আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বাজেটে খাতওয়ারি বরাদ্দে বড় পরিবর্তন নেই, বলছেন অর্থনীতিবিদরা
বাংলাদেশে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এটি সংসদে উত্থাপন করেন। এই বছরের ঘোষিত বাজেটের আকার ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা যা জিডিপির ১৫.২ শতাংশ।
বাজেটে বরাদ্দের খাতগুলোকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হচ্ছে পরিচালন ব্যয় এবং অন্যটি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি।
এরমধ্যে পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খাতওয়ারি বরাদ্দের ক্ষেত্রে আসলে আগের বছরের বাজেটের তুলনায় খুব বড় কোন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। বরং আগের বছরের বরাদ্দের অঙ্কই একটু এদিক-সেদিক করা হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সবচেয়ে বেশি আগ্রহ থাকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতগুলোতে কত বরাদ্দ আসলো।
অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলছেন, সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে এবং একটা বড় অংশ সেখানে যাচ্ছে। এটা এই বাজেটের একটা ভাল দিক।
নতুন এই বাজেটে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৫ লক্ষ কোটি টাকা। এরমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা যা জিডিপির ৫.২ শতাংশ। গত বাজেটে এই হার ছিল ৫.৫ শতাংশ। অর্থাৎ এই বাজেটে ঘাটতি গত বাজেটের তুলনায় কম।
মোট ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং এক লাখ ২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে আসবে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে খাতওয়ারি বরাদ্দের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা হলো-
সামাজিক নিরাপত্তা
বাজেটে খাত অনুযায়ী নির্দিষ্ট করে বরাদ্দের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এরমধ্যে সামাজিক অবকাঠামো খাতে মোট এক লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এই বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, আইএমএফ-এর একটা শর্ত ছিল যে, গরীবের জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে। তিনি মনে করেন সরকার সেটি অব্যাহত রাখতে চাচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকারের সামর্থ খুব কম। এই সামর্থের তুলনায় ব্যয়টা অনেক বেশি। এক লাখ কোটি টাকা দিতে হবে সুদ হিসেবে, এক লাখ কোটি টাকা দিতে হবে বেতন-ভাতাতে, সোয়া লাখ কোটি টাকা দিতে হবে বিভিন্ন সামজিক সুরক্ষা খাতে। ভর্তুকিতে দিতে হবে সোয়া লাখ কোটি টাকা।
“থাকলো কি তাহলে? এগুলো সবই সরকারের কাছে মনে হয় প্রয়োজনীয়, জনগণের কাছে মনে হয় প্রয়োজনীয়, কিন্তু সরকারের সামর্থ নাই।”
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য
সামাজিক অবকাঠামো খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে। এই খাতে বরাদ্দ ৪২ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এরপরেই রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা খাত যেখানে বরাদ্দ ৩৪ হাজার ৭২২ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ৭৭ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা।
আগামী অর্থবছরের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগে ২৯ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে সংখ্যার ভিত্তিতে দেখতে গেলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য-এই দুই খাতেই বরাদ্দ আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে।
তবে, বরাদ্দ হলেও সেটা কতখানি বাস্তবায়ন করা হবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায় বলে মনে করেন তিনি।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, “বরাদ্দ একটা বিষয়, আর বাস্তবায়ন একটা বিষয়। স্বাস্থ্য খাতে আমরা দেখেছি বাস্তবায়নের দিক থেকে সব সময় সবার থেকে পিছিয়ে থাকে।”
কৃষি
বাজেটে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৫ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই বরাদ্দ ছিল ৩৩ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলেন, “তো সেটা(কৃষি খাতে বরাদ্দ) কেন কমানো হলো সেটা কিন্তু চিন্তার বিষয়, আমি জানি না কী কারণে(কমলো), কারণ এটা তো খাদ্য নিরাপত্তার সাথে জড়িত।”
খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা। এরমধ্যে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬ হাজার ১৬ কোটি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণায়ের জন্য ১০ হাজার ১১৮কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
ভৌত অবকাঠামো খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ১০৮ কোটি টাকা।
