মুক্তিযুদ্ধের খবর প্রকাশ করে যেভাবে বাংলাদেশের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন মার্ক টালি

ছবির উৎস, Robert Nickelsberg/Getty Images
- Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
বিবিসির 'ভয়েস অব ইন্ডিয়া' খ্যাত সাবেক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক স্যার মার্ক টালি মারা গেছেন। নব্বই বছর বয়সী মি. টালি রোববার ভারতের নয়াদিল্লিতে মৃত্যুবরণ করেছেন বলে বিবিসিকে নিশ্চিত করেন তার সাবেক সহকর্মী সতীশ জ্যাকব।
ইংরেজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও মি. টালির জীবনের চারভাগের তিনভাগই কেটেছে ভারতে।
তিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দিল্লিতে বিবিসির ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ ওই সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, পাকিস্তানের সামরিক শাসন, ভারতের জরুরি অবস্থা ও শিখ বিদ্রোহ, ইন্দিরা ও রাজিব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড, জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসি, শ্রীলঙ্কায় তামিল টাইগারদের বিদ্রোহ, আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনসহ দক্ষিণ এশিয়ার আরও অনেক বড় বড় ঘটনার সাক্ষী হন মি. টালি, যেগুলো নিয়ে তিনি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেন।
এর মধ্যে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণের মুখে যখন স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখন বিবিসিতে নিয়মিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করে বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন মার্ক টালি।
"তখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিবিসি মানেই ছিল মার্ক টালি। যাদের বাড়িতে তখন রেডিও ছিল, তারা সকাল-সন্ধ্যা রেডিওতে কান পেতে অপেক্ষা করতেন বিবিসিতে তার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন গবেষক ও সাংবাদিক আফসান চৌধুরী।
মুক্তিযুদ্ধকালে নিরপেক্ষভাবে খবর প্রকাশ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য পরবর্তীতে মার্ক টালিকে 'মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা' দেয় দেশটির সরকার।
ওই সম্মাননা নিতে ২০১২ সালে শেষবার ঢাকায় এসেছিলেন বিবিসি'র সাবেক এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

ছবির উৎস, Getty Images
মুক্তিযুদ্ধের খবর সংগ্রহে ঢাকায় মার্ক টালি
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার মাসখানেক পর, অর্থাৎ এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে সংবাদ সংগ্রহে ঢাকায় আসেন বিবিসি'র সাংবাদিক মার্ক টালি।
পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক সরকার ওই একবারই মি. টালিসহ দু'জন বিদেশি সাংবাদিককে বাংলাদেশে আসার অনুমতি দিয়েছিল।
একাত্তরের ওই সফরে প্রায় দু'সপ্তাহ তিনি বাংলাদেশে ছিলেন। তখন ঢাকা থেকে সড়ক পথে রাজশাহী গিয়েছিলেন মার্ক টালি।
"আমার সাথে তখন ছিলেন ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকার যুদ্ধ বিষয়ক সংবাদদাতা ক্লেয়ার হলিংওয়ার্থ। আমরা যেহেতু স্বাধীনভাবে ঘুরে বেরিয়ে পরিস্থিতি দেখার সুযোগ পেয়েছি সেজন্য আমাদের সংবাদের বিশেষ গুরুত্ব ছিল," ২০১৬ সালের মার্চে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন মার্ক টালি।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সেসময় যুদ্ধের যে ভয়াবহতা নিয়ে প্রত্যক্ষ করেছিলেন, সেগুলো নিয়ে বিবিসিতে সরেজমিনে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন তিনি।
"আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ হয়েছে। আমি ঢাকা থেকে রাজশাহী যাবার পথে সড়কের দু'পাশে দেখেছিলাম যে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. টালি।

