বন্য হাতির হামলার পর ক্ষতিপূরণ চেয়ে থানায় জিডি

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে টানা কয়েকদিন ধরে বন্য হাতির আক্রমণের শিকার হবার পর রোববার থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেন ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় লোকেরা।
তাদের অভিযোগ, গত তিন চারদিন ধরে ৪০ থেকে ৫০টি হাতি দল বেঁধে গ্রামের ছাপড়া ঘর, ফসলি জমি ও ধানের গোলায় হামলা চালিয়ে তছনছ করেছে। এজন্য তারা সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।
বাংলাদেশে হাতির আক্রমণের ঘটনায় থানায় জিডি করার ঘটনা এটাই প্রথম নয়।
এর আগেও চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও শেরপুরেও একাধিকবার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ থানায় জিডি করেছেন।
দুর্গাপুরে ক্ষতির শিকার গ্রামবাসীর অভিযোগ নেত্রকোনার অন্তত ১০টি গ্রামে রাত পোহালেই হাতিরা পাল বেঁধে পাহাড় থেকে নেমে এসে আক্রমণ চালাচ্ছে।
গত ৮ই ডিসেম্বর হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে ৬৫ বছর বয়সী বুনেছ রিছিল নামে গারো সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। এছাড়া নভেম্বরেও এক কৃষক হাতির আক্রমণে মারা যান।
দুর্গাপুর থানা পুলিশ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকবার তারা গ্রামবাসীর ওপর হাতির আক্রমণের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
তবে স্থানীয়দের অনেকেই হাতিদের প্রতিহত করতে গিয়ে নিজেদের বিপদের মুখে ফেলেন।
এ কারণে হাতি দেখার সাথে সাথে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাবার জন্য প্রচার প্রচারণা চালানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ।

ছবির উৎস, দুর্গাপুর ইউএনও
ক্ষতিপূরণ দাবি করবেন কিভাবে
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
সাম্প্রতিক সময়ে হাতির পাল দুর্গাপুর গ্রামের ২৫টি কৃষকের বসতবাড়ি ভেঙে ফেলেছে এবং ২৫ মণ ধান খেয়ে ফেলেছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিবুল আহসান।
তাৎক্ষণিকভাবে নিহতের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের দুই হাজার টাকা, কম্বল ও খাদ্য সহায়তা দেয়ার কথা জানান তিনি।
সাধারণত বন্যপ্রাণীর আক্রমণে ক্ষয়ক্ষতি হলে সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান রয়েছে।
ক্ষতিপূরণ আবেদনের ক্ষেত্রে থানায় জিডির কপি শক্ত প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত জানমালের ক্ষতিপূরণ বিধিমালা ২০২১ অনুযায়ী, বন্যপ্রাণীর আক্রমণে কোন ব্যক্তি নিহত হলে তার পরিবারকে তিন লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।
বন্যপ্রাণীর আক্রমণে গুরুতর আহত ব্যক্তির ক্ষেত্রে অনধিক এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান রয়েছে।
সরকারি বনাঞ্চলের বাইরে লোকালয়ে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে অনধিক ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।
তবে কেউ যদি সরকার ঘোষিত অভয়ারণ্য বা বনাঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতির শিকার হন সেক্ষেত্রে কোন ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা নেই।
তবে এই ক্ষতিপূরণ আদায় কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়ে থাকে।