এই খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রয়েছে কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন বিভাগে। এই বিভাগের আলাদা চারটি খাতে সব মিলিয়ে ৯৩ হাজার ৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যোগাযোগ অবকাঠামো খাত। এই খাতের আলাদা চারটি বিভাগের জন্য সব মিলিয়ে ৮৫ হাজার ১৯১ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
অন্যান্য সেক্টর নামে একটি খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা।
ভৌত অবকাঠামো খাতের মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতও। এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৪ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা।
সাধারণ সেবা
বাজেটের আরেকটি খাত হচ্ছে সাধারণ সেবা খাত। এই খাতের সর্বমোট বরাদ্দ এক লাখ ৬২ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ২১.৩ শতাংশ। পাবলিক সার্ভিসের ক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়ানো নিয়ে সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
এরমধ্যে জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিভাগের জন্য ৩২ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অন্যান্য আরেকটি খাতে বরাদ্দ রয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা।
এছাড়া সুদ পরিশোধের জন্য সরকার বাজেটে ৯৪ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে যা মোট বাজেটের প্রায় ১২.৪ শতাংশ।
এছাড়া পিপিপি ভর্তুকি ও দায় পরিশোধের জন্য ৭৯ হাজার ৯০১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে নীট ঋণ দান ও অন্যান্য খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৮ হাজার ৯২২ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলমান অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে এই বাজেট প্রস্তুত নয়। যথাযথ নীতি নির্ধারণ এবং সেগুলো ঠিক মতো বাস্তবায়ন করা না হলে এই বাজেট তো নয়ই বরং আরো কয়েক বছরের বাজেটের মাধ্যমেও চলমান অর্থনৈতিক সংকট কাটানো যাবে না বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, বাজেটের সবচেয়ে ভাল দিক হচ্ছে দেশীয় শিল্পের উপর সুরক্ষা দেয়ার একটা পদক্ষেপ অব্যাহত আছে। আইএমএফ-এর শর্তের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে, সেটি ভাল। কিন্তু চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে রাজস্ব আয়ে ঘাটতি হওয়ার বিষয়টি। এছাড়া বাজেট পরোক্ষ করের আয়ের উপর নির্ভরশীল বলে মনে হচ্ছে। ৭০ শতাংশ রাজস্ব আয় আসবে পরোক্ষ কর থেকে যেটা আসলে চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করেন তিনি।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে যত বরাদ্দ
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় মানবসম্পদ বিভাগে সব মিলিয়ে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭০ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। এই খাতের আওতায় রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এবং অন্যান্য।
দ্বিতীয়ত কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫৮ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। এই খাতের আওতাভূক্ত রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগে যা ৪০ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা।
জ্বালানি অবকাঠামো খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৪ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। এই খাতের মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৭৪ হাজার ১০২ কোটি টাকা।
এছাড়া অন্যান্য খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে আরো ২৫ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট বরাদ্দ দুই লাখ ৬৩ হাজার টাকা।
মন্ত্রণালয় বা বিভাগ-ভিত্তিক বরাদ্দ
বাজেটে সরকারের মোট ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বরাদ্দের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রয়েছে অর্থ বিভাগে। এই বিভাগে বরাদ্দের পরিমাণ দুই লাখ ৩১ হাজার ২১১ কোটি টাকা।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জন্য এবার দুই হাজার ৪০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত অর্থবছরের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বেশি। উল্লেখ্য এই অর্থবছরেই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে।
বড় বরাদ্দগুলোর মধ্যে একটি রয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে। এই মন্ত্রণালয়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪২ হাজার ৯৫ কোটি টাকা।
এছাড়া আইন ও বিচার বিভাগে এক হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা, জননিরাপত্তা বিভাগে ২৫ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকার বরাদ্দ রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে আগামী অর্থবছরের বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৯ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বাজেট এই খাতে বরাদ্দ ছিল ২৩ হাজার ৫২ কোটি টাকা।