ছবির উৎস, Getty Images
কীভাবে খবর সংগ্রহ করতেন?
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ঢাকা থেকে বের হওয়া প্রায় সব সংবাদপত্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাতে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে যা বোঝায়, সেগুলোর কিছুই তখন ছিল না। তৎকালীন সামরিক সরকারের পাঠানো বিবৃতি এবং তাদের নির্দেশিত খবরাখবরই ছাপা হতো।
ফলে পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যা-নির্যাতন কিংবা মুক্তি বাহিনীর রুখে দাঁড়ানোর কোনো খবর সেসময়ের স্থানীয় গণমাধ্যম গুলোতে প্রকাশ হতে দেখা যেত না।
আবার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র বা ভারতীয় গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের যেসব খবর প্রকাশ হতো, সেখানেও অনেক সময় সঠিক ও নিরপেক্ষ তথ্য পাওয়া যেত না বলে জানান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক আফসান চৌধুরী।
"ফলে মানুষের কাছে তখন সঠিক ও নিরপেক্ষ খবর পাওয়ার বড় একটা ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে বিবিসি'র মতো কিছু পশ্চিমা গণমাধ্যম," বলছিলেন মি. চৌধুরী।
একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে নিয়মিতভাবে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে খবরাখবর ও বিশ্লেষণ প্রচার করতো বিবিসি।
"বিবিসির সাংবাদিক হিসেবে মার্ক টালি তখন নিরপেক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের খবর সংগ্রহ করতেন এবং তার সংবাদ উপস্থাপনের ভঙ্গিও ছিল চমৎকার। সেই কারণে তার নাম মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. চৌধুরী।

একাত্তরের এপ্রিলে মার্ক টালিকে ঢাকায় ঢুকতে দিলেও দুই সপ্তাহের বেশি অবস্থান করতে দেয়নি তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক সরকার।
"পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যখন সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত পৌঁছালো এবং তারা মনে করলো যে, পরিস্থিতির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আছে, তখনই তারা আমাদের আসার অনুমতি দিয়েছিল," বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলছিলেন মার্ক টালি।
পরবর্তীতে লন্ডনে বসে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞসহ মুক্তিযুদ্ধের নানান খবর বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন মার্ক টালি।
"যুদ্ধকালীন অধিকাংশ সময় আমি লন্ডনেই অবস্থান করেছি। তখন সেখানে বসে যুদ্ধের নানাদিক নিয়ে বিশ্লেষণ ও মন্তব্য লিখেছি এবং প্রচার করেছি। যেসব খবরাখববের উপর ভিত্তি করে এসব লিখতাম তার বেশিরভাগই আসতো কলকাতা থেকে," বলেন মি. টালি।
"যখন শরণার্থী সংকট শুরু হলো তখন তাদের কাছ থেকে নানা ধরনের খবরাখবর পাওয়া যেত। নিজামউদ্দিন নামের আমাদের বেশ ভালো একজন সংবাদদাতা ছিলেন। তিনি দেশের ভেতরেই অবস্থান করছিলেন। তিনিও খবরাখবর পাঠাতেন। যুদ্ধের শেষের দিকে তাকে হত্যা করা হয়," যোগ করেন তিনি।
এছাড়া সহকর্মী ও পরিচিতজনদের আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে তখন যারা বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন, তাদের কাছ থেকেও মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করতেন বলে জানান মার্ক টালি।
"আমাকে অনেক সহায়তা করেছিল লন্ডনে অবস্থিত বিবিসি বাংলা বিভাগের সহকর্মীরা। তাদের অনেকেরই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব দেশে থাকতো। তাদের সাথে বাংলা বিভাগের সহকর্মীরা যোগাযোগের চেষ্টা করতেন বিভিন্ন উপায়ে। সেসব তথ্য আমার কাজে লাগতো," মৃত্যুর প্রায় দশ বছর আগে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন মি. টালি।