ছবির উৎস, Getty Images
বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত জানমালের ক্ষতিপূরণ আদায়ের আবেদন করতে হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, পরিবারের সদস্য বা মালিককে ঘটনা ঘটার ৬০ দিনের মধ্যে একটি ফর্ম পূরণ করে সংশ্লিষ্ট ফরেস্ট অফিসের রেঞ্জ কর্মকর্তা বা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবর জমা দিয়ে ক্ষতিপূরণ আবেদন করতে হবে।
এই ফরমটি পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে না হলে স্থানীয় বন কর্মকর্তাদের কাছে পাওয়া যাবে। ওয়েবসাইটে ফর্মের ক, খ ও গ এই তিনটি নমুনা দেয়া রয়েছে।
তবে শর্ত থাকে, যদি কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ঘটনা ঘটার ৬০ দিন পার হওয়ার পর পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণের আবেদন করে তাহলে সংশ্লিষ্ট কমিটি যৌক্তিক কারণ থাকা সাপেক্ষে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আবেদনটি বিবেচনা করবে।
তবে আবেদন শুধুমাত্র তখনই গৃহীত হবে যদি ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ সরকারি বনাঞ্চলের বাইরে লোকালয়ে হয় এবং বন্যপ্রাণী সেখানে গিয়ে যদি হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতি করে।
বন্যপ্রাণী দ্বারা জানমালের ক্ষতিপূরণ নিরূপণে কমিটি গঠন করা হয়ে থাকে। সেখানে আহ্বায়ক থাকেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
সদস্য হিসেবে থাকেন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা পৌরসভার মেয়র, কাউন্সিলর বা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য এবং সহকারী বন সংরক্ষক, রেঞ্জ কর্মকর্তা বা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সদস্য সচিবসহ অনেকে।
কমিটি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কোন ব্যক্তিকে কো-অপ্ট করতে পারবে। সাম্প্রতিক কমিটি-গুলোয় ১৭ থেকে ১৮ জন সদস্য দেখা গিয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
কমিটির প্রধান কাজ থাকে কেউ ক্ষয়ক্ষতির আবেদন করলে বা জিডি করলে সরেজমিনে তদন্ত করে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা এবং জীবনহানির ব্যাপারে সত্যতা যাচাই করা।
এরপর ৩০ দিনের মধ্যে মতামতসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বা ওয়ার্ডেন এর কাছে মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেবে।
এরপর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বা ওয়ার্ডেন কমিটির মূল্যায়ন প্রতিবেদন পেয়ে সেটি যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করবেন।
তারপর তিনি প্রতিবেদন পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে সুপারিশসহ সেটি অতিরিক্ত প্রধান ওয়ার্ডেনের কাছে সুপারিশসহ আর্থিক মঞ্জুরির জন্য পাঠাবেন।
অতিরিক্ত প্রধান ওয়ার্ডেন সুপারিশকৃত প্রাপ্ত আবেদনসমূহ পুনরায় যাচাই বাছাই করবেন এবং সাত দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট খাতে অর্থ বরাদ্দ ও দাবীকৃত অর্থ মঞ্জুর করার জন্য আবেদনসমূহ প্রদান ওয়ার্ডেনের কাছে পাঠাবেন।
আর্থিক মঞ্জুরি পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বা ওয়ার্ডেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্য বা প্রতিষ্ঠানের কাছে ক্ষতিপূরণের অর্থ ক্রস চেক বা ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে দেবে।
তবে ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে আবেদনকারী সংক্ষুব্ধ হলে সিদ্ধান্ত প্রাপ্তির তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল করতে পারবে।
দায়েরকৃত আপিল ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার কথা বলা আছে। আপিলে প্রদত্ত আদেশই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
চলতি বছর ৩রা মার্চ বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস উপলক্ষে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোস্তফা কামাল বলেছেন, হাতি ফসল খেলে বা নষ্ট করলে ১৫ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

