারাবাহিক বিজয়' বলে দাবি করেন মি. ট্রাম্প।

তবে আগে ও পরে, সব ক্ষেত্রেই তিনি একতরফাভাবে অন্যদের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন।

ভিন্ন দেশের উপর 'ট্যারিফ' বা শুল্ক আরোপ করতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে জরুরি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে সম্প্রতি রায় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আপিল আদালত।

আরো পড়তে পারেন:

বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিন্যাসের উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করার যুক্তি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তিনি এই প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন যে তার এই পদক্ষেপের মাধ্যমে নয়া রাজস্ব নীতির সুবিধা মিলবে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত হবে, শত শত বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ হবে এবং মার্কিন পণ্য কেনার পরিমাণও বাড়বে।

বাস্তবে তেমনটাই হবে কি না এবং এই সব পদক্ষেপের নেতিবাচক পরিণতি দেখা যেতে পারে কি না তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

আমেরিকায় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য হয়তো খুব সীমিত সাফল্যই পাবে।

কানাডা এবং ইইউর মতো দীর্ঘদিনের বাণিজ্য অংশীদাররা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংযোগ তৈরির জন্য বিকল্প খুঁজতে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রকে তারা আর নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক মিত্র হিসেবে দেখবে না।

বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর বিশিষ্ট অবস্থানের কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প এর সুবিধা পেতে পারেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ওই জায়গায় পৌঁছাতে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ব্যয় করেছে।

যদি বর্তমান শুল্ক অর্থনীতির কাঠামোকে আঘাত করে তবে তার তার ফল কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে হবে না।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যে আসন্ন সপ্তাহে বা আগামী কয়েক মাসে মিলবে তেমনটা নয়, জবাব মিলবে আসন্ন বছরগুলোতে।