রাজদরবার থেকে আমাদের থালায় নান রুটির যাত্রা

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শার্লিন মোলান
- Role, বিবিসি সংবাদদাতা
দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে মোটা খামিরে তৈরি এক ধরনের রুটি 'নান' নামে পরিচিত, যা নরম তুলতুলে ও ফুলে ওঠা গড়নের জন্য জনপ্রিয়। এই অঞ্চলের অনেক জায়গায় এটি প্রধান খাবার হিসেবেও প্রচলিত।
শুধু তাই নয়, বিদেশে এটি অন্যতম জনপ্রিয় ভারতীয় খাবার হিসেবে বিবেচিত।
যদিও ঝাল মশলাদার মাংসকেই অনেকে প্রধান আকর্ষণ মনে করতে পারেন, তবে এর সঙ্গী 'নান' ছাড়া ওই মাংসের ঝোল তার স্বাদের একটি বড় একটি অংশ হারিয়ে ফেলে।
তুলতুলে নান রুটিতে প্রতিটি কামড়ে যেন স্বতন্ত্র স্বাদ যুক্ত হয়, এর হালকা স্বাদ মূলত ঝোলের মসলা ও ঘ্রাণকে দারুণভাবে শুষে নেয়।
যেই তরকারি বা কাবারের সঙ্গেই পরিবেশন করা হোক না কেন, সেটা নানের কারণে আরও সুস্বাদু হয়ে ওঠে এবং খাবারের আসল স্বাদ পাওয়া যায়।
সম্ভবত এই কারণেই এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় রুটিগুলোর মধ্যে একটি হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি 'টেস্ট অ্যাটলাস'এর সেরা রুটির তালিকায় বাটার গার্লিক নান প্রথম স্থান অর্জন করেছে। বাটার গার্লিক নান মূলত ঐতিহ্যবাহী নানেরই একটি স্বাদে ভরপুর রূপ।
খুব গরম নানের উপর মাখন ছড়িয়ে এবং উপরে কাটা রসুন ছিটিয়ে এই গার্লিক নান তৈরি করা হয়।
এই তালিকায় আলু নানও রয়েছে, যা মশলা এবং ধনেপাতা আলুর সাথে মিশিয়ে নানের মধ্যে ভরে তৈরি করা হয়।
আজকের দিনে নান এবং এর নানা ধরন ভারতীয় বা মধ্যপ্রাচ্যের খাবার পরিবেশনকারী রেস্তোরাঁগুলোতে খুবই সাধারণ দৃশ্য।
কিন্তু এক সময় এই নান কেবল মুসলিম সম্রাটদের রাজদরবারেই পরিবেশন করা হতো। তাহলে নান কীভাবে রাজকীয় রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আমাদের থালায় এসে পৌঁছাল?

ছবির উৎস, THE MET
নান কোথা থেকে এসেছে?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
নান রুটির উৎপত্তি ঠিক কোথায়, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে অনেক খাদ্য ইতিহাসবিদ মনে করেন, এই রুটির উৎপত্তি প্রাচীন পারস্যে।
কারণ 'নান' নামটি ফারসি শব্দ থেকে এসেছে। ফারসি ভাষায় রুটিকে নান বলা হয়।
ফারসিরা পানি ও ময়দা দিয়ে এই রুটি তৈরি করত, যা সম্ভবত গরম পাথরের ওপর সেঁকে নেওয়া হতো।
১৩শ থেকে ১৬শ শতকের মধ্যে যে সুলতানরা ভারতীয় উপমহাদেশের বড় অংশ শাসন করেছিলেন, তাদের হাত ধরেই নান উপমহাদেশে আসে।
মুসলিম শাসকেরা এই উপমহাদেশে আসার পর তাদের সাথে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার নানা খাদ্যসংস্কৃতি ও রন্ধন ঐতিহ্যও এই অঞ্চলের সঙ্গে মিশে যায়। যার মধ্যে রান্নার জন্য তন্দুর ব্যবহারের প্রথার প্রচলন অন্যতম।
আলাউদ্দিন খিলজি ও মুহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে রাজদরবারের জীবন নিয়ে একাধিক বই লিখেছেন ভারতীয়-ফারসি কবি আমির খসরু।
তার লেখায় দুই ধরনের নানের উল্লেখ পাওয়া যায়, নান-এ-তানুক এবং নান-এ-তানুরি।
নান-এ-তানুক ছিল পাতলা ও নরম রুটি, অন্যদিকে নান-এ-তানুরি ছিল মোটা ও ফোলা ধরনের রুটি যা তন্দুরে সেঁকা হতো।
দিল্লি সুলতানি আমলে, নান সাধারণত বিভিন্ন আমিষ বা মাংসের পদের সঙ্গে খাওয়া হত, যেমন কাবাব এবং মাংসের কিমা।