ছবির উৎস, Getty Images
হাতি ও মানুষের মধ্যে সংঘাতের কারণ কী
সাধারণত শেরপুরের বনাঞ্চলে অনেক হাতি ভারতের মেঘালয় থেকে খাবারের সন্ধানে বাংলাদেশের দিকে চলে আসে। বিশেষ করে বর্ষার পরে যখন নতুন ঘাস জন্মায় , সেইসাথে পাকা ধানের মৌসুমে, শীতকালে সবজির ফলনের সময়ে হাতি পাহাড় থেকে নেমে আসে। মূলত তখনই তারা স্থানীয়রা ক্ষয়ক্ষতরি মুখে পড়েন।
আবার স্থানীয়দের আক্রমণে, বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে না হলে বিষক্রিয়াও বহু হাতি মারা যায়।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে গত ১৭ বছরে মানুষের হাতে হত্যার শিকার হয়েছে ১১৮টি হাতি।
কিন্তু গত এক দশকে বন বিভাগের বহু জমি মানুষের দখলে চলে যাওয়ায় হাতির এই বিচরণক্ষেত্র হাতির জন্য আর নিরাপদ নেই বলে জানিয়েছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা। যা সাধারণ মানুষের জানমালও হুমকির মুখে ফেলছে।
সে কারণে বনমন্ত্রী কৃষকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, হাতি যত ধান খাবে বা ফসল নষ্ট করবে তার চেয়ে বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে - যাতে কেউ হাতিকে আঘাত না করে।
কক্সবাজার থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে মিয়ানমার পর্যন্ত এশিয়ান হাতির আন্তর্জাতিক চলাচলের পথ।
তবে সেই পথের বিভিন্ন অংশে উন্নয়ন কাজ চলছে। চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে ঘুমধুমে রেলপথের বন্যহাতির চলাচলের পথের ওপর দিয়ে যাচ্ছে।
চুনতি, ফাঁসিয়াখালী, মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান প্রকল্পে হাতি পারাপারের অন্তত ২১টি পথ রয়েছে।
এই প্রকল্পগুলো চালু হলে এসব স্থানে মানুষের সাথে হাতির সংঘাতের ঘটনা বেড়ে যাবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীরা।
চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারের বনাঞ্চলের হাতিগুলো সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। রোহিঙ্গারা যেখানে বসতি করেছে সেটা পুরোটাই হাতির বিচরণক্ষেত্র।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতি মিয়ানমার থেকে এই রুটেই টেকনাফ বনে যায়। সেই রাস্তায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প হওয়ায় হাতিগুলো একপ্রকার কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আর যেগুলো পারাপারের চেষ্টা করেছে সেগুলোয় মানুষের হামলার মারা গিয়েছে।
এজন্য তারা সরকারকে হাতির হাজার বছরের পথ অবমুক্ত করার আবেদন জানিয়ে আসলেও কোন সাড়া পাননি।

ছবির উৎস, মোস্তফা ফিরোজ
হাতি ও মানুষের সংঘাত এড়াতে করণীয়
এশিয়ান এলিফেন্ট স্পেশালিষ্ট গ্রুপের সদস্য মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজ বলছেন, হাতিরা লোকালয়ে আসছে না বরং মানুষ তাদের আবাসস্থল বা চলাচলের পথে ঢুকে তাদের জায়গা দখল করছে।
তিনি জানান, হাতিরা বংশ পরম্পরায় হাজার হাজার বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট রুট ধরেই চলাচল করে। সম্প্রতি আইইউসিএন হাতির সেই বিচরণক্ষেত্রগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিহ্নিত করেছে।
তারপরও সেই বিচরণক্ষেত্রে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে মানুষ বসতি গড়ে তুলছে, আবার অনেকে বন বিভাগের জমি ইজারা নিয়ে চাষাবাদ করছে।
হাতি তার বিচরণ-ক্ষেত্রে কিছু পেলেই সেটা লণ্ডভণ্ড করে দেয়।
তাই প্রায়ই হাতির হানায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হওয়াতে মাথায় হাত পড়ছে কৃষকদের। মাঠের ধান, শীতের সবজি ঘরে তুলতে পারবেন কি না - তা নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছেন তারা।
তাই তারা হাতির কারণে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির শিকার সবাইকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি করছেন।
অন্যদিকে ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে হাতিদের বিচরণক্ষেত্রগুলোকে অবাধ চলাচলের জন্য নিরাপদ করার কোন বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন মি. ফিরোজ।
তিনি বলেন, বনভূমির জায়গা কোনভাবেই মানুষের কাজের জন্য, সড়ক বা রেলপথ এমনকি চাষাবাদের জন্য ইজারা দেয়া যাবে না। যেগুলো দখল হয়ে গেছে সেগুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে। এক্ষেত্রে বন বিভাগকে তৎপর হতে হবে।

ছবির উৎস, Getty Images
বন্যপ্রাণী বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা- আইইউসিএন এর হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশের এশীয় প্রজাতির পূর্ণাঙ্গ বয়সী হাতির সংখ্যা ২৫০টির কম।
এজন্যে এই প্রাণীটিকে বাংলাদেশে মহা-বিপন্ন বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
বর্তমান আইনে হাতি নিধনের সর্বোচ্চ শাস্তি দুই থেকে ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং এক থেকে ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে কেউ যদি হাতির হামলার শিকার হন এবং তার প্রাণ যাওয়ার শঙ্কা থাকে তাহলে জীবন রক্ষার্থে হাতি হত্যার এই বিধান প্রযোজ্য হবে না।








