হিথ্রো বিমানবন্দরে বাংলাদেশি হাইকমিশনারকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া ঘিরে আলোচনা

পড়ার সময়: ৪ মিনিট

ঢাকা থেকে কমনওয়েলথ দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সরকারি সফরে লন্ডনে পৌঁছে বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে সেখানকার বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় এসেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

তিনি হাইকমিশনারের বিরুদ্ধে 'হাইকমিশনকে আওয়ামীকরণ ও দেশের স্বার্থ না দেখার' অভিযোগ এনেছেন।

মি. কবির যখন শনিবার হিথ্রো বিমানবন্দরে নেমে তার সিলেটের স্থানীয় উচ্চারণে হাইকমিশনার আবিদা ইসলামের প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন তখন তার পাশেই ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির 'সুখবর' আছে উল্লেখ করে ওই ঘোষণা দেওয়ার পর তাদের স্বাগত জানাতে যাওয়া বাংলাদেশিদের কয়েকজন 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন ও হাততালি দিচ্ছেন এমন ভিডিও টেলিভিশনের খবরে দেখা গেছে ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার হচ্ছে।

উপদেষ্টার ঘোষণার পর আজ রবিবার ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, হাইকমিশনার আবিদা ইসলাম এবং পর্তুগাল, পোল্যান্ড, মেক্সিকো ও মালদ্বীপে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকৃত রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, লন্ডনে ডেপুটি হাইকমিশনার নজরুল ইসলাম অনানুষ্ঠানিকভাবে হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেছেন।

যদিও কর্মরত কোনো রাষ্ট্রদূত কিংবা হাইকমিশনার যেই দেশে কর্মরত আছে, সেই দেশে গিয়ে প্রকাশ্যে সরকারের তরফ থেকে এভাবে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়াকে নজিরবিহীন বলছেন সাবেক কূটনীতিকরা। তাদের মতে, এটি সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এভাবে একজন হাইকমিশনারকে প্রত্যাহারের ঘোষণা নিয়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে দেশে ও বিদেশে কর্মরত পেশাদার কূটনীতিকদের মধ্যেও।

কী বলেছিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

কমনওয়েলথ দিবস উদযাপন ও কমনওয়েলথ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিতে স্থানীয় সময় শনিবার রাতে লন্ডনে পৌঁছান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন ক‌বির।

সেখানে হাইকমিশনের কর্মকর্তারা ছাড়াও একদল প্রবাসী বাংলাদেশি তাদের স্বাগত জানান। এ সময় সাংবাদিকরা তাকে এই সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করেন।

এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে মি. কবির বলেন, "একটা সুখবর আছে। হাইকমিশনার লন্ডনে এতদিন ডিভাইসিস বিহেভিয়ারে-কনডাক্টে কমিউনিটিকে ডিভাইড করে রাখছে। সে আওয়ামী করণ করছে এই হাইকমিশনকে, আওয়ামী করণের ধান্ধা নিয়া চলছে, কমিউনিটির ধান্ধা নাই, বাংলাদেশের ইন্টারেস্ট দেখে না, এই হাইকমিশনারকে প্রত্যাহার করা হয়েছে"।

এটুকু বলে তিনি আবার বলেন, "হাইকমিশনার আবিদা ইসলাম হ্যাজ বিন রিমুভড ফ্রম হার পোস্ট"।

আবিদা ইসলাম যুক্তরাজ্যে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে মেক্সিকো ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, রবিবার লন্ডনে স্থানীয় সময় ৯টায় কানাডার পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি রবার্ট ওলিপ্যান্টের সাথে বৈঠকের মধ্য দিয়ে মন্ত্রী ও উপদেষ্টার দিনের কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা।

এছাড়া আজই কমনওয়েলথ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক ছাড়াও যুক্তরাজ্য ও ভারতের প্রতিমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সাথে বৈঠকের কথা রয়েছে।

কর্মসূচি অনুযায়ী সোমবার তারা বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে কয়েকটি বৈঠকে অংশ নিবেন ও ওইদিন দিনের শেষে কমনওয়েলথ দিবসের সম্বর্ধনায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

কিন্তু উপদেষ্টা নিজেই হাইকমিশনার আবিদা ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানানোর পর এসব কর্মসূচিতে তিনি থাকছেন না বলেই মনে করা হচ্ছে।

বিশেষ করে আজ রোববারের কর্মসূচিগুলোতে তিনি থাকছেন না বলেই জানাচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো।

'নজিরবিহীন' ঘোষণায় 'বিস্ময়'

নিয়ম অনুযায়ী সরকার চাইলে বিদেশে কর্মরত যে কোন কূটনীতিককেই প্রত্যাহার কিংবা তার নিয়োগ বাতিল করে ঢাকায় ফিরে আসতে বলতে পারে এবং সেক্ষেত্রে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি চিঠি ইস্যু করে ওই কর্মকর্তাকে তা জানিয়ে দেন।

অনেক সময় কোনো রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার বা অন্য কোনো পর্যায়ের কুটনীতিককে প্রত্যাহারের সময় ঢাকায় মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট করার জন্য সময় বেঁধে দেওয়ারও উদাহরণ আছে। কূটনীতিকদের জন্য এগুলোকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলেই মনে করা হয়।

যেটি আজ সোমবার মন্ত্রণালয় তার বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে।

কিন্তু সেসব পথে যাওয়ার আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা সম্পন্ন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার লন্ডনে গিয়ে বিমানবন্দরে দাঁড়িয়েই এভাবে হাইকমিশনার আবিদা ইসলামকে প্রত্যাহারের ঘোষণা মুহূর্তের মধ্যেই ঢাকা ও লন্ডনে কর্মরত বাংলাদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলছেন, ফরেন সার্ভিসের পেশাদার কূটনীতিকদের জন্য এ ধরনের অভিজ্ঞতা অনেকটাই 'বিরল' এবং এ ঘটনায় তাদের মধ্যে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।

সাবেক কূটনীতিকরা বলছেন, সরকারি সফরে গিয়ে নিজ দেশের হাইকমিশনারকে এভাবে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে তাকেও যেমন অসম্মানিত করা হয়েছে তেমনি দেশেরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলছেন, একজন হাইকমিশনারকে সরকার সরাতেই পারে। কিন্তু তার একটা প্রক্রিয়া আছে। সরকারি কাঠামোতেই এ সিদ্ধান্ত হতে পারে।

"কিন্তু প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত যেভাবে প্রকাশ করা হয়েছে সেটি যৌক্তিক নয়। এতে শুধু হাইকমিশনারকেই ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হয়নি, এতে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ হয়। এগুলো ভবিষ্যতে যারা পেশাদার কূটনীতিতে আসবেন তাদের নিরুৎসাহিত করে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. কবির।

আরেকজন সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলছেন, এভাবে একজন হাইকমিশনারকে প্রত্যাহারের ঘোষণায় যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাদের ও দেশের মুখ উজ্জ্বল হয়নি।

"সবার আত্মমর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত। সবকিছুর একটা প্রক্রিয়া আছে। সরকারের উচিত এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া। কারণ এগুলো সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে না," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর এই প্রথম বিদেশি কয়েকটি মিশনে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত হাইকমিশনার আবিদা ইসলাম এবং পর্তুগাল, পোল্যান্ড, মেক্সিকো ও মালদ্বীপে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকৃত রাষ্ট্রদূত ডঃ এম মাহফুজুল হক, মোঃ ময়নুল ইসলাম, এম মুশফিকুল আনসারী ও ডঃ মোঃ নাজমুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে।

এসব রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারকে অতিসত্বর ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে ওই বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।