ছবির উৎস, Getty Images
ধর্ম যাজক হতে চেয়ে যেভাবে সাংবাদিক হন
১৯৩৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতা শহরে জন্ম হয় মার্ক টালির। তার বাবা ছিলেন ইংরেজ, মা বাঙালি।
দার্জিলিংয়ের একটি বোর্ডিং স্কুলে পাঁচ বছর পড়াশোনা করার পর নয় বছর বয়সে তিনি ব্রিটেনে চলে যান।
"ইংল্যান্ডের একটি পাবলিক স্কুলে পড়েছিলাম। সেখানে কেবল ছেলেরা পড়তো। আমি কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে বা ঠিকমত পড়াশোনা না করলে শিক্ষকরা প্রচণ্ড মারধর করতেন। তারপর আমি দুই বছরের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগদান করি, কিন্তু আমার মোটেও ভালো লাগেনি," ২০০৯ সালে বিবিসি হিন্দিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন মি. টালি।
এরপর খ্রিস্টান যাজক হওয়ার ইচ্ছা মনে জাগে তার।
"আমি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই, যেখানে আমি ইতিহাস এবং ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করি। আমি পুরোহিত হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম, কিন্তু পড়াশোনা শেষ করতে পারিনি," বলেন মার্ক টালি।
এরপর চার বছর ধরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন মি. টালি।
"সেটি ছিল একটি এনজিও, যারা মূলত বয়স্কদের নিয়ে কাজ করত। পরে ঘটনাক্রমে আমি একটি বিজ্ঞাপন দেখে বিবিসিতে আবেদন করি," বিবিসি হিন্দিকে বলেন মি. টালি।
১৯৬৪ সালে তিনি বিবিসিতে যোগ দিয়েছিলেন একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে। পরের বছর তিনি নয়াদিল্লিতে ফিরে আসেন এবং সাংবাদিকতা শুরু করেন।
"যখন আমি ভারতে আসি, তখন বিবিসি'র কর্মী ছিলাম। সেখানে খুব বেশি কাজ ছিল না। পরে আমি নিজেই সাংবাদিক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম," বলেন মার্ক টালি।
কয়েক বছরের মধ্যে বিবিসি'র দিল্লি ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব নেন মার্ক টালি।
১৯৭৫ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করার পর ২৪ ঘণ্টার নোটিশে তাকে দেশটি থেকে বহিষ্কার করা হয়। প্রায় ১৮ মাস পর তিনি পুনরায় দিল্লি ব্যুরোতে ফিরে এসে কাজ শুরু করেন।

ছবির উৎস, Getty Images
১৯৯২ সালে উত্তর ভারতের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হিন্দু কট্টরপন্থীদের রোষানলে পড়েন মার্ক টালি। তাকে কয়েক ঘণ্টা ধরে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়।
পরে স্থানীয় একজন হিন্দু পুরোহিতের সহায়তায় সেই বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন টালি।
নব্বইয়ের দশকে বিবিসি'র তৎকালীন মহাপরিচালক জন বার্টের সঙ্গে বিরোধের জেরে ১৯৯৪ সালে বিবিসি ছাড়েন মার্ক টালি। এরপর তিনি দিল্লিতে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এবং উপস্থাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ভারত সরকারের কাছ থেকে তিনি ১৯৯২ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০০৫ সালে পদ্মভূষণ সম্মাননায় ভূষিত হন, যা একজন বিদেশি নাগরিকের জন্য এক অনন্য ঘটনা।
এর বাইরে, ২০০২ সালে মি. টালি 'নাইট' উপাধি পান। ওই পুরস্কারকে 'ভারতের জন্য সম্মানের' বলে বর্ণনা করেছিলেন তিনি।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি লেখালেখির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তার বেশ কয়েকটি বইও প্রকাশইত হয়েছে।
সেগুলোর মধ্যে ১৯৯২ সালে প্রকাশিত 'নো ফুল স্টপস ইন ইন্ডিয়া' বইটিকে মার্ক টালির লেখা অন্যতম সেরা বই হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
এর আগে, মার্ক টালির প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। 'অমৃতসর: মিসেস গান্ধী'স লাস্ট ব্যাটেল' নামের ওই গ্রন্থের সহলেখক ছিলেন তার সাবেক সহকর্মী সতীশ জ্যাকব।
গ্রন্থটিতে শিখ বিদ্রোহীদের দমনে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিশেষ অভিযান 'অপারেশন ব্লু স্টারে'র বিষয়ে নানান গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন তারা।