ছবির উৎস, Getty Images
শাহী রান্নাঘরের বাবুর্চিরা নান তৈরির শিল্পকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। তারা ময়দা মাখার ক্ষেত্রে বিশেষ কৌশল ব্যবহার করতেন।
রুটিকে আরো নরম তুলতুলে করতে আর ফোলাতে শাহী বাবুর্চিরা খামিরের মধ্যে ইস্ট যোগ করতেন যা সে সময় ছিল একেবারেই বিরল একটি উপাদান।
নান তৈরির এই জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়াই একে বিলাসবহুল খাবারে পরিণত করেছিল, যা মূলত রাজপরিবার ও উচ্চবিত্তরাই খেতেন।
পরবর্তী ৩০০ বছর ধরে মুঘল সম্রাটদের শাসনামলেও এই রেওয়াজ বজায় ছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসবিদ নেহা ভারমানি বলেন, "নান তৈরির জন্য বিশেষ বাবুর্চি থাকতেন, যাদের বলা হতো 'নান বাই'।
তারা এই রুটি নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন এবং নতুন উদ্ভাবন তুলে ধরতে রুটির সাথে বিভিন্ন বিশেষণ বা উপাধী ব্যবহার করতেন।
যেমন, 'নান-এ-ওয়ারকি'-তে থাকত পাতলা ও স্তরযুক্ত পরত, আর 'নান-এ-তাঙ্গি' হলো ছোট আকারের রুটি, যা গ্রেভি ভালোভাবে শুষে নিতে পারত।
নানের নাম অনেক সময় সেই রান্নাঘরের নাম অনুসারেও রাখা হতো, যেখানে সেই নান তৈরি করা হতো।
ভারমানি আরো বলেন, "বাকরখানি হলো বিস্কুটের মতো গঠনের এক ধরনের রুটি বা ফ্ল্যাটব্রেড। জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের দরবারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বাকির নাজম সাইনির রান্নাঘরে তৈরি হতো এই বিশেষ ধরনের রুটি। সেখান থেকেই এর নামকরণ করা হয়েছে বাকরখানি"।

ছবির উৎস, Getty Images
নান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা
ব্রিটিশ শাসনামলেও, নান মূলত ধনী শ্রেণীর মানুষদের খাবার ছিল, তবে ব্রিটিশ পর্যটকদের হাত ধরে এটি পশ্চিমা বিশ্বেও পৌঁছে যায়।
ভারতে নান ধীরে ধীরে ঔপনিবেশিক খাদ্যসংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে যা মাংস বা স্থানীয় মশলা দিয়ে তৈরি সসের সঙ্গে পরিবেশন করা হতো।
"কিন্তু সময়ের সাথে সাথে জটিল পদ্ধতিগুলোর জায়গা নিয়ে নেয় বিভিন্ন সহজ কৌশল। এর ফলে নানের একটি সহজ সরল রূপ সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছে যায়। যেমনটি আজ আমরা বেশিরভাগ স্থানীয় রেস্তোরাঁয় দেখতে পাই," ভারমানি বলেন।
বর্তমানে নান তৈরির জন্য ময়দা, দই ও ইস্ট মিশিয়ে, ময়ান করে নরম খামির তৈরি করা হয়। এই খামির কিছু সময় ফেলে রাখা হয় যেন ফুলে ওঠে।
এরপর তা গোল গোল টুকরো করে হাতে চেপে চেপে রুটির আকার দেওয়া হয়। তারপর নান খুব গরম তন্দুরে দেওয়া হয়, যেখানে এটি ফুলে ওঠে এবং গায়ে বাদামি দাগ পড়ে।
পরিবেশনের আগে এর ওপর হালকা করে মাখন বা ঘি লাগানো হয়।

ছবির উৎস, The Cleveland Museum of Art, Andrew R. and Martha Holden Jennings Fund 1971
কিন্তু নানের গল্প এখানেই শেষ হয় না।
১৯৯০ এবং ২০০০ এর দশকে নানের চেহারায় নতুন পরিবর্তন আসে। তখন ভারত ও বিদেশের উন্নতমানের ফাইন-ডাইনিং রেস্তোরাঁগুলো এই ফ্ল্যাটব্রেড নিয়ে নানা পরীক্ষা শুরু করে।
শেফ সুবীর সরণ স্মরণ করেন, নিউইয়র্কে তার রেস্তোরাঁয় নানে পালং শাক, এক ধরনের পনির এবং মাশরুম যোগ করা হতো।
তিনি বলেন, "নানকে একটু নতুন ও আকর্ষণীয় করে তুলতেই এমন উপায় বের করা হয় যেন অ-ভারতীয়দের কাছে এটি আরো আকর্ষণীয় করা যায়। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা ভারতীয়রাও বিদেশে তাদের নিজেদের ঐতিহ্যবাহী খাবার খেতে গিয়ে কম অপরাধবোধে ভোগেন"।
এই প্রবণতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আজ বিশ্বের নানা প্রান্তের রেস্তোরাঁগুলো নান তৈরিতে বিভিন্ন ধরনের উপকরণ ব্যবহার করে এবং নান নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে।
সরণ বলেন, "ভারতের গোয়ায় আপনি এমন রেস্তোরাঁ পাবেন, যেখানে শুকরের মাংস দিয়ে তৈরি পর্ক ভিন্দালু নান, সেইসাথে মুরগির মাংসের বাটার চিকেন নান পরিবেশন করা হয়। আবার হংকংয়ে পাওয়া যায় ট্রাফল চিজ নান"।
তিনি আরও বলেন, "নান হলো ভারতের পক্ষ থেকে বিশ্বকে দেওয়া এক অসাধারণ উপহার"।

ছবির উৎস, Getty Images
তবে খাদ্য ইতিহাসবিদরা এ বিষয়ে পুরোপুরি একমত নন। তাদের মতে, নান শুধু ভারতের নয় এটি দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য খাবারেরও একটি অংশ।
তবে ভারতের সঙ্গে এর সম্পর্ক যে গভীর ও প্রাচীন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
সরণ বলেন, নান আত্মীয়তা ও ভারতীয় পরিচয়ের এক শক্তিশালী বার্তা বহন করে।
তিনি বলেন, "নান এমন এক বৈচিত্র্যের গল্প বলে, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি পাশাপাশি সম্প্রীতি ও সামঞ্জস্যের সঙ্গে সহাবস্থান করে"।
"এটি আমাদের শেখায়, বৈচিত্র্য মানেই একে অন্যকে বাতিল করে দেওয়া নয়, বরং একসঙ্গে মিলেই তা উদযাপন করা সম্ভব"